শাহজাদপুর সংবাদ

বেকারত্ব ঘোচাতে বিদেশমুখী সিরাজগঞ্জের মানুষ

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৮:১২ AM

বেকারত্ব ঘোচাতে বিদেশমুখী সিরাজগঞ্জের মানুষ

বেকারত্ব ঘোচাতে বিদেশমুখী সিরাজগঞ্জের মানুষরা। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জ: বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে সিরাজগঞ্জের নারী-পুরুষের একটি বড় অংশ এখন বিদেশমুখী। কর্মসংস্থানের আশায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ পাড়ি জমাচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এদের কেউ যাচ্ছেন সৌদি আরব, কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাত, কেউ কেউ আবার কাতার-ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। অনেকেই ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে ছুটছেন ইউরোপসহ অন্যান্য দেশেও।

বিদেশে গিয়ে কর্মসংস্থান পাওয়ার পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বদলে দিচ্ছে তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা। এর প্রভাব পড়ছে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। বাড়ছে স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা, ঘরবাড়ি নির্মাণ, জমি কেনাবেচা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ। সব মিলিয়ে প্রবাসী আয় সিরাজগঞ্জের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে বিদেশ যাওয়ার এই প্রবণতার বিপরীতে রয়েছে নানা ঝুঁকিও। দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে অনেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। কেউ বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বিদেশে গিয়ে আটক হচ্ছেন, কেউ আবার প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক পরিবার জমিজমা ও শেষ সম্বল বিক্রি করে সন্তান বা স্বজনকে বিদেশ পাঠিয়ে বিপাকে পড়ছে। ফলে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশযাত্রা যেমন সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলছে, তেমনি নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৩৭ হাজার ৮০৩ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে গড়ে প্রতি বছর সাত হাজারের বেশি মানুষ বিদেশ যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার আগ্রহও বাড়ছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।

শুধু ২০২৫ সালেই সিরাজগঞ্জ থেকে বিদেশ যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন ১০ হাজার ৩৮২ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১০ হাজার ২০২ জন এবং নারী ১৮০ জন। অর্থাৎ বিদেশগামীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি হলেও নারীদের অংশগ্রহণও রয়েছে। একই বছরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ১০ হাজার ৪৯৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১০ হাজার ৫৭ জন এবং নারী ৪৩৭ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা, কৃষিনির্ভর আয়ের অনিশ্চয়তা, তরুণদের কর্মসংস্থানের চাহিদা এবং বিদেশে তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ এসব কারণে মানুষের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

বিদেশে যাওয়া একজন কর্মীর আয় শুধু তার নিজের পরিবারের জীবনযাত্রাই বদলে দেয় না সেই অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রবাহিত হয়। বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ দিয়ে কেউ বাড়ি করছেন, কেউ জমি কিনছেন, কেউ ব্যবসা শুরু করছেন। আবার কেউ সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক অর্থবছরে সিরাজগঞ্জ জেলায় রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৫ দশমিক ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে সিরাজগঞ্জে প্রায় ১৫৮ কোটি টাকার রেমিট্যান্স আসছে।

এই বিপুল অর্থ জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি পরিবারের ভোগব্যয়ে গেলেও এর একটি অংশ জমি, বাড়ি, দোকান, পরিবহণ, কৃষি ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে একজন প্রবাসী শুধু নিজের পরিবারকেই সহায়তা করছেন না, তার আয় স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরেও ছড়িয়ে পড়ছে।

তবে বিদেশযাত্রার গল্প ভিন্নতাও আছে। বি‌দেশ ফেরত মো. বুদ্ধু শেখ সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানান, ‘বি‌দেশ সবার জন্য সুখকর নয়। অনেকেই বিদেশে গিয়ে ভালো কর্মসংস্থান ও আয় পেলেও অনেকে পড়ছেন বিপদে। দালালের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।’

বিদেশ ফেরত মো. বাবু মালা সারাবাংলাকে ব‌লেন, ‘দালালরা বিদেশে ভালো চাকরি, বেশি বেতন ও উন্নত জীবনযাপনের কথা বলে অনেকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেন। কেউ কেউ ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ কিংবা জমিজমা বিক্রি করে সেই টাকা জোগাড় করেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর দেখা যায়, প্রতিশ্রুত চাকরি নেই, বেতন কম অথবা থাকার পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ।’

কেউ কেউ আবার বৈধ ভিসার পরিবর্তে ভিজিট বা অন্যান্য অনুপযুক্ত ব্যবস্থায় বিদেশে গিয়ে আইনি জটিলতায় পড়েন। পরে দেশে ফিরতে গিয়ে আরও অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হয়। বিদেশ ফেরতদের কেউ কেউ অবশ্য নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তাদের অনেকেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ ও বৈধ প্রক্রিয়ায় পুনরায় বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তাও হয়ে উঠতে পারে।

সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়লেও নিরাপদ অভিবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দালালচক্র। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের অনেকেই সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানায় স্থানীয় দালালদের ওপর নির্ভর করেন। ফলে বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরির ধরন, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, বেতন, কর্মঘণ্টা, থাকার ব্যবস্থা, ভিসার ধরণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই না করেই অনেকে টাকা দিয়ে দেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশ যাওয়ার আগে অবশ্যই সরকারি নিবন্ধন করতে হবে। চাকরির চাহিদা, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও ভিসার সত্যতা যাচাই করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সিরাজগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে যাওয়া প্রতিটি কর্মী শুধু নিজের পরিবারের জন্যই কাজ করেন না, দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখেন। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে।

সিরাজগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মু. আব্দুল হান্নান সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিবন্ধন করে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই জেলার একজন করে রেমিট্যান্স যোদ্ধা। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে বিদেশগামীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস কাজ করছে।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে দালালের ওপর নির্ভর না করে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। বিদেশে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কাগজপত্র ও চাকরির তথ্য যাচাই করলে প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।’

সিরাজগঞ্জে কর্মসংস্থানের সংকট এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর বিদেশমুখী প্রবণতার মধ্যে রেমিট্যান্স এখন জেলার অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার রেমিট্যান্স আসার তথ্যই এর গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগকে টেকসই করতে হলে শুধু বিদেশ পাঠালেই হবে না, দক্ষ কর্মী তৈরি, নিরাপদ অভিবাসন, সঠিক তথ্য সরবরাহ এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন ও দেশে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ, অভিবাসী কর্মী তার পরিবারের জন্য যেমন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তৈরি করেন, তেমনি তার পাঠানো অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা গেলে সিরাজগঞ্জের বিদেশগামী কর্মীরাই হতে পারেন জেলার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি। তবে বিদেশ যাওয়ার আগে সঠিক তথ্য যাচাই, সরকারি নিবন্ধন ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই হতে পারে প্রতারণা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সূত্র: sarabangla.net

সম্পর্কিত সংবাদ