শাহজাদপুর সংবাদ

আগামী সপ্তাহগুলোতে কোন কোন জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৭:৩২ AM

আগামী সপ্তাহগুলোতে কোন কোন জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি

ডেঙ্গু ছড়িয়েছে দেশের ৬৪ জেলায়। প্রতিদিন কয়েক শ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে মৃত্যু হচ্ছে। সরকার বলছে, সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হবে। তবে অন্তত ১৫ জেলায় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।

এমন অবস্থায় আজ শনিবার থেকে সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামছে সরকার। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন মাস ধরে এই কর্মসূচি চলবে বলে জানা গেছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) চার বছরের তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলেছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালীতে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদদের একটি অংশ দেড়–দুই মাস আগে থেকে বলে আসছিলেন যে সেপ্টেম্বর–অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার ঝুঁকি আছে। ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গু বাড়তে শুরু করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ও অক্টোবরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুর ‘পিক’ (সর্বোচ্চ প্রকোপ) সময়টি আসতে যাচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনসম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা সম্ভব না। শনিবার প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভবন এলাকা থেকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ও প্রচার কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। তিন–চারটি মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত থাকবে। স্বেচ্ছাসেবক, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সদস্য, বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এতে অংশ নেবেন।’ তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক শনিবারে এই কাজ হবে, চলবে তিন মাস। এ ছাড়া এই সময় শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার করবে, পরিচ্ছন্ন রাখবে।

জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক হওয়ার কথা ছিল না। ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য। প্রায় একই ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশের জনপদ ঢাকা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা। কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে।

ঢাকায় তথা বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রকোপ দেখা দেয় ২০০০ সালে। এর পর থেকে প্রতিবছর এডিস মশাবাহিত এই রোগে মূলত ঢাকা শহরের মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এই রোগ ছিল মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরের। ২০১৯ সালে প্রথম সারা দেশে এই রোগ ছড়ায়। গত আড়াই দশকে মশা নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগ না নেওয়ায়, মানুষকে কার্যকরভাবে সচেতন ও সম্পৃক্ত না করায় এই রোগ স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই সঙ্গে দেশের সব জেলায় এখন হামের সংক্রমণ চলছে। এ বছর হামে এক হাজারের বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বেশি মৃত্যু হয়েছে শিশুদের। যেসব পরিবারে শিশু আছে, সেসব পরিবারে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম নিয়েও উদ্বেগ আছে।

গতকালের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মৃত্যু বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৫ জনের। জুন মাসে মৃত্যু হয় ১৩ জনের। পরের মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ে মৃত্যু বেড়ে হয় ৩৬। আগস্টে আরও বেড়ে হয় ৪৩। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনে মারা গেছেন ৪৪ জন। এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন মোট ১৪১ জন।

এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৯ হাজার ২২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন আগের মাসের চেয়ে বেশি। বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু খুলনা বিভাগে।

সরকারি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তের হার পুরুষের বেশি, মৃত্যুর হার নারীর বেশি। এ পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৬২ শতাংশ পুরুষ, বাকি ৩৮ শতাংশ নারী। কিন্তু মৃত ব্যক্তিদের ৫২ শতাংশ নারী, বাকি ৪৮ শতাংশ পুরুষ।

আইইডিসিআর ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর কিছু বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে। তারা বলছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কম আছে। ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান। ওই বছর আক্রান্ত হয়েছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন, মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মৃত্যুহার ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৪৯ ও শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ বছর ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ।

তবে গতকাল পর্যন্ত এ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুহার সামান্য হলেও বাড়তির দিকে, শূন্য দশমিক ২৯।

আইইডিসিআর এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৭১ জন রোগীর নমুনা বিশ্লেষণ করে বলেছে, ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণ ঘটছে ডেঙ্গুর ডেনভি৩–এর কারণে। বাকি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণ ঘটাচ্ছে ডেনভি২। বরগুনা ও বান্দরবান জেলায় সংক্রমণ হচ্ছে ডেনভি২–এর কারণে। আর পিরোজপুরে ডেঙ্গুর ধরন ডেনভি২।

রোগতত্ত্ববিদেরা বলেন, ডেঙ্গুর ভাইরাসের চারটি স্ট্রেইন বা ধরন আছে—ডেনভি১, ডেনভি২, ডেনভি৩ ও ডেনভি৪। এর একটি ধরনে আক্রান্ত হলে মানুষের শরীরে সেই নির্দিষ্ট ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। কেউ একবার ডেনভি১ আক্রান্ত হলে তিনি আর কখনো ওই ধরনে আক্রান্ত হবেন না। তবে বাকি তিনটি ধরনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ একজন মানুষ মোট চারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। প্রথমবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে জটিলতা বাড়ে, তৃতীয়বারে জটিলতা ও জীবনের ঝুঁকি আরও বাড়ে।

আইইডিসিআরের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরনই সক্রিয় আছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ ও আলোচনা–সমালোচনা হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের আন্তরিকতার অভাব দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় অভাব দেখা গেছে কাজের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে। ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা নিধনের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। আর ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মস্ত্রণালয়ের। জনস্বাস্থ্যবিদেরা অনেক বছর ধরেই বলে আসছেন যে এই দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। কিন্তু সমন্বয় দেখা যায়নি।

ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে উপেক্ষা করার উদাহরণও আছে। ঢাকা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগতত্ত্ববিদ ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। অনেকের সঙ্গে কথা বলে ওই বিশেষজ্ঞ ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা দলিল তৈরি করেন। পরিকল্পনার উদ্দেশ্য আক্রান্তের হার ও ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানো। দলিলে রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য–শিক্ষা–যোগাযোগবিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে ‘র‌্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ১২টি মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে বলা ছিল। ২০১৯ সালের মধ্যে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি।

এরপর ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল মশা বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়ে বি এন নাগপাল তাঁর পরামর্শে বলেছিলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মাধ্যমে এডিস মশা কমানো সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনের কর্মী ঘরের মধ্যে ঢুকতে পারেন না। কিন্তু এ মশা বিশ্রাম নেয় টেবিল-চেয়ারের নিচে, সোফার নিচে, বিছানার নিচে, পর্দার পেছনে, আলমারির পেছনে; অর্থাৎ যেখানে অন্ধকার থাকে। কারণ, এ মশা হাইড্রোফিলিক মশা। এর অর্থ হলো, এ মশা আর্দ৶তা পছন্দ করে। কিন্তু বি এন নাগপালের পরামর্শের বিষয়ে মানুষকে জানানো, মানুষকে সচেতন করার কোনো উদ্যোগ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে নিতে দেখা যায়নি।

ডেঙ্গু একসময় মূলত ঢাকা শহরের রোগ ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। গত কিছুদিন দেখা যাচ্ছে ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি রোগী খুলনা জেলায়। দুই সপ্তাহ আগে বেশি রোগী দেখা গিয়েছিল দক্ষিণের ছোট জেলা পিরোজপুরে। গত বছর হঠাৎ ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয় বরগুনা শহরে। তবে মশা নিধনের আলোচনা হয় মূলত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ বাকি ১০ সিটি করপোরেশন নিয়ে। দেশের পৌরসভাগুলোতে মশা ও মশার ওষুধ ছিটানো নিয়ে কী হচ্ছে, তা জানা যচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলের মশা পরিস্থিতি নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনাই নেই। সারা দেশ নিয়ে কর্মসূচি সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবে সঠিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। রেড ক্রিসেন্টকে স্বেচ্ছাসেবক সম্পৃক্ত করার দায়িত্ব দিতে হবে। তিন মাস পরে এই কর্মসূচির মূল্যায়ন করতে হবে। কাজটি দেশজুড়ে সারা বছর ধরে করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কয়েক বছর তা অব্যাহত রাখতে হবে। মানুষকে বলতে হবে জ্বর হলে অবহেলা নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের কর্মীদের এই কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহবান জানানো দরকার।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ