আপত্তির মুখে কনসার্ট বন্ধ, কী বলছেন শিল্পীরা
২৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ৫:৫৪ AM

দুই দিনের ব্যবধানে ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও নির্বাচিত সরকারের সময়ে একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হওয়াতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংস্কৃতি অঙ্গনে। এ ঘটনায় শিল্পী, আয়োজক ও সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। এ প্রসঙ্গে দেশের পাঁচ সংগীতশিল্পী ও সুরকারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন করেছেন মনজুর কাদের।
শেখ সাদী খান
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেখছি, আমরা একে অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার রাজনীতি করছি। কিন্তু সবাই মিলে দেশের জন্য কীভাবে কিছু করা যায়, দেশটাকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়—সেই জায়গায় আমাদের চিন্তাভাবনা খুব একটা নেই। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতসমৃদ্ধ একটি জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের সাম্প্রতিক ঘটনাটি পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। আমি মনে করি, সংস্কৃতি যদি আমাদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রাজনীতি টিকবে কীভাবে? রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির একটি সুন্দর মেলবন্ধন ও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। কারণ, প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, আর সেই সংস্কৃতিই জাতির পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা মহলের উগ্র আচরণ দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলো যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখা যাবে, কিছু উগ্রপন্থী মানুষই এসবের পেছনে জড়িত। তারা সংস্কৃতিকে ঘিরে একধরনের ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।আমার জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ লাইনে উচ্চ শব্দের কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার কথা শুনেছি। আমার প্রশ্ন হলো, যদি শব্দ নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কেন? শব্দ কমিয়ে অনুষ্ঠান করার সুযোগ করে দেওয়াটাই তো আসল দায়িত্ব ছিল। সমাধান করতে হবে, সংস্কৃতির পথ বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।
সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা বিষয়টিতে সূক্ষ্ম ও সুদৃষ্টি দিন। কারণ, সাংস্কৃতিক বলয়টাই যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতিও নষ্ট হয়ে যাবে। সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে সুন্দর সমন্বয় থাকা জরুরি।
সরকারের কাছে আমার প্রথম চাওয়া—আপনারা যেহেতু দেশ পরিচালনা করছেন, সারা দেশে আপনাদের সংস্থা, প্রতিনিধি আছে—তাই দেশবাসীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন—এই দেশ আমাদের সবার। আমাদের একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। গান-বাজনা এ দেশের মানুষের রক্তে, মগজে, মননে মিশে আছে। সাংস্কৃতিক চর্চায় কেউ যেন কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। আর যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এমন একটি স্পষ্ট বার্তা আসা দরকার। আমি বিশ্বাস করি, এই বার্তাটি পৌঁছে গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই দ্রুত বদলে যাবে।
সরকারপ্রধানের প্রতিও আমার অনুরোধ—আমাদের সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। আমাদের দলগত আদর্শ বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু দেশের সংস্কৃতি, দেশের মানুষের স্বার্থ এবং দেশের মঙ্গলের প্রশ্নে আমাদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। আর যাঁরা উগ্রপন্থী হয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করছেন, তাঁদের প্রতিও অনুরোধ—এসব করে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে নষ্ট করবেন না, আমাদের জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন না। আমরা সবাই মিলে দেশটাকে এগিয়ে নিতে চাই। আর দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সাংস্কৃতিক চর্চার পথ কোনোভাবেই অবরুদ্ধ করা যাবে না। সংস্কৃতি না বাঁচলে দেশটাকেও টিকিয়ে রাখা যাবে না।
সাবিনা ইয়াসমীন
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, এই ঘটনায় শিল্পীদের ক্ষতি হয়েছে। শুধু শিল্পী নন, যন্ত্রশিল্পী, আয়োজকসহ সংশ্লিষ্ট সবারই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। গান কিংবা কোনো অনুষ্ঠান কারও পছন্দ না হলে সেটি না দেখার অধিকার তাঁর অবশ্যই আছে। কিন্তু পছন্দ নয় বলে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকারের কোনো সংস্থার যদি কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে সেটি শুরুতেই জানানো উচিত। আয়োজনের আগে বলা যেতে পারে—এখানে কনসার্ট করা যাবে না। কিন্তু সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর হঠাৎ করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিলে শুধু শিল্পী নন, আয়োজক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবারই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা শিল্পচর্চার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।আমি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এ ধরনের ঘটনা সত্যিই গভীরভাবে উদ্বেগের। হঠাৎ করে এভাবে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা চলতে থাকলে শিল্পীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হবে।
সরকারের কাছে আমার চাওয়া খুব পরিষ্কার—গানবাজনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে হবে। অবশ্যই সেখানে কোনো ধরনের নোংরামি বা অনিয়ম থাকবে না; সবকিছু স্বচ্ছ, সুন্দর ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে হবে। কিন্তু গানবাজনা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।
গানবাজনা একটি দেশের সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের মানুষের আবেগ ও জীবনযাপনের সঙ্গে সংগীত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই এটিকে বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যাতে সুন্দর, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নভাবে চলতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যারা বাধা দিচ্ছে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের বিষয়ে একটি পরিষ্কার ও কঠোর বার্তা দেওয়া দরকার। যাতে সবাই বুঝতে পারে—মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত অপছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় একটি কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারবে না।
হামিন আহমেদ
নিবন্ধন ছিল কি না—শেষ মুহূর্তে এ ধরনের উদ্ভট কারণ সামনে এনে কনসার্ট বাতিল করা আসল ঘটনাকে আড়াল করারই একটি প্রয়াস বলে আমি মনে করি। মূল বিষয় হচ্ছে, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ কনসার্ট বাতিল—আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমনটা অনেক দেখেছি। তখন শিল্পীদের গায়ে হাত তোলা হয়েছে, চুল কেটে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব ঘটনায় দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে আজ নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় এসে সেই গোষ্ঠী আরও উৎসাহী হয়ে সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে। একে আমি একধরনের প্রশ্রয় হিসেবেই দেখি। প্রশ্রয় পেয়ে এ ধরনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে এ ধরনের পরিস্থিতি এক-দুই মাসে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে বিষয়টি বড় আকার ধারণ করেছে। তাই এখনই এর লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন।
সরকারের কাছে আমার দাবি খুব পরিষ্কার—কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ, থানা বা জেলা প্রশাসন যদি কোনো এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, যদি কোনো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী থানায় ঢুকে মব তৈরি করে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে সেই থানা কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করছে—সেই প্রশ্নও তুলতে হবে।
প্রধান কথা হলো, সব পেশার মানুষ যদি নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন, তাহলে শুধু সংগীতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কেন এ ধরনের হয়রানি ও হামলার শিকার হতে হবে? এসব ঘটনা কি শুধু সংবাদমাধ্যমে খবর হবে, আমরা শিল্পীরা কথা বলব, দু-একজন বড় ব্যক্তিত্ব প্রতিবাদ করবেন—তারপর সব শেষ? তা হতে পারে না। সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কোনো গোষ্ঠী আপত্তি করলেই বা হুমকি দিলেই প্রশাসনের দায়িত্ব অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া নয়। বরং অনুষ্ঠানটি শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেটি নির্বিঘ্নে করাটাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।
যে সরকার সংস্কৃতিমনা এবং চায় সংস্কৃতি ও সংগীত তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, তারা ভালো ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হোক—তাদের কাছে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। বিএনপি সব সময় ব্যান্ড মিউজিকসহ বিভিন্ন ধরনের সংগীতকে সমর্থন করে এসেছে। এবার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সংগীতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গা থেকে সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখিয়ে যদি কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো গোষ্ঠী শুধু আপত্তি বা হুমকি দিয়েই একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে। এটি আরও বড় ধরনের প্রশ্রয়ের পথ তৈরি করবে।
আমার মনে হয়, সংস্কৃতি নিয়ে সরকারের যে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা রয়েছে, এসব ঘটনা সেই উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা। তাই সরকারের এ বিষয়ে খুব দ্রুত এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে সরকার কী করবে, সেটি নিয়ে একটি স্পষ্ট ঘোষণা আসা উচিত।
আমরা যখন পারফর্ম করি, তখন হাজার হাজার মানুষ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। আমি তো মনে করি, ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত ছয় কোটি মানুষ সংগীত অন্তপ্রাণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমাদের কনসার্টের অভিজ্ঞতাও অসাধারণ। এই মাটি থেকেই সংগীতের অনেক মহাপুরুষ উঠে এসেছেন। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংগীতকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও উদ্বেগের।
বেবী নাজনীন
আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন যদি ধীরে ধীরে কলাপস করে যায়, তাহলে অন্যদিক দিয়ে দেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়বে। সংস্কৃতি একটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আমাদের সরকার নতুন এসেছে, তবে তারা সংস্কৃতিবান্ধব। ম্যাডাম খালেদা জিয়া সংস্কৃতিকে ভীষণ ভালোবাসতেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ছিলেন একজন ট্যালেন্ট হান্টার। তিনিই আমাকে খুঁজে নিয়ে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সংস্কৃতির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন করতে চান। তাঁর চিন্তায় সংস্কৃতি একটি বড় জায়গাজুড়ে আছে।
কিন্তু কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে শিল্পীরা নিরুৎসাহিত হবেন। আর আমার মনে হয়, উগ্র গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশ্যও হয়তো সেটিই—শিল্পীদের ভয় দেখানো, নিরুৎসাহিত করা এবং একসময় তাঁদের কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া। অথচ শিল্পীদের প্রধান আয়ের জায়গাগুলোর একটি হলো সারা দেশের কনসার্ট। তাই কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একটি নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে সরকার ও তার সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
আমার কেন জানি মনে হয়, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কোনো কোনো উগ্র গোষ্ঠী এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করছে। একজন শিল্পী যেন তাঁর কাজ করতে পারেন, একজন খেলোয়াড়েরও তা–ই—একজন কবি, সাহিত্যিক, স্থপতি কিংবা অন্য পেশার মানুষ যেন নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে তাঁদের পেশাগত চর্চা ও দায়িত্ব পালন করতে পারেন—সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশটা সবার। তাই সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রত্যেক মানুষ যেন তাঁর পেশাগত দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করতে পারেন, সেই কর্মপরিবেশও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ বিএনপি সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। এখন কোনো গোষ্ঠী হয়তো সরকারের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে কিংবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে। এসব ঘটনার মাধ্যমে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলারও চেষ্টা থাকতে পারে। তাই সরকারের উচিত প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিক তদন্ত করা এবং তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।
আমি চাই, সারা দেশে নির্বিঘ্নে সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত থাকুক। শিল্পীরা যেন ভয় বা অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকেন। সংস্কৃতির মানুষ যেন তাঁদের কাজ করে যেতে পারেন—এমন একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি
কনসার্ট একজন শিল্পীর আয়ের প্রধান জায়গা। শুরুতে গান একজন শিল্পীর নেশা থাকে, পরে সেটিই পেশায় পরিণত হয়। সেই পেশাকে সামনে রেখেই একজন শিল্পী এগিয়ে যান। তাই হঠাৎ করে একটি কনসার্ট বাতিল হয়ে যাওয়া একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় ক্ষতির বিষয়। সংস্কৃতি আমাদের প্রধান পরিচয়। সে জায়গা থেকে এভাবে কনসার্ট বাতিল হওয়ার ঘটনা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।
এখানে প্রশাসনের বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা কী ভূমিকা পালন করছে এবং ভবিষ্যতে কী করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কোনো একটি পক্ষ আপত্তি করল আর তার কারণে প্রশাসন অনুষ্ঠান বাতিল করে দিল—এমনটা তো হতে পারে না। এটি সরাসরি সংস্কৃতির ওপর হুমকি।
ধরলাম কোনো একটি গোষ্ঠী কোনো একটি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আপত্তি করল। কিন্তু তাঁর আপত্তির যদি কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকে, শুধু বললেন তাঁর ওই শিল্পীর গান ভালো লাগে না—তাহলে তাঁর ভালো না লাগার কারণে অন্য যাঁরা সেই শিল্পীর গান পছন্দ করেন, তাঁদের সাংস্কৃতিক অধিকারেও তো আঘাত করা যায় না।
আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির বড় পরিচয়ই তো নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, যাত্রাপালা। অথচ যাত্রাপালা এখন প্রায় দেখাই যায় না। কেন এটিকে আরও যত্ন নিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে না, লালন–পালন করা হচ্ছে না—সেটিও বুঝি না। আমি নিজেও ছোটবেলায় যাত্রাপালা দেখেছি। আমাদের নেত্রকোনার বাসার সামনে রেলক্রসিং বাজারে যাত্রাপালা হতো। দিন-রাত সেখান থেকে যাত্রাপালার শব্দ শোনা যেত। সেই সংস্কৃতি এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
কথা হচ্ছে, যে ধর্মেরই হোক, যে মতেরই হোক—কারও বা কোনো গোষ্ঠীর কোনো কিছু ভালো না লাগতেই পারে। কিন্তু দু-একজনের ব্যক্তিগত চিন্তা বা অপছন্দের কারণে একটি দেশের সংস্কৃতি এভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে না। এখানে প্রশাসনেরই বড় ভূমিকা পালন করা উচিত। কোনো বৈধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে, প্রয়োজন হলে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে সমাধান করতে হবে; কিন্তু অযৌক্তিক আপত্তির কারণে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েরও এ বিষয়ে আরও কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা উচিত। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কেন একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল করতে হবে? আমরা তো কোনো জঙ্গি রাষ্ট্রে বাস করছি না, আমাদের পরিস্থিতি পাকিস্তানের মতোও নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কোনো অনুষ্ঠানে সমস্যা বা হুমকি তৈরি হলে সেটি মোকাবিলা করে শিল্পী ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব।
সরকারের কাছে আমার চাওয়া একটাই—দেশের শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা যেন স্বাধীন ও নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন। তাঁদের কাজে যেন কোনো ধরনের অযৌক্তিক বাধা না আসে। শিল্পীদের কর্মপরিবেশ ঠিক রাখা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
‘হয়তো কিছুদিন পর চুল পড়ে যাবে’—ক্যানসারের লড়াইয়ে উপস্থাপক সামিয়া
২৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:৩০ AM · প্রথম আলো
‘টক্সিক’ কি নারীবিদ্বেষী সিনেমা? প্রবল বিতর্ক নিয়ে মুখ খুললেন যশ
২৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:৩০ AM · প্রথম আলো
