শাহজাদপুর সংবাদ

সেই ‘বাজে’ সিনেমাই বাংলাদেশে শীর্ষে, কারণ কি রাশমিকা

২৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ৫:১৫ PM

সেই ‘বাজে’ সিনেমাই বাংলাদেশে শীর্ষে, কারণ কি রাশমিকা

হোমি আদাজানিয়া পরিচালিত ‘ককটেল ২’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় গত জুন মাসে। প্রেক্ষাগৃহে মোটামুটি চলেছিল। তবে সমালোচকেরা সিনেমাটিকে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছিলেন। বেশির ভাগেরই রায় ছিল ‘জঘন্য’। কিন্তু সেই সিনেমা গত সপ্তাহে নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর চমকে দিয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির বৈশ্বিক তালিকার অ–ইংরেজি শীর্ষ ১০ সিনেমার তালিকায় এটি আছে চারে। বাংলাদেশে আছে শীর্ষে! প্রেক্ষাগৃহে গড়পড়তা ব্যবসা, সমালোচকদের বাজে তকমা সত্ত্বেও ওটিটিতে মুক্তির পর হিট ‘ককটেল ২’।

গল্প কী নিয়ে ১৪ বছর পর এসেছে ‘ককটেল ২’। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘ককটেল’ ছিল সে সময়ের অন্যতম সফল রোমান্টিক ড্রামা। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সাইফ আলী খান, দীপিকা পাড়ুকোন ও ডায়না পেন্টি। বন্ধুত্ব, প্রেম, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আধুনিক শহুরে জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত সেই ছবি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন হোমি আদাজানিয়াই।

তবে প্রথম ছবিটি পেয়েছিল ইউ/এ সার্টিফিকেট, যেখানে ‘ককটেল ২’ সরাসরি ‘এ’ সার্টিফিকেট পেল। নতুন ছবির গল্পে সম্পর্ক, আবেগ ও প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়বস্তুর মাত্রা আরও বেশি। তবে এটি সরাসরি আগের গল্পের ধারাবাহিকতা নয়; বরং একই আবেগ ও সম্পর্কের জটিলতাকে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা। সিনেমাটি মূলত এই সময়ের সম্পর্কের গল্প।

প্রথম ছবির আবহ ছিল বৃষ্টিভেজা, খানিক বিষণ্ন লন্ডন। এবারের গল্প চলে গেছে ইতালির সিসিলিতে। রোদঝলমলে পাহাড়, সমুদ্র, বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্যাশনেবল পোশাক—সব মিলিয়ে সিনেমাটি যেন শুরু থেকেই একটি ভ্রমণবিষয়ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওর মতো।

গল্পের কেন্দ্রে কুনাল (শহীদ কাপুর) ও দিয়া (রাশমিকা মান্দানা)। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তাদের। প্রায় এক দশক ধরে একসঙ্গে থাকছে তারা। দূরত্ব, এমনকি করোনাকালের কঠিন সময়ও তাদের সম্পর্ক ভাঙতে পারেনি। বিয়ের সামাজিক চাপও তাদের টলাতে পারেনি। কিন্তু একটি নিছক রসিকতা দিয়ার মনে সন্দেহ তৈরি করে।

কুনাল মজা করে বলে বসে, সে যদি কখনো দিয়ার সঙ্গে প্রতারণা করে, দিয়া তা জানতে পারবে না। এ কথাই দিয়ার মনে সন্দেহের বীজ বুনে দেয়। পরে নিজেদের সম্পর্ক ঠিক করার পর তারা ইতালির সিসিলিতে ছুটি কাটাতে যায়। সেখানেই তাদের জীবনে ঢুকে পড়ে দিয়ার পুরোনো বন্ধু অ্যালি (কৃতি শ্যানন)।

অ্যালি স্বাধীনচেতা, বিয়ে বা স্থায়ী সম্পর্কে বিশ্বাসী নয়। সিসিলিতে সে নাচ শেখায়, এর আগে বারটেন্ডার হিসেবেও কাজ করেছে। দিয়ার মনে তখনো সন্দেহ রয়ে গেছে—কুনাল সত্যিই কি তাকে ভালোবাসে, নাকি এত দিনের সম্পর্কটা কেবল অভ্যাসে পরিণত হয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দিয়া যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেখান থেকেই ছবির মূল সমস্যা শুরু।দিয়া অ্যালিকে বলে কুনালকে প্রলুব্ধ করতে। উদ্দেশ্য একটাই—কুনাল কতটা বিশ্বস্ত, সেটা পরীক্ষা করা। অর্থাৎ নিজের প্রেমিকের ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে অন্য এক নারীকে তার সামনে হাজির করে দিয়া। এরপর যা হওয়ার, তা-ই হয়। অ্যালি প্রথমে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে সত্যিই কুনালের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

কী বলেছিলেন সমালোচকেরা‘ককটেল ২’ আধুনিক প্রেমের গল্প হওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক রোমান্টিক কল্পনার পুরোনো বোতলেই নতুন লেবেল লাগিয়েছে। ছবির চাকচিক্য আছে, তারকা আছে, বিদেশের লোকেশন আছে, কিন্তু প্রেমের সেই স্বাদ, রস বা প্রাণ কোনোটিই নেই—এভাবেই সিনেমাটি সম্পর্কে লিখেছিল দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া। গণমাধ্যমটি সিনেমাটির রিভিউয়ে আরও লিখেছে, ‘“ককটেল ২” যদি নিজের প্রেম, ত্রিভুজ সম্পর্ক ও যৌন রাজনীতির খেলাটাকে সোজাসাপটাভাবে স্বীকার করত, তাহলে হয়তো ছবিটিকে কিছুটা সম্মান করা যেত। কিন্তু নিজের ইচ্ছাগুলোকে স্বীকার না করে ছবিটি সেগুলোকে রোমান্টিকতার মোড়কে পরিবেশন করেছে। মনে হয়, এটি কোনো রোমান্টিক কমেডি নয়; বরং কোনো রিয়েলিটি শোর দীর্ঘ সংস্করণ। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে দিয়ার চরিত্রের। একসময় তাকে এমন এক নারীতে পরিণত করা হয়, যার আচরণ দর্শকের কাছে প্রায় অসহ্য লাগে। আর পুরুষ দর্শকদের আমন্ত্রণ জানানো হয় কুনালের জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজেকে “নির্যাতিত” ও “মহৎ” ভাবতে।’

ছবিটিতে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রচার করা হয়েছে উল্লেখ করে গণমাধ্যমটি আরও লিখেছে, ‘ছবির অনেক দৃশ্যেই দেখতে পাওয়া যায় আকর্ষণীয় মোড়কে মোড়ানো পুরুষতান্ত্রিকতা। যেমন এক রাতে অ্যালি কুনালকে উত্তেজিত করার জন্য অ্যাপার্টমেন্টে পোশাক ছাড়াই ঘুরে বেড়ায়। আবার দিয়া উত্তেজিত হয়ে অ্যালিকে ফোন করে জানতে চায়, তার দীর্ঘদিনের প্রেমিক কুনাল কি তার পরীক্ষায় ধরা পড়েছে? যেন নিজের সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর ব্যাপার নয়, অন্য কারও জীবনের রসালো গল্প শুনছে।’

ভারতীয় গণমাধ্যম সিনেমাটিকে ২.৫ স্টার দিয়ে লিখেছে, ‘ছবির মূল সমস্যাই এর গল্পের ভিত্তি। দিয়ার মনে সন্দেহ—তার লিভ-ইন সঙ্গী কুনাল তাকে সত্যিই ভালোবাসে তো? সেই সন্দেহ দূর করার জন্য দিয়া এমন এক কাণ্ড করে বসে, যা বিশ্বাস করা কঠিন। সে তার একসময়ের হোস্টেলসঙ্গী অ্যালিকে কুনালকে প্রলুব্ধ করার দায়িত্ব দেয়। উদ্দেশ্য একটাই—কুনাল কতটা বিশ্বস্ত, সেটা পরীক্ষা করা। এরপর যা হওয়ার, তা-ই হয়। মজার পরিস্থিতি তৈরি করতে গিয়ে সম্পর্কের জটিলতাকে অনেক সময় নিছক রসিকতায় পরিণত করে ফেলে ছবিটা। একটা পর্যায়ে কুনাল ক্ষুব্ধ হয়ে বলে ওঠে, “তোমরা দুজন মিলে আমার জীবনটাকে তামাশা বানিয়ে ফেলেছ।” আসলে এ সংলাপই ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দেয়।’

রিভিউয়ে সিনেমাটির লোকেশনের প্রশংসা করেছেন সমালোচক, তবে উল্লেখ করেছেন আবেগের ঘাটতির কথা। এনডিটিভি লিখেছে, ‘ছবিটি দেখতে সুন্দর। এর ওপর কোনো অভিযোগ নেই। বিশেষ করে সিসিলির দৃশ্যগুলো অসাধারণ। রং, লোকেশন, পোশাক ও চিত্রগ্রহণ—সব মিলিয়ে ছবির ভিজ্যুয়াল দিকটি বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে আবেগের জায়গাটি অনেকটাই ফাঁকা। চরিত্রগুলোর মধ্যে ভালোবাসা, টানাপোড়েন, ঈর্ষা ও আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু সেই আবেগ পর্দা পেরিয়ে দর্শকের কাছে খুব একটা পৌঁছায় না। ফলে “ককটেল ২” হয়ে ওঠে এমন এক চঞ্চল নৃত্যশিল্পীর মতো, যার পায়ে এখনো ছন্দ আছে, কিন্তু মাথায় যেন আগের রাতের বিশাল হ্যাংওভার।’ তবে রিভিউয়ে তিন তারকা শহীদ কাপুর, রাশমিকা মান্দানা ও কৃতি শ্যাননের অভিনয়ের প্রশংসা করা হয়েছে।

আরেকটি ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুও সিনেমাটিকে ২.৫ স্টার দিয়েছে। ‘রঙিন আয়োজন, কিন্তু স্বাদহীন প্রেমের গল্প’ শিরোনামের রিভিউয়ে গণমাধ্যমটি লিখেছে, ‘এবার পরিচালক হোমি আদাজানিয়া ফিরেছেন “ককটেল ২” নিয়ে। কিন্তু আগের ছবির আবেগ, তীক্ষ্ণতা ও চরিত্রের গভীরতার বদলে এবার তিনি যেন পরিবেশন করেছেন ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এক মকটেল—দেখতে ঝলমলে, কিন্তু স্বাদে তেমন কিছু নেই।’দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়ার মতো দ্য হিন্দুও সিনেমাটির পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের সমালোচনা করেছে। লিখেছে, ‘সিনেমাটিতে দুই ধরনের ভাবনার মিশ্রণ ঘটেছে। ফলাফল—নারীর কণ্ঠ অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে আর পুরুষ চরিত্র কুনালকে প্রায় নিষ্পাপ, বিশ্বস্ত ও আদর্শ প্রেমিক হিসেবেই হাজির করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এটি এমন এক রোমান্টিক কমেডি, যা সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে কথা বলতে চায়, কিন্তু বারবার সেই গভীরতার বদলে বাহ্যিক চাকচিক্যে আটকে যায়। প্রেম, নিরাপত্তা, অভ্যাস, বিয়ে ও বিশ্বস্ততার মতো বিষয় সামনে এলেও সেগুলো দর্শকের মনে খুব বেশি দাগ কাটে না।’

বাংলাদেশে কেন এত জনপ্রিয়সাধারণ দর্শক অবশ্য সমালোচকদের মতামত থোড়াই কেয়ার করেন। যার প্রমাণ বাংলাদেশে মুক্তির পরই সিনেমাটি চলে এসেছে নেটফ্লিক্সের টপচার্টের শীর্ষে। বক্স অফিস বা সমালোচকদের কাছে ‘ব্যর্থ’ সিনেমা বাংলাদেশে হিট, এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এই তো কিছুদিন আগেই অক্ষয় কুমার অভিনীত প্রিয়দর্শনের ‘ভূত বাংলা’ বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের টপচার্টে দীর্ঘ রাজত্ব করেছে।

‘ককটেল ২’ বাংলাদেশে জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হতে পারে আগের সিনেমাটির প্রভাব। আরেকটা বড় কারণ হতে পারে রাশমিকা মান্দানার উপস্থিতি। এই দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী দেশে বরাবরই জনপ্রিয়। এই সিনেমায় আবার তিনি ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’র ইমেজ ছেড়ে হাজির হয়েছেন ভিন্নভাবে। সেটা দেখার আগ্রহও থাকতে পারে দর্শকের। ‘ককটেল ২’ এই সময়ের সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে এগিয়েছে, সেটাও হয়তো তরুণ দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারে।

তবে সবাই যে খুব পছন্দ করেছেন, তা–ও নয়। অনেকে দেখতে গিয়ে বিরক্তি ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। ‘নেতিবাচক’ এই প্রচার থেকেও অনেকে হয়তো সিনেমাটি দেখেছেন।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ