হরমুজ প্রণালি কি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে পারে, ট্রাম্পের হুমকি কতটা বাস্তব
১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:৩৮ AM

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার বলেছেন, তিনি ‘খুব শিগগির’ হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করবেন। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে এ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের ওই হুমকিকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। ইতিমধ্যে গতকাল রোববার দুই দেশের মধ্যে গত জুনে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে এমন উত্তেজনা তৈরি হলো।
ইরান হরমুজ প্রণালিকে বিশ্ব অর্থনীতি অচল করে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ এক হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। সেই জায়গা থেকে দেশটি জলপথটি বন্ধ করে রেখেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোয় নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে।
কে আগে নতি স্বীকার করবে—সে লড়াইয়ে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনাকে ‘দাবার লড়াইয়ের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের সামরিক হুমকির একটি নির্দিষ্ট ধরন দেখা গেছে। অনেক সময় তিনি ইরানের ওপর হামলার হুমকি দিয়েও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেছেন।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের অংশ করতে পারে? আর এমন ঘোষণা কী অর্থ বহন করে?
ট্রাম্প কী বলেছেন
শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ইরান শোচনীয়ভাবে হারছে। দেশটিকে পুরোপুরি পরাজিত করার পর শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করব।’
নৌ অবরোধের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি কার্যত এখনই যুক্তরাষ্ট্রের অংশে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মূলত এটি এখন তা-ই। আমাদের অবরোধ চলছে। আমরা না চাইলে কোনো জাহাজ সেখান দিয়ে যেতে পারবে না।’
তবে ইরান দাবি করছে, নৌপথটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নৌ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি সত্ত্বেও অবরোধ উপেক্ষা করে কিছু জাহাজ সেখান দিয়ে চলাচল করেছে।
ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা কিম্বার্লি হ্যালকেট বলেন, ‘ট্রাম্প কথাটি বলার সময় হাসছিলেন। এটি স্পষ্ট যে তিনি নিজেও বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে বলছেন না।’
হ্যালকেট আরও বলেন, এ নৌপথ ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। ট্রাম্প মূলত প্রতিপক্ষকে খেপিয়ে তুলতে পছন্দ করেন। এ ক্ষেত্রেও তিনি ইরানের সঙ্গে তা-ই করছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে, তা থেকে তারা পিছিয়ে আসছে না।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি গতকাল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বলেছেন, এ অঞ্চল রক্ষায় নিয়োজিত ইরানি বাহিনী প্রয়োজনে ট্রাম্পের ‘পা ভেঙে দেবে’।
ইরানের সেনাপ্রধান বলেন, ‘ইরানকে নিয়ে এ ধরনের রসিকতা করা একটি বড় ভুল। কারণ, এটি ইরান। আর এ দেশের এমন সব যোদ্ধা রয়েছেন, যাঁরা আপনার পা ভেঙে দেবেন।’
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘অপরাধী’ ও ‘নির্বোধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘বাজে কথা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদিও বলেন, ‘টুইট করে, বিমানবাহী রণতরি পাঠিয়ে, কোনো আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়।’
ঘারিবাবাদি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, আছে ও থাকবে। এ প্রণালি শুধু ইরানের নির্দেশেই খোলা বা বন্ধ হবে। যতক্ষণ আপনারা পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নেবেন এবং অলীক ভাবনাচিন্তা বন্ধ না করবেন, ততক্ষণ ইরান অবরোধ কার্যকর রাখবে।’
হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ উপকূলে ওমানের অবস্থান। উত্তরে ইরান। প্রণালির নৌ চলাচল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মাসকাটের (ওমানের রাজধানী) সঙ্গে আলোচনা শিগগির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
তবে আরাগচি স্পষ্ট করেছেন, নৌপথটি আবারও খুলে দেওয়া একটি আলাদা বিষয়। এ জন্য ওয়াশিংটনকে জুনের সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, যার মধ্যে ইরানের বন্দরে নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা অন্যতম।
ট্রাম্পের দাবি কি আদৌ বাস্তবসম্মত
প্রথমত, শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একতরফা ঘোষণার মাধ্যমে কোনো অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব পরিবর্তন হবে না। এর আগে ট্রাম্প পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ দখলে মার্কিন সেনা পাঠানোর হুমকি দিয়েছিলেন। তেহরান তখন পাল্টা জবাবে বলেছিল, তাদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদস্যরা ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে’ তাদের জন্য অপেক্ষা করবেন। এর আগে ট্রাম্প ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলেরও হুমকি দিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের আমলের অ্যাসোসিয়েট ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও মার্কিন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্রুস ফেইন বলেন, একতরফাভাবে কোনো অঞ্চল দখলের সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই ট্রাম্পের। তিনি বলেন, ‘লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই বা পানামা খাল দখল কিংবা স্পেন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষে পুয়ের্তোরিকো বা ফিলিপাইন অধিগ্রহণের মতো কোনো অঞ্চল দখল করতে হলে সাংবিধানিকভাবে সিনেটের অনুমোদিত চুক্তি বা আইনের প্রয়োজন হবে।’
ফেইন আরও বলেন, ট্রাম্প যদি এ দখলদারত্বের বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যান, তবে তা জাতিসংঘ সনদসহ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য হবে।
সিডনির ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ নাটালি ক্লেইন বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে ট্রাম্পের দাবি কার্যকর করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে সামরিক শক্তি দিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। অর্থাৎ ইরান বা অন্তত এর উপকূলীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো পরিস্থিতি হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের চলমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রেও বেশ অজনপ্রিয়। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর রিপাবলিকান সহযোগীরা কংগ্রেসে তাঁদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এ যুদ্ধকে সমর্থন করেন।
বেশ কিছু মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওয়াশিংটনে গোলাবারুদের সংকট দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র–বিধ্বংসী ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে। জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে এবং এখন প্রতি গ্যালন তেলের গড় দাম ৪ ডলার ছাড়িয়েছে, যা মার্কিন নাগরিকদের জন্য একটি বড় সমস্যা।
গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, এ যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হলো তেলের বাড়তে থাকা দাম নিয়ন্ত্রণ করা। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি এখন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান পারস্য উপসাগরের প্রতিবেশী ও মার্কিন মিত্রদেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো, আঞ্চলিক দেশগুলোকে চাপ দেওয়া, যাতে তারা ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করে।
সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন (ইউএনসিএলওএস) উপকূলীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে। তবে এ জলসীমা উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিলোমিটার) পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে এ জলসীমা দিয়ে যেকোনো দেশের জাহাজ চলাচলের অধিকারও রয়েছে, যা কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থিত, যা ইরান ও ওমানের উপকূলের মাঝখানে। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল (৩৯ কিলোমিটার) চওড়া। ফলে দুই দেশের ১২ নটিক্যাল মাইলের আঞ্চলিক জলসীমা এখানে একে অপরের অংশে চলে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কেউই এ কনভেনশনে সই বা অনুসমর্থন করেনি। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক প্রণালিসংক্রান্ত এসব নিয়ম বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত আইন হিসেবে গণ্য হয়।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, ট্রাম্প সাধারণত তাঁর নিজ দেশের ভোটারদের, বিশেষ করে তাঁর সমর্থক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এ ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েলিটি টিভির সৃষ্টি এবং দিন শেষে তিনি একজন লোকরঞ্জনকারী।
মাসগ্রেভ সতর্ক করে বলেন, ‘ট্রাম্প বড় বড় কথা বলেন। কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু তাঁর কথা আক্ষরিক অর্থে নেওয়া যাবে না।’ তিনি মনে করেন, হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা বাস্তবে এবং আইনগতভাবে অসম্ভব। তাই এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে তাঁর বক্তব্য প্রমাণ করে, ট্রাম্প ইরানের কাছে নতি স্বীকার করতে বা কয়েক মাস ধরে চলা এ যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে রাজি নন।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটকের জন্য ৩০ হাজার ডলার করে পুরস্কার ঘোষণা ইরানের
১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৩৪ PM · প্রথম আলো
ইরান যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি—দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ ক্ষুব্ধ ট্রাম্পের
১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:১৭ AM · প্রথম আলো
রাশিয়ায় ৮২২ ড্রোন হামলা ইউক্রেনের, এ বছরে ‘সবচেয়ে বড়’ বলছে মস্কো
১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:৪৩ AM · প্রথম আলো
কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পর এবার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল ভানুয়াতু
১৬ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৫২ PM · প্রথম আলো
তুরস্ক–সৌদি–পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিতে পারে মিসর: এরদোয়ান
১৬ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৩৭ PM · প্রথম আলো
