লোকসানের চাপে বন্ধ ৪০ শতাংশ কারখানা
১৫ আগস্ট, ২০২৬ এ ১:২৮ PM

একসময় দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লী।
কালের পরিক্রমায় এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে কারখানাগুলোয়। উৎপাদন বাড়াতে প্রতিটি কারখানায় যন্ত্রচালিত পাওয়ারলুম দিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা তৈরি হয়। তবে কয়েক বছর ধরে কাপড় উৎপাদনে ব্যবহৃত সুতা, যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন তাঁতিরা।
তাদের দাবি, কয়েক বছর ধরে তাদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। তবে সে তুলনায় কাপড় বেশি দামে বিক্রি করতে পারছেন না। এতে অনেক কারখানায় কাপড় উৎপাদনে ধস নেমেছে। অনেকে বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন। জেলার পাঁচ লাখ তাঁত কারখানার মধ্যে এরই মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানায় বাংলাদেশ পাওয়ারলুম অ্যান্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটি বলছে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কামারখন্দ, বেলকুচি, এনায়েতপুর, রায়গঞ্জ, চৌহালী ও কাজীপুরে কারখানাগুলোয় পাঁচ লাখের বেশি তাঁত রয়েছে। এর সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ তাঁতি পরিবার সরাসরি জড়িত। এ জেলায় বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার তাঁতপণ্য উৎপাদন হয়। উৎপাদন হয় প্রায় ৭০ কোটি মিটার কাপড়। এ কারণে তাঁত শিল্পকে জেলার ব্র্যান্ডিং ঘোষণা করা হয়। নাম দেয়া হয় ‘তাঁতকুঞ্জ সিরাজগঞ্জ’। এখানকার উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি হয়। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিং, রঙ ও সুতার মূল্যবৃদ্ধির কারণে জেলার তাঁত কারখানাগুলোয় উৎপাদনে ধস নেমেছে। চাহিদামতো বিদ্যুৎ ও শ্রমিক না থাকায় অধিকাংশ তাঁত কারখানা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বেকার হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা। অনেকে পেশা বদলাচ্ছেন।
তাঁত মালিকরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে আগে যেখানে ১০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে তিনজন কাজ করছেন। এতে শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার যতটুকু উৎপাদন হচ্ছে, তাও হাটবাজারে বিক্রি হচ্ছে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুতা ও যন্ত্রাংশের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচও আগের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকে বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ রেখেছেন।
তাঁতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে অনেক ব্যবসায়ী ও শ্রমিক বিপদে পড়বেন। কারণ অনেকেই লুঙ্গি ও শাড়ির কোম্পানিগুলো থেকে কাপড় সরবরাহের শর্তে অগ্রিম টাকা নিয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকলে শ্রমিকরা কাপড় উৎপাদন করতে পারবেন না। আর তাঁত মালিকরাও কোম্পানিগুলোকে কাপড় সরবরাহ করতে পারবেন না।
বেলকুচি তাঁত বোর্ড সমিতির সভাপতি হাজি বেলাল হোসেন জানান, এমনিতেই তাঁত মালিকরা নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁত মালিক ও শ্রমিক উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশ পাওয়ারলুম অ্যান্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বৈদ্যনাথ রায় জানান, তাঁতের ওপর নির্ভর করে সিরাজগঞ্জের মানুষের অনেকটা আয়-ব্যয়ের হিসাব চলে। সাম্প্রতিক সময়ে যে লোডশেডিং শুরু হয়েছে, তা যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য থেকে যায়, তাহলে তাঁতিদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী গ্রামের তাঁত শ্রমিক এনামুল হক ও কাশিয়াহাটা গ্রামের তাঁত মালিক শামীম উদ্দিন বলেন, ‘সুতা, রঙসহ তাঁত উপকরণের দাম লাগামছাড়া হয়েছে। এ কারণে তাঁতিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তারা জানান, দেশী সুতা (৫০ কাউন্ট) ১০০ পাউন্ডের দাম পাঁচ-ছয় বছর আগে ছিল ৫ হাজার টাকা। সেই সুতার দাম এখন ২১ হাজার টাকা। কাপড়ে নকশা করার জন্য ব্যবহৃত পলিয়েস্টার পাঁচ বছর আগে ছিল ৭০-৮০ টাকা পাউন্ড। এর দাম এখন বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা। এভাবে তাঁত উপকরণের প্রতিটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাঁত মালিকরা। এতে তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিরাজগঞ্জ তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজি বদিউজ্জামান বলেন, ‘প্রতিনিয়তই রঙ, সুতাসহ তাঁতের বিভিন্ন উপকরণের দাম বাড়লেও কাপড়ের দাম না বাড়ায় এ শিল্পে রুগ্ণতার সৃষ্টি হয়েছে। টিকতে না পেরে অনেক তাঁতি তাদের তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।’
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হাজি আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘তাঁতিরা নিজেদের উদ্যোগে কঠোর পরিশ্রম করে জেলায় তাঁত শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন। সিরাজগঞ্জের অর্থনীতি অনেকটা তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত। জেলার তাঁত শিল্প জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু তারা সেভাবে সুবিধা পাচ্ছেন না। তাই দেশীয় তাঁত শিল্প রক্ষায় সরকারকে তাঁতিদের ঋণ দেয়াসহ রঙ ও সুতায় ভর্তুকি দিতে হবে। সুতার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি তাঁতপণ্য বিক্রির বাজার তৈরি করতে হবে। তাহলেই তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করি।’
বিডিবিএল ভবন (লেভেল ১৭), ১২ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: পিএবিএক্স: ৫৫০১৪৩০১-০৬, ই-মেইল: [email protected], [email protected] (অনলাইন)
সূত্র: Daily Bonik Barta
সম্পর্কিত সংবাদ
শাহজাদপুরে সাজেদা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চারা বিতরণ
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৩:২১ PM · Daily Kaler Somaj
সিরাজগঞ্জে বাসের ধাক্কায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ২
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ২:৫৮ PM · nagorik tv
সিরাজগঞ্জের মাঠজুড়ে পেঁপের সমারোহ
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:০৪ PM · Daily Times Of Bangladesh
সিরাজগঞ্জে ৬৬ গ্রাম হেরোইনসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার, এস আরবির অভিযান
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৩৬ AM · tritiyamatra.com
