শাহজাদপুর সংবাদ

ঐতিহ্যবাহী এই পেশাগুলো কেন হারিয়ে যাচ্ছে

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:০০ PM

ঐতিহ্যবাহী এই পেশাগুলো কেন হারিয়ে যাচ্ছে

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হয়তো এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না মাটির হাঁড়ি–কলসি বানানো মানুষটিকে। আগের মতো শোনা যায় না কামারের হাতুড়ির শব্দ। বাঁশ বেত দিয়ে নানা জিনিস তৈরি করা কারিগরদেরও দেখা মেলে কম। সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাপন। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের পরিচিত কিছু পুরোনো পেশা।

মাটির সঙ্গে যাঁদের জীবনএকসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামেই ছিল কুমারপাড়া। মাটি দিয়ে হাঁড়ি, কলসি, পাতিল, ফুলের টবসহ নানা ধরনের জিনিস তৈরি করতেন কুমারেরা। এসব জিনিস ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়ামসহ নানা ধরনের আধুনিক সামগ্রী মাটির জিনিসের জায়গা দখল করেছে। ফলে কুমারদের কাজও কমে গেছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

কামারের আগুনও যেন নিভে আসছেএকসময় গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য ছিল কামারের দোকান। আগুনের সামনে বসে লোহা পিটিয়ে দা, বঁটি, কোদাল, কাস্তেসহ নানা কৃষি সরঞ্জাম তৈরি করতেন কামারেরা। তাঁদের হাতের তৈরি এসব জিনিস ছাড়া গ্রামের মানুষের জীবন কল্পনা করাও কঠিন ছিল।

এখন আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কারখানায় তৈরি পণ্যের কারণে কামারদের কাজ অনেক কমে গেছে। আগে যেখানে নিয়মিত কাজ থাকত, এখন অনেক সময় দিনের পর দিন বসে থাকতে হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশায় আসতে চান না।

বাঁশ–বেতের কারিগরদেরও বদলে গেছে সময়বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি জিনিসও একসময় মানুষের ঘরে ঘরে দেখা যেত। ঝুড়ি, চালুনি, কুলা, মোড়া, ডালা থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্যবহার্যসামগ্রী তৈরি করতেন বাঁশ–বেতের কারিগরেরা।

এখন প্লাস্টিক ও কারখানায় তৈরি পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে এসব পণ্যের চাহিদা কমেছে। ফলে অনেক কারিগর আগের মতো কাজ পান না। কেউ কেউ পেশা বদলেছেন। কেউ আবার শুধু শখের বশে কাজ করে যাচ্ছেন।

শুধু পেশা নয়, হারিয়ে যাচ্ছে গল্পওএকটি পেশা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কাজের সুযোগ কমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় বহু বছরের অভিজ্ঞতা। হারিয়ে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দক্ষতা।

একজন কারিগর শুধু একটি জিনিস তৈরি করেন না, সঙ্গে তৈরি হয় একটি গল্প। তাঁর হাতের কাজের মধ্যে থাকে তাঁর পরিবার, পূর্বপুরুষ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির ছাপ। সেই পেশা হারিয়ে গেলে গল্পগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

কেন এসব পেশায় তরুণেরা আসতে চান নাপুরোনো এসব পেশার বেশির ভাগই শারীরিক পরিশ্রমের। পাশাপাশি আয়ও সব সময় নিশ্চিত নয়। বর্তমান সময়ে তরুণেরা তুলনামূলক স্থায়ী ও ভালো আয়ের পেশার দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ফলে পারিবারিক পেশা থাকলেও অনেকেই সেটি ধরে রাখতে চান না।

এর সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও একটি কারণ। অনেক সময় হাতে কাজ করা বা কারিগরি পেশাকে ছোট করে দেখা হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব পেশার আকর্ষণ আরও কমে যায়।

তাহলে কি সবই হারিয়ে যাবেহয়তো সবকিছু হারিয়ে যাবে না। সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচি বদলালেও ঐতিহ্যবাহী জিনিসের প্রতি আগ্রহ এখনো আছে। মাটির তৈরি পণ্য, বাঁশ–বেতের সামগ্রী কিংবা হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিস এখন অনেকেই সৌন্দর্য ও পরিবেশবান্ধবতার কারণে ব্যবহার করেন।

প্রয়োজন শুধু সঠিক মূল্যায়ন। কারিগরেরা যদি তাঁদের পণ্যের ন্যায্য দাম পান এবং এসব পণ্যের জন্য ভালো বাজার তৈরি হয়, তাহলে পুরোনো অনেক পেশাই নতুনভাবে ফিরে আসতে পারে। প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের আগ্রহ এবং সমাজের সম্মান।

একজন বৃদ্ধ কারিগর হয়তো এখনো তাঁর ছোট্ট কর্মশালায় বসে ধীরে ধীরে কাজ করে যাচ্ছেন। চারপাশ বদলে গেছে। বদলে গেছে মানুষের প্রয়োজন। কিন্তু তাঁর হাতের কাজের মধ্যে এখনো বেঁচে আছে বহু বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্য।

রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ