শাহজাদপুর সংবাদ

মা-বাবার কষ্ট দেখেই বড় স্বপ্ন তাদের

৩১ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:৩১ AM

মা-বাবার কষ্ট দেখেই বড় স্বপ্ন তাদের

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনের চতুর্থ পর্বে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।

সংসার চালাতে মা-বাবার কষ্ট তারা দেখেছে খুব কাছ থেকে। সেই কষ্ট কমানোর ইচ্ছাই তাদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করেছে। অভাবের সংসারে কেউ বাবার পাশে দাঁড়িয়েছে, কেউ নিজের পড়ার খরচ নিজেই জুগিয়েছে। সেই চেষ্টার ফল পেয়েছে চার শিক্ষার্থী—এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এখন তাদের চোখ উচ্চশিক্ষার দিকে, কিন্তু সেই পথের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার।

শারমিনের চোখে অনিশ্চয়তা

অভাবের সংসারে স্বপ্ন দেখা সহজ, কিন্তু সেই স্বপ্ন ধরে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামের শারমিন আক্তার সেই কঠিন পথেরই এক লড়াকু শিক্ষার্থী। অভাবকে সঙ্গী করে ইকরচালী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

এখন তার সামনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন; কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পড়াশোনার খরচ। শারমিনের বাবা সিরাজুল ইসলাম দিনমজুর। মা মনজিলা বেগম গৃহিণী। পাঁচ সদস্যের পরিবারে তাঁদের বসতভিটা ও ২০ শতক আবাদি জমি ছাড়া তেমন কোনো সম্পদ নেই। নিজের জমিতে চাষাবাদ করেও সংসারের তিন বেলা খাবার জোটে না। তাই অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে সংসার চালান বাবা।

সংসারের এই টানাপোড়েনের মধ্যেও থেমে থাকেনি শারমিন। নিজের পড়ার খরচ জোগাতে গ্রামের শিশুদের পড়িয়েছে। শারমিন বলে, ‘আমি চিকিৎসক হতে চাই। কিন্তু কলেজে পড়ানোর মতো সামর্থ্য আমার বাবার নেই। জানি না, আমার লেখাপড়া কত দূর পর্যন্ত যাবে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জুলফিকার ইসলাম বলেন, ‘শারমিন দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হলেও অদম্য মেধাবী। সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে সে আরও ভালো কিছু করতে পারবে।’

পরিবারে হাসি ফুটিয়েছে সুসমিতা

ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে সুসমিতা রানী মাহাতো। মাকে অবলম্বন করে চালিয়ে গেছে পড়ালেখা। নানা সংকটের মধ্যেও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছে সে।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের ভুইয়ট গ্রামের বাসিন্দা সুসমিতা রানী মাহাতো। তার জিপিএ-৫ প্রাপ্তি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারটিতে আনন্দ নিয়ে এলেও উচ্চমাধ্যমিকে পড়ালেখা নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।

পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার বিষমডাঙা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সুসমিতা রানী। তার বড় বোন সৌমিতা রানী মাহাতো সিরাজগঞ্জ নার্সিং কলেজে পড়ালেখা করছেন। সম্বল বলতে দাদার সামান্য আবাদি জমি। কাকা অনিল চন্দ্র মাহাতো সেই জমি চাষাবাদ করেন। তাতেই সংসারের সবার কোনোমতে দিন চলে।

সুসমিতার মা শিল্পী রানী মাহাতো বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটা পড়ালেখায় খুব ভালো। কলেজে পড়ালেখার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। কিছু সহযোগিতা পেলে মেয়েটা ভালোভাবে কলেজের পড়ালেখা শেষ করতে পারত।

সুসমিতা বলে, ‘উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো পড়ালেখা করে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই। কিন্তু পড়ালেখার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে সবাই।’

বিষমডাঙা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক চঞ্চল কুমার মাহাতো বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া পরিবারের মেয়ে সুসমিতা রানী মাহাতোর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ালেখার জন্য সহৃদয় কোনো ব্যক্তি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে আশা করি।’

কলেজে পড়ার খরচের চিন্তায় দিপ্ত

নীলফামারী কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসিতে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে দিপ্ত চন্দ্র রায়। চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে চায় সে। কিন্তু অটোরিকশা (ইজিবাইক) চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা বাবা দ্বিজেন্দ্র নাথ রায়ের পক্ষে ছেলেকে ভালো কলেজে পড়ানোর খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

দিপ্ত নীলফামারী জেলা সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের ডাঙাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। বিদ্যালয় থেকে বাড়ির দূরত্ব দুই কিলোমিটার। প্রতিদিন হেঁটেই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেছে সে। টিফিনের সময় অন্য শিক্ষার্থীরা বাইরে থেকে খাবার কিনে খেলেও অর্থাভাবে অনেক দিন অভুক্ত থাকতে হয়েছে তাকে।

দিপ্ত বলে, ‘আমি একজন চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই। এ জন্য ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু আমার বাবার সে সামর্থ্য নেই। কীভাবে কী হবে, বুঝতে পারছি না।’

দিপ্তর বড় বোন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। দ্বিজেন্দ্র নাথ রায় বলেন, সহায়-সম্বল বলতে ছয় শতাংশের ভিটেটুকুই। ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালানোই দায়। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য এনজিও থেকে অনেক ঋণ করতে হয়েছে। এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। ছেলেকে পড়ানোর টাকা পাবেন কোথায়?

দিপ্তর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলেটা অনেক ভদ্র ও মেধাবী। এখানে তাকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। সহযোগিতা পেলে সে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বলে আমি মনে করি।’

পাঠ্যবইয়ে ডুবে থাকত কাশফিয়া

টিফিনের সময় অন্য শিক্ষার্থীরা যখন খেলাধুলায় মগ্ন, তখনো ক্লাসেই পাঠ্যবইয়ে ডুবে থাকত কাশফিয়া নুরইন। পড়াশোনার প্রতি সেই একাগ্রতা আর কঠোর পরিশ্রমের ফলও পেয়েছে সে। নীলফামারীর সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে কাশফিয়া।

কাশফিয়াদের বাড়ি সৈয়দপুর শহরের মিস্ত্রিপাড়া মহল্লার মন্দির রোডে। জীর্ণ একটি ভাড়া ঘর। পরিবারের খরচে সহযোগিতা করতে পড়াশোনার পাশাপাশি দর্জির দোকানে তৈরি শার্টে বোতাম লাগানোর কাজ করে সে। তার বাবা নাসিম আহমেদ মহল্লায় ছোট একটি পান দোকান করেন। মা ফারজানা বেগম গৃহিণী। বড় ভাই এবার গোলাহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।

ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চাওয়ার কথা জানিয়ে কাশফিয়া বলে, ‘আমার ভালো ফলের পেছনে শিক্ষক, বাবা-মা ও অধ্যক্ষ স্যারের অবদান রয়েছে। পরীক্ষার সময় বাবা-মা নিজেরা না খেয়ে আমাকে ভালো-মন্দ খাইয়েছেন। মা রাত জেগে পাশে বসে থেকেছেন।’

বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কাশফিয়া আমাদের ফার্স্ট গার্ল। পড়াশোনার ব্যাপারে শিক্ষকেরা তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সে অনেক দূর যাবে বলে বিশ্বাস করি।’

মেয়ের জন্য দোয়া চেয়ে কাশফিয়ার বাবা নাসিম আলী বলেন, ‘জানি না তার উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে পারব কি না।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন প্রতিনিধি, নীলফামারী ও সৈয়দপুর, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ এবং তারাগঞ্জ, রংপুর]

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ