শাহজাদপুর সংবাদ

“আদর্শের মৃত্যু ও একটি তারা”

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:১৯ PM

“আদর্শের মৃত্যু ও একটি তারা”

লায়ন মাহফুজ রহমান :

ইনকিলাবি মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা, সংগঠনের মুখপাত্র থেকে দেশীয় টেকসই শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রগতি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক দর্শনে এ দেশের নবজাগরণের অন্যতম প্রশিক্ষক ও আলোচক হয়ে উঠেছিলেন এক যুবক। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা গ্রামের এক তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠে আসে জাতীয় মঞ্চে। তিনি একাধারে শিক্ষক, লেখক, গবেষক, নজরুলভক্ত ও মুক্তমঞ্চের বলিষ্ঠ আবৃত্তিকার, কোরআন-হাদিসের ধারক এবং মুসলিম উম্মাহর নিবেদিতপ্রাণ। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পূর্ব ও পরে তার উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত। যারা বিভিন্ন সময়ে টিভিতে টকশো, আলোচনা বা টিভির পর্দায় চোখ রেখেছেন তারা হাদির কথা যথেষ্ট শুনেছেন! আজকের গণঅধিকার, এনসিপি, এবি পার্টির যুবাদের কাছে হাদি আদর্শিক গুরু হয়ে উঠতে পেরেছিলেন!

হাদি বেঁচে থাকতে দেশের মানুষ যতটা না তাকে জানতেন, তার মৃত্যু তাকে আরও জীবন্ত করে গেছে। হাদিকে জানেন না বা বোঝেন না, তাদের জন্য ইউটিউবে ছোট্ট ছোট্ট ক্লিপ দেখার আমন্ত্রণ রইল। হাদিকে নিয়ে এখনো পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনা-সমালোচনা হয়! তার তির্যকপূর্ণ আলোচনা অনেকেই ভালোভাবে নিতেন না। অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ! বিএনপির কাছে তিনি ছিলেন অপ্রয়োজনীয়।

হাদিকে বুঝতে না পারা সেটা ব্যক্তি বিশেষের সীমাবদ্ধতা। কেননা আমাদের দুটি প্রজন্ম পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে! বাকি যা আছে তা দলকানা। রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে বিএনপি কর্মীরা তাকে ধারণ করতে ব্যর্থ, তাদের অপ্রতুল শিক্ষা ও প্রগতিশীলতার অনুপস্থিতির কারণে। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যতটুকু গভীরতা দরকার, দলের কর্মীদের মধ্যে শিক্ষার সেই গভীরতা নেই। আওয়ামী লীগ হাদিকে ভারতবিদ্বেষী মনে করতেন, বিধায় তাদের হাতেই শহীদ হয়েছেন! দেশের বাকি বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ এবং বামপন্থীরা তাকে ধর্মীয় অবয়ব দিয়ে দূরে রেখেছিলেন। দেশের বাকি খুচরা জনগণ হাদি বেঁচে থাকা অবস্থায় তেমন একটা তাকে জানতেন না। এনসিপি এবং জামায়াত হাদিকে ধারণ করতে পেরেছিলেন শুধু মাত্র তার জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, কৃষ্টি, রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক হয়ে ওঠার কারণে।

হাদি বরাবরই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ভক্ত ছিলেন। আদর্শিক জায়গা থেকে তিনি জিয়ার আদর্শে বেড়ে ওঠেন। মাওলানা ভাসানী ছিলেন তার অন্যতম রাজনৈতিক আদর্শের জায়গা। সেখান থেকে শহীদ জিয়া ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম সমর্থক ও সার্থক নেতৃত্ব তৈরি করেছিলেন। ইনকিলাব মঞ্চের প্রবর্তক হিসেবে তিনি একাধারে শিক্ষক ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।

অহিংস, ভোগবিলাসী আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে আজকে যে তথাকথিত ছাত্র নেতৃত্ব, সেটা অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অদক্ষতা ও নারীলোলুপ নেতৃত্ব! অশিক্ষা এক প্রকার অন্ধত্ব আর কুশিক্ষা সেই অন্ধকারের জাহেল মাত্র! নেতৃত্ব অশিক্ষিত, খুনি, লুটেরাদের হাতে জিম্মি। নেতারা তাদের নেতৃত্ব নিরাপদ আর সুরক্ষিত রাখতে ইচ্ছেমতো লাঠিয়াল আর হাতিয়ার তৈরি করেছে মাত্র। এই লাঠিয়াল কর্মীবাহিনীকে আপনি কোনোভাবেই মুজিব সেনা, জিয়ার সেনা বলতে পারেন না! নিশ্চিতভাবেই অন্ধ ভক্তরা কেউই শহীদ জিয়া আর শেখ মুজিবের উত্তরসূরি নয়।

হাদি ওই ঘুণেধরা নেতৃত্বের পরিবর্তন চেয়েছিলেন মাত্র। তাই তিনি নিজ যোগ্যতায় মাওলানা ভাসানী নির্ভর দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব তৈরিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি নেতৃত্বের কারিগর হয়ে হাজারো যুব নেতৃত্ব রেখে গেছেন, যেমনটা শহীদ জিয়ার আদর্শিক নীতি-নৈতিকতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী গুণাবলীর মাধ্যমে। যে অন্ধ বিলাসিতা আর অদক্ষতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে, সেই একই ত্রুটিতে বিএনপিও দুষ্ট। একটা দল সংখ্যায় যতই কর্মীবান্ধব হোক না কেন, অযোগ্যতা ও সীমাহীন নৈতিক স্খলন তার অধঃপতন অনিবার্য করে তোলে। আওয়ামী লীগ তার জীবন্ত ফসিল। আপনারা যতই স্লোগান দেন—এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে” আসলে তার আদর্শের সৈনিক এই দলে অনুপস্থিত! একই অবস্থা বিএনপিতে। আদর্শিক জিয়া মানে এই না যে একটা অফিস ভাড়া করে জিয়া পরিবারের ছবি টাঙিয়ে দোকানদারি করা। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক দোকানবান্ধব হাতিয়ার বাহিনী। এই দোকানগুলো বন্ধ করে দেন, কর্মী খুঁজে পাবেন না! যে আওয়ামী লীগের তিন কোটি কর্মী, যাদের লক্ষ লক্ষ অফিস আর আউটলেট, ক্ষমতার পালাবদলে আজ তারা জনশূন্য, তাদের অস্তিত্ব বিলীন। যেমনটা বলছিলাম, আদর্শের মৃত্যুজনিত কারণে আওয়ামী লীগের সাম্রাজ্য পতন। শেখ মুজিব আজকে কতটুকু বেঁচে আছেন? কর্মীরা কি তাকে বিক্রি করেননি? তার দল কি তাকে নিলামে তোলেনি? বিএনপি যদি সেই একই ভুলে তার আদর্শিক মৃত্যু ঘটায়, আশ্চর্য হব না, কেননা সেটাই হবে নিয়তি। যে দোষে আওয়ামী লীগ বিতাড়িত, সেই একই কারণে বিএনপি যদি নিগৃহীত হয়, আশ্চর্য হব না!

নেতৃত্ব বেঁচে থাকে আদর্শের মধ্যে দিয়ে, আদর্শ না থাকলে তার মৃত্যু অনিবার্য। আওয়ামী লীগের মৃত্যু সেই আদর্শের অকাল প্রয়াণে। যাদের ৩ কোটি কর্মী, তারা কী করে বিলীন হয়ে যায়? যারা নিজেদেরকে রাজনৈতিক কর্মী পরিচয় দেন, তারা আদতেই দলের সুবিধাভোগী। আর এভাবে পুরো দলই যখন সুবিধাভোগীতে পরিণত হয়, তখন তার মৃত্যু অনিবার্য!

হাদি তার রক্ত দিয়ে জাতীয়তাবাদী আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আমৃত্যু সেই আদর্শের কথাই বলে গেছেন। আজকে মৃত হাদি জীবিত হাদির চেয়েও আরও বেশি উজ্জীবিত, আরও বেশি ধারালো। হাদির রেখে যাওয়া আদর্শিক কর্মীরা আগামীর দেশ পরিচালনায় নেতৃত্বের জানান দিচ্ছে। যেভাবে ৬৯-এর যুব নেতৃত্ব বাংলাদেশকে ৫০ বছর নেতৃত্ব দিয়ে গেছে, এনসিপি, জামায়াত, এবি পার্টি, গণঅধিকার ও ২৪-এর নেতৃত্ব আগামীর বাংলাদেশকে সমানভাবে নেতৃত্ব দেবে। যারা এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না, সেটা তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা। যতদিন এই আদর্শকে কর্মীরা বাঁচিয়ে রাখবে, হাদি ঠিক ততদিন বেঁচে থাকবেন!

এবারের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট প্রচারণায় হাদি ছিলেন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। গণভোট প্রচারণায় তার নাম উচ্চারিত হয় শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে মহল্লায়, প্রতিটা ঘরে, চায়ের আড্ডায়, নরসুন্দরের দোকানে, হাটে-বাজারে। গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আর ‘না’ ছিল ভারতের স্বার্থে। তাই হাদির নাম অনুসারে উচ্চারিত হয়েছে— ‘হ্যাঁ’তে হাদি আর ‘না’তে মোদি।

নীতি-নৈতিকতাবর্জিত দূষিত বাজারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দোকানগুলো শহীদ জিয়া আর শেখ মুজিবের আদর্শ থেকে যোজন যোজন দূরে। জাতীয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে যে পালিত লাঠিয়াল বাহিনী তারা তৈরি করেছেন, সেটা কোনো আদর্শ নয়। দুটি দলের আদর্শের মৃত্যু উসমান হাদির কাছে অপমৃত্যু হয়েছে। এভাবেই সে বেঁচে থাকবে নবীন যুবক ও আদর্শিক রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে। সে বেঁচে থাকবে জাতীয়তাবাদী বাংলার সবুজে রক্তিম সূর্য হয়ে, বেঁচে থাকবে অনাগত প্রজন্মের ধারক ও বাহক হয়ে! বেঁচে থাকবে ধ্রুব নক্ষত্র হয়ে।

ধন্যবাদ সবাইকে।

লেখক : লায়ন মাহফুজ রহমানরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মীপ্রবাসী পেশাজীবী সম্পাদক, কেন্দ্রীয় পেশাজীবী অধিকার পরিষদ (বিপিআরসি)কনসালটেন্ট এজেন্ট, ব্রিটিশ কাউন্সিল

The post “আদর্শের মৃত্যু ও একটি তারা” appeared first on দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ.

সূত্র: দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ

সম্পর্কিত সংবাদ