শাহজাদপুর সংবাদ

২০ পাল পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন সমীর

১৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:২২ PM

২০ পাল পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন সমীর

শ্রাবণের বিকেল। মেঘে ঢাকা আকাশ। বরিশালের বাকেরগঞ্জের কলসকাঠি পালপাড়ার ছোট্ট কর্মশালায় একটিমাত্র বৈদ্যুতিক বাতির আলো মিটমিট করে জ্বলছে। চারদিকে সারি সারি সাদা মাটির ঘট (পাত্র)। কোনোটি খড়িমাটির প্রলেপে ঢাকা, কোনোটি হলুদ রঙে দেবীর অবয়বের প্রথম রেখা পেয়েছে। মেঝেতে বসে মৃৎশিল্পী সমীর পাল। সামনে রঙের পাত্র, হাতে সরু তুলি।

ধীরে ধীরে সমীর আঁকছেন দেবী মনসার মুখ, কালো চুল, লাল শাড়ি ও মাথার ওপর ফণা তোলা সাপ। তুলির কয়েকটি আঁচড়ে সাদা মাটির ঘটটি যেন প্রাণ ফিরে পায়। শ্রাবণসংক্রান্তি ঘিরে মনসাপূজার আয়োজন চলছে। পূজাটির অন্যতম উপকরণ মনসাঘট তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন সমীর পাল। একসময় বাকেরগঞ্জের কলসকাঠি পালপাড়ায় অনেক পরিবার এই বিশেষ ঘট তৈরি করত। এখন সেখানে এ কাজ করছেন একমাত্র সমীর পাল।

বাংলার লোকবিশ্বাসে মনসা সর্পদেবী হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা, পরিবারের মঙ্গল, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির আশায় তাঁর পূজা করা হয়। বরিশাল অঞ্চলে মনসাপূজার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মনসামঙ্গল কাব্য ও কবি বিজয় গুপ্তর স্মৃতি।

যেখানে মাটি কথা বলে

গত ৩০ জুলাই পূজার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে কলসকাঠির পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা। কোথাও কাঁচা মাটি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও ছাঁচে তৈরি হচ্ছে ঘট। নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউ না কেউ কোনো কাজে ব্যস্ত। কেউ মনসার প্রতিমা গড়ছেন, কেউ লক্ষ্মী বা সরস্বতীর প্রতিমা। তবে চোখে পড়ে সারি সারি মনসাঘট।

স্থানীয় লোকজন বলেন, একসময় পালপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই মনসাঘট তৈরি করত। এখন প্রায় ২০টি পাল পরিবারের মধ্যে কলসকাঠিতে এ কাজ করেন শুধু সমীর পাল।

সমীরের বয়স ৩৫ বছর। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা নারায়ণ চন্দ্র পালের কাছ থেকে এই কাজ শেখেন। পড়াশোনার ফাঁকে বাবাকে কাজে সহযোগিতা করতেন। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে আসে। তখন তিনি এইচএসসি পাস করেছেন। পড়াশোনা ছেড়ে পুরোদমে মৃৎশিল্পের কাজে যুক্ত হন।

সমীরের সংসারে স্ত্রী অনিমা, দেড় বছরের মেয়ে শ্রেয়সী এবং বৃদ্ধ মা পুষ্প রানী। সমীর পাল বলেন, সামনে মনসাপূজা, তাই এ সময় বেশি ব্যস্ত।

বিজয় গুপ্তর স্মৃতিও জড়িয়ে

মনসাপূজার ইতিহাস বাংলার সাহিত্য ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলার মানুষের কাছে মনসার সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিচয় এসেছে মনসামঙ্গল কাব্যর মাধ্যমে। চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে দেবী মনসার দ্বন্দ্ব, লখিন্দরের সর্পদংশনে মৃত্যু এবং মৃত স্বামীকে ভেলায় নিয়ে বেহুলার দেবলোকে যাত্রার কাহিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার মানুষের মধ্যে প্রচলিত। এই কাহিনি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ নয়, বাংলা সাহিত্য, সংগীত, পালাগান ও লোকনাট্যেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলায় কবি বিজয় গুপ্তর স্মৃতিবিজড়িত মনসামন্দির আছে। শ্রাবণ এলেই সেখানে মনসামঙ্গলের পদাবলি পাঠ ও পূজার আয়োজন হয়। মনসাপূজা ও মনসামঙ্গল কাব্যর নানা উপাদান বরিশালের লোকসংস্কৃতির সঙ্গেও মিশে আছে।

বরিশাল চারুকলার সংগঠক ও মৃৎশিল্প নিয়ে কাজ করা সুশান্ত ঘোষ বলেন, ‘অন্য এলাকার ঘটের তুলনায় বরিশালের ঘটের বিশেষত্ব এর গঠনে। এখানে ঘটের আকৃতির সঙ্গে পবিত্রতা ও উর্বরতার প্রতীকী ধারণা যুক্ত। এটি স্থানীয় মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের অংশ।’

টিকে থাকার লড়াই

সমীর পাল এবার প্রায় ১৫০টি মনসাঘট তৈরি করছেন। প্রতিটির দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। একটি ঘট তৈরিতে খরচ হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। সমীর পাল বলেন, ‘আগের মতো চাহিদা নেই। হিসাব করলে এই কাজ করে সংসার চালানো কঠিন। তারপরও ছাড়তে পারি না। এ কাজই তো আমাদের পরিচয়।’

একসময় যে পালপাড়ায় বহু পরিবার মনসাঘট তৈরি করত, সেখানে এখন হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সমীরের হাতে একেকটি মাটির ঘট তৈরি হয়। পূজা শেষে সেগুলো হয়তো হারিয়ে যাবে কোনো ঘরের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে। কিন্তু সেই ঘট তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরের দক্ষতা ও উত্তরাধিকার টিকে থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ