শাহজাদপুর সংবাদ

সংকটে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প, বন্ধ এক লাখ তাঁত

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৮:১৫ PM

সংকটে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প, বন্ধ এক লাখ তাঁত

একসময় সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প ছিল দেশের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্য। এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজার সংকট এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে এই ঐতিহ্যবাহী খাত। এরই মধ্যে সিরাজগঞ্জে প্রায় এক লাখ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এর প্রভাবে দুই লাখের বেশি তাঁতশ্রমিক বাধ্য হয়েছেন নিজেদের পুরোনো পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যেতে।

তাঁতি সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং উৎপাদনের তুলনায় বিক্রির সুযোগ কমে যাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। তবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের মতো কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাকবাটি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড তাঁতি সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার সংগঠনের ৩ শতাধিক সদস্যের অনেকেই বর্তমানে তাঁত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। তার মতে, পুঁজি সংকটের কারণে অনেক তাঁতি নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। ইতোমধ্যে এলাকার বিপুল সংখ্যক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বাজারে তাঁতের তৈরি পণ্যের চাহিদা আগের মতো নেই। ফলে একের পর এক তাঁত ইউনিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তা মো. ইমরানুল হক জানান, তার কর্ম এলাকায় থাকা ৩২ হাজার ১৫০টি তাঁতের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাঁতিদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি তাঁত ইউনিটের জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং একক তাঁতির জন্য সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ঋণের সীমা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের বাজারের বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারেও তাঁতের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, তৌহিদ হাসান নামে এক তাঁতি প্রথমবারের মতো ৫ লাখ টাকা ঋণ পেয়েছেন এবং নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা সুতা ও অন্যান্য উপকরণ সংগঠনের মাধ্যমে তাঁতিদের কম দামে দেওয়া হচ্ছে।

তবে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফেব্রিক লিমিটেডের মালিক প্রকৌশলী মো. নাজমুল জানান, সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও কয়েকটি সমস্যার কারণে এটি পিছিয়ে পড়ছে।

তার মতে, অনেক তাঁতি কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে সঠিক উৎস বেছে নিতে পারেন না। একই সঙ্গে তারা স্থানীয় বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। ব্যাংক ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেও অনেকের সমস্যা হয়।

তিনি বলেন, বেশি দামে সুতা, রং ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে হচ্ছে। কিন্তু তৈরি পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য কমে যাওয়ায় অনেক তাঁতি লোকসানে পড়ছেন।

সিরাজগঞ্জের পিপুলবাড়িয়া গ্রামের তাঁতশ্রমিক মো. শাহারুল ইসলাম নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, একসময় তার একাধিক তাঁত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন লোকসানের পর তিনি তাঁত বিক্রি করে ১৭ লাখ টাকা দেনা পরিশোধ করেছেন। বর্তমানে তিনি পেশা পরিবর্তন করে তিন চাকার যান চালাচ্ছেন।

একই গ্রামের তাঁত ব্যবসায়ী মো. শহিদুল ইসলামের ২৪টি তাঁত ছিল। ব্যবসার অবনতির কারণে তিনি এর মধ্যে ৯টি বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে ১৫টি তাঁত চালু থাকলেও লাভ হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ৩ লাখ টাকার কাপড় নিয়ে ফিরোজগঞ্জ বাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কাপড় বিক্রি করতে পারেননি। এতে যাতায়াতের খরচও লোকসান হয়েছে।

আরেক তাঁত ব্যবসায়ী মো. হাবিবুর রহমান জানান, শুধু সুতা ও রঙের দাম নয়, বিদ্যুৎ খরচ বৃদ্ধিও তাঁত শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। আগে যেখানে বেশি সংখ্যক তাঁত চালিয়েও তুলনামূলক কম খরচ হতো, এখন কম ইউনিট চালিয়েও বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য, প্রতিমাসেই সুতা, রং ও রাসায়নিক উপকরণের দাম বাড়ছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় কাপড়ের দাম বাড়ছে না। ফলে ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি ব্যবসায়িক সংকট নয়, এটি একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ঋণ বা প্রশিক্ষণ নয়, কাঁচামাল সরবরাহ, বাজার সম্প্রসারণ, আধুনিক নকশা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের সুযোগ বাড়ানো গেলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্র: citizensvoicebd.com

সম্পর্কিত সংবাদ