শাহজাদপুর সংবাদ

সিরাজগঞ্জে পালপাড়ায় দুর্গাপ্রতিমা তৈরির ধুম, বাড়ছে চাহিদা

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:০০ PM

সিরাজগঞ্জে পালপাড়ায় দুর্গাপ্রতিমা তৈরির ধুম, বাড়ছে চাহিদা

সিরাজগঞ্জ: শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট পালপাড়ায় দুর্গাপ্রতিমা তৈরির ধুম পড়েছে। পালপাড়ার প্রায় ১২টি বাড়িতে দিন-রাত চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। চাহিদা বাড়লেও কাঁচামাল ও পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কারিগরেরা।

সরেজমিনে ভদ্রঘাট পালপাড়ায় দেখা যায়, বাড়ির উঠান, বারান্দা ও আঙিনাজুড়ে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। কোথাও বাঁশ ও কাঠের কাঠামো তৈরি হচ্ছে, কোথাও খড়ের বাঁধনে দেওয়া হচ্ছে মাটির প্রলেপ। কোনো কোনো প্রতিমায় মাটির কাজ শেষ করে রং ও অলংকরণের প্রস্তুতি চলছে। কারিগরদের ব্যস্ততায় পুরো পালপাড়া যেন পরিণত হয়েছে কর্মচঞ্চল এক শিল্পপল্লীতে।

কারিগর গৌতম পালের বাড়িতে এবার তৈরি হচ্ছে প্রায় ৫০টি প্রতিমা। তিনি জানান, প্রতিটি প্রতিমা ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এরইমধ্যে ২৩টি প্রতিমার অর্ডার পেয়েছেন। তার ভাষ্য, এ বছর ভদ্রঘাট পালপাড়ায় প্রায় ২০০ থেকে ২৩০টি প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ হচ্ছে না।

কারিগর দিলীপ পাল জানান, তার তৈরি প্রতিমাগুলো ২০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তার বাড়িতে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকের ৬০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘পালপাড়ার ১২টি বাড়িতে প্রতিমা তৈরির কাজে শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন। সিরাজগঞ্জের পাশাপাশি পাবনা, বগুড়া, নাটোর ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায়ও এখানকার প্রতিমা সরবরাহ করা হবে।’

প্রতিমা তৈরির কাজে পুরুষদের পাশাপাশি পরিবারের নারী ও শিশুরাও যুক্ত হয়েছেন। কেউ খড় বাঁধছেন, কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ প্রতিমার গায়ে মাটির আস্তরণ দিচ্ছেন। প্রতিমা শুকানোর পর রং ও সাজসজ্জার কাজেও পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন।

তবে প্রতিমার চাহিদা বাড়লেও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ভাবিয়ে তুলেছে কারিগরদের। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় বাঁশ, কাঠ, খড়, সুতা, মাটি, রং ও পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে। ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বাঁশ এখন কিনতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকায়। ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার কাঠের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। ১৫০ থেকে ২০০ টাকার সুতা এবার প্রায় ২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও প্রতিমার দাম সে অনুপাতে বাড়ছে না।

নারী কারিগর মিনা পাল বলেন, ‘পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপে কাজ করেন। পূজার মৌসুমে কাজের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পরিবারের সবাই মিলে সহযোগিতা না করলে নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকায় মাটির কাঠামোকে ধীরে ধীরে দেবীর রূপ নিতে দেখার মধ্যে আলাদা আনন্দ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সময়ের সঙ্গে দুর্গাপ্রতিমার নকশাতেও পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নকশার প্রতিমা দেখে এখন অনেক পূজা কমিটির আয়োজক আধুনিক নকশার প্রতিমা তৈরির অর্ডার দিচ্ছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী কারুকাজের পাশাপাশি নতুন নকশার সঙ্গে তাল মিলিয়েই প্রতিমা তৈরি করছেন কারিগরেরা। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া এলেও চিরচেনা হাসিমুখের দুর্গাপ্রতিমার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি।

সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সন্তোষ কুমার কানু বলেন, ‘এ বছর জেলায় পাঁচ শতাধিক মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় আনুমানিক ৪২টি মণ্ডপ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘শ্রীশ্রী দুর্গাদেবী যুগে যুগে অশুভ শক্তির বিনাশ ও মানুষের কল্যাণের প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন।’

হিন্দু ওয়েলফেয়ার বোর্ডের (বাংলাদেশ) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অ্যাডভোকেট ইন্দ্রজিৎ সাহা বলেন, ‘শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রস্তুতি চলছে। তিথি অনুযায়ী মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে এবং বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।’

২০২৬ সালের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ১০ অক্টোবর শনিবার মহালয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর ১৬ অক্টোবর মহাপঞ্চমী, ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী পালিত হবে। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।

সূত্র: Sarabangla

সম্পর্কিত সংবাদ