শাহজাদপুর সংবাদ

সিরাজগঞ্জে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকি

২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৮:৫২ PM

সিরাজগঞ্জে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকি

একসময় কাকডাকা ভোর কিংবা গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে গ্রামবাংলার জনপদে শোনা যেত ঢেঁকির ছন্দময় ধুপধাপ শব্দ। উঠানের এক কোণে কিংবা রান্নাঘরের পাশে কাঠের তৈরি ঢেঁকিতে ধান ভাঙা, চালের গুঁড়া তৈরি এবং পিঠা-পুলির আয়োজন ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নবান্ন, পৌষ-পার্বণ কিংবা শীতের পিঠা উৎসব—সবকিছুর সঙ্গেই যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল ঢেঁকি।

কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, রাইস মিলের সহজলভ্যতা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের কারণে গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন বিলুপ্তির পথে। সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যে ঢেঁকি ছিল প্রায় প্রতিটি বাড়ির প্রয়োজনীয় সামগ্রী, এখন সেগুলোর অধিকাংশই পড়ে আছে গোয়ালঘর, রান্নাঘর কিংবা বাড়ির পরিত্যক্ত কোনো কোণে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক ঢেঁকি নষ্ট হয়ে গেছে; কোথাও আবার কাঠ পচে ভেঙে পড়েছে।

গ্রামবাংলায় অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাস এলেই নতুন ধান ঘরে তোলার পর শুরু হতো ধান ভাঙার ব্যস্ততা। বাড়ির নারীরা ঢেঁকিতে ধান ভেনে চাল তৈরি করতেন। সেই চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হতো দুধ পিঠা, তেলের পিঠা, চিতই পিঠা, পায়েস, ফিরনি, ভাপা পিঠাসহ নানা ধরনের দেশীয় খাবার।

তাড়াশ উপজেলা ধানকুন্টি গ্রামের ছকিনা (৭০) ও রজুবা বেওয়া (৭১) বলেন, একসময় শীতের মৌসুমে প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকেই ঢেঁকির শব্দ শোনা যেত। নতুন ধানের চাল ও গুঁড়া তৈরির পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনায় পুরো গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। এখন সেই দৃশ্য আর তেমন দেখা যায় না।

তাড়াশ প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক সাব্বির আহাম্মেদ বলেন, নবান্নের সময় ঢেঁকির শব্দ ছিল গ্রামীণ জীবনের অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ। শুধু ধান ভাঙার কাজই নয়, ঢেঁকিকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগও বাড়ত।

মাধাইনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, ঢেঁকি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নারীদের সম্মিলিত শ্রম এবং পারিবারিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঢেঁকিতে ধান ভাঙার কাজ সম্পন্ন হতো। এর মধ্য দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধন তৈরি হতো।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগঞ্জে বেড়েছে আধুনিক রাইস মিলের সংখ্যা। যন্ত্রের সাহায্যে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ধান ভাঙানো এবং চালের গুঁড়া তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় মানুষ এখন আর আগের মতো ঢেঁকির ওপর নির্ভরশীল নন।

তাড়াশ বাজারের রাইস মিল মালিক কামাল হোসেন জানান, প্রতি বস্তা ধান ভাঙাতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং আতপ চালের আটা তৈরিতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা মজুরি নেওয়া হয়। সময় ও শ্রম দুটোই কম লাগে বলে অধিকাংশ মানুষ এখন মেশিনে ধান ভাঙানো ও চালের গুঁড়া তৈরি করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, তবে এর ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের অনেক ঐতিহ্য। ঢেঁকির ব্যবহার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকিকে ঘিরে থাকা পারিবারিক সহযোগিতা, নারীদের সম্মিলিত শ্রম এবং নবান্ন-পিঠাপুলির বহু পুরোনো সংস্কৃতিও।

ঢেঁকির বিলুপ্তির প্রভাব শুধু গ্রামীণ ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক নারীর জীবিকার বিষয়টিও।

একসময় গ্রামের বিধবা, স্বামীপরিত্যক্ত ও দরিদ্র নারীদের অনেকে নিজের বাড়িতে কিংবা অন্যের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ভেনে অর্থ উপার্জন করতেন। ধান ভাঙার বিনিময়ে পাওয়া অর্থ বা খাদ্যশস্য দিয়ে তারা সংসারের ব্যয় মেটাতে সহায়তা করতেন। কারও কারও জন্য এটি ছিল নিজস্ব আয়ের অন্যতম সম্মানজনক মাধ্যম।

কিন্তু আধুনিক রাইস মিলের বিস্তারের ফলে ঢেঁকিতে ধান ভাঙানোর কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে। ফলে অনেক নারীকে এখন দিনমজুরি, কৃষিশ্রম কিংবা অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে।

ঢেঁকিতে প্রক্রিয়াজাত চাল নিয়ে পুষ্টিগুণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সাধারণত ঢেঁকিছাটা চাল অতিরিক্ত পালিশ করা হয় না। ফলে ধানের বাইরের স্তরের কিছু পুষ্টি উপাদান তুলনামূলকভাবে বজায় থাকতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পালিশের ফলে চালের কিছু পুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে।

তবে চালের পুষ্টিমান নির্ধারণে চালের ধরন, প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই শুধু ঢেঁকিতে প্রক্রিয়াজাত হলেই সব ক্ষেত্রে চাল বেশি পুষ্টিকর—এমন সরল সিদ্ধান্তে না গিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

প্রযুক্তির বিকাশের কারণে ঢেঁকির ব্যবহার কমে যাওয়া সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তন হলেও গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তাদের মতে, স্থানীয় জাদুঘর, লোকজ মেলা, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী কিংবা পর্যটনকেন্দ্রে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে উৎপাদিত ঢেঁকিছাটা চাল, চালের গুঁড়া ও পিঠাপুলিকে ব্র্যান্ডিং করে বাজারজাত করা গেলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের কুটিরশিল্প ও ঐতিহ্যভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে ঢেঁকিকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে যেমন হারিয়ে যাওয়া লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে প্রান্তিক নারীদের জন্য তৈরি হতে পারে বিকল্প আয়ের সুযোগ।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্রুতগতির যন্ত্রনির্ভর জীবনে ঢেঁকির মতো শ্রমসাধ্য যন্ত্রের ব্যবহার কমে যাওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামবাংলার শত বছরের ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাও জরুরি।

সচেতন মহলের প্রত্যাশা, ঢেঁকি যেন একদিন শুধু পুরোনো বাড়ির পরিত্যক্ত কোণে পড়ে থাকা কাঠের একটি যন্ত্র কিংবা বইয়ের পাতায় বর্ণিত কোনো ঐতিহ্যে পরিণত না হয়। যথাযথ সংরক্ষণ ও আধুনিক বাজারব্যবস্থার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিকে যুক্ত করা গেলে ঢেঁকির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রামীণ স্মৃতি, সংস্কৃতি ও জীবিকার কিছু অংশ নতুন প্রজন্মের কাছেও জীবন্ত রাখা সম্ভব।

একসময় কাকডাকা ভোর কিংবা গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে গ্রামবাংলার জনপদে শোনা যেত ঢেঁকির ছন্দময় ধুপধাপ শব্দ। উঠানের এক কোণে কিংবা রান্নাঘরের পাশে কাঠের তৈরি ঢেঁকিতে ধান ভাঙা, চালের গুঁড়া তৈরি এবং পিঠা-পুলির আয়োজন ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নবান্ন, পৌষ-পার্বণ কিংবা শীতের পিঠা উৎসব—সবকিছুর সঙ্গেই যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল ঢেঁকি।

কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, রাইস মিলের সহজলভ্যতা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের কারণে গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন বিলুপ্তির পথে। সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যে ঢেঁকি ছিল প্রায় প্রতিটি বাড়ির প্রয়োজনীয় সামগ্রী, এখন সেগুলোর অধিকাংশই পড়ে আছে গোয়ালঘর, রান্নাঘর কিংবা বাড়ির পরিত্যক্ত কোনো কোণে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক ঢেঁকি নষ্ট হয়ে গেছে; কোথাও আবার কাঠ পচে ভেঙে পড়েছে।

গ্রামবাংলায় অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাস এলেই নতুন ধান ঘরে তোলার পর শুরু হতো ধান ভাঙার ব্যস্ততা। বাড়ির নারীরা ঢেঁকিতে ধান ভেনে চাল তৈরি করতেন। সেই চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হতো দুধ পিঠা, তেলের পিঠা, চিতই পিঠা, পায়েস, ফিরনি, ভাপা পিঠাসহ নানা ধরনের দেশীয় খাবার।

তাড়াশ উপজেলা ধানকুন্টি গ্রামের ছকিনা (৭০) ও রজুবা বেওয়া (৭১) বলেন, একসময় শীতের মৌসুমে প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকেই ঢেঁকির শব্দ শোনা যেত। নতুন ধানের চাল ও গুঁড়া তৈরির পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনায় পুরো গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। এখন সেই দৃশ্য আর তেমন দেখা যায় না।

তাড়াশ প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক সাব্বির আহাম্মেদ বলেন, নবান্নের সময় ঢেঁকির শব্দ ছিল গ্রামীণ জীবনের অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ। শুধু ধান ভাঙার কাজই নয়, ঢেঁকিকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগও বাড়ত।

মাধাইনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, ঢেঁকি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নারীদের সম্মিলিত শ্রম এবং পারিবারিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঢেঁকিতে ধান ভাঙার কাজ সম্পন্ন হতো। এর মধ্য দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধন তৈরি হতো।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগঞ্জে বেড়েছে আধুনিক রাইস মিলের সংখ্যা। যন্ত্রের সাহায্যে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ধান ভাঙানো এবং চালের গুঁড়া তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় মানুষ এখন আর আগের মতো ঢেঁকির ওপর নির্ভরশীল নন।

তাড়াশ বাজারের রাইস মিল মালিক কামাল হোসেন জানান, প্রতি বস্তা ধান ভাঙাতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং আতপ চালের আটা তৈরিতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা মজুরি নেওয়া হয়। সময় ও শ্রম দুটোই কম লাগে বলে অধিকাংশ মানুষ এখন মেশিনে ধান ভাঙানো ও চালের গুঁড়া তৈরি করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, তবে এর ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের অনেক ঐতিহ্য। ঢেঁকির ব্যবহার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকিকে ঘিরে থাকা পারিবারিক সহযোগিতা, নারীদের সম্মিলিত শ্রম এবং নবান্ন-পিঠাপুলির বহু পুরোনো সংস্কৃতিও।

ঢেঁকির বিলুপ্তির প্রভাব শুধু গ্রামীণ ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক নারীর জীবিকার বিষয়টিও।

একসময় গ্রামের বিধবা, স্বামীপরিত্যক্ত ও দরিদ্র নারীদের অনেকে নিজের বাড়িতে কিংবা অন্যের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ভেনে অর্থ উপার্জন করতেন। ধান ভাঙার বিনিময়ে পাওয়া অর্থ বা খাদ্যশস্য দিয়ে তারা সংসারের ব্যয় মেটাতে সহায়তা করতেন। কারও কারও জন্য এটি ছিল নিজস্ব আয়ের অন্যতম সম্মানজনক মাধ্যম।

কিন্তু আধুনিক রাইস মিলের বিস্তারের ফলে ঢেঁকিতে ধান ভাঙানোর কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে। ফলে অনেক নারীকে এখন দিনমজুরি, কৃষিশ্রম কিংবা অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে।

ঢেঁকিতে প্রক্রিয়াজাত চাল নিয়ে পুষ্টিগুণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সাধারণত ঢেঁকিছাটা চাল অতিরিক্ত পালিশ করা হয় না। ফলে ধানের বাইরের স্তরের কিছু পুষ্টি উপাদান তুলনামূলকভাবে বজায় থাকতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পালিশের ফলে চালের কিছু পুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে।

তবে চালের পুষ্টিমান নির্ধারণে চালের ধরন, প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই শুধু ঢেঁকিতে প্রক্রিয়াজাত হলেই সব ক্ষেত্রে চাল বেশি পুষ্টিকর—এমন সরল সিদ্ধান্তে না গিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

প্রযুক্তির বিকাশের কারণে ঢেঁকির ব্যবহার কমে যাওয়া সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তন হলেও গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তাদের মতে, স্থানীয় জাদুঘর, লোকজ মেলা, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী কিংবা পর্যটনকেন্দ্রে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে উৎপাদিত ঢেঁকিছাটা চাল, চালের গুঁড়া ও পিঠাপুলিকে ব্র্যান্ডিং করে বাজারজাত করা গেলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের কুটিরশিল্প ও ঐতিহ্যভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে ঢেঁকিকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে যেমন হারিয়ে যাওয়া লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে প্রান্তিক নারীদের জন্য তৈরি হতে পারে বিকল্প আয়ের সুযোগ।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্রুতগতির যন্ত্রনির্ভর জীবনে ঢেঁকির মতো শ্রমসাধ্য যন্ত্রের ব্যবহার কমে যাওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামবাংলার শত বছরের ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাও জরুরি।

সচেতন মহলের প্রত্যাশা, ঢেঁকি যেন একদিন শুধু পুরোনো বাড়ির পরিত্যক্ত কোণে পড়ে থাকা কাঠের একটি যন্ত্র কিংবা বইয়ের পাতায় বর্ণিত কোনো ঐতিহ্যে পরিণত না হয়। যথাযথ সংরক্ষণ ও আধুনিক বাজারব্যবস্থার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিকে যুক্ত করা গেলে ঢেঁকির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রামীণ স্মৃতি, সংস্কৃতি ও জীবিকার কিছু অংশ নতুন প্রজন্মের কাছেও জীবন্ত রাখা সম্ভব।

সূত্র: bangladesherkhabor.net

সম্পর্কিত সংবাদ