সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল চীনা কোম্পানি
২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৬:২১ PM
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে চীনা উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত ৫৫০টি প্লট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে চীনা কোম্পানিগুলো। কয়েক দফা যোগাযোগের পর ই-মেইলের মাধ্যমে বিসিক কর্তৃপক্ষকে চীনা উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তারা আর শিল্পপার্কে আসছেন না। ফলে এসব প্লট এখন দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় ২৭৯টি এবং চীনা উদ্যোক্তাদের জন্য ৫৫০টি প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়। গত বছরের ২৮ জুন দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে অধিকাংশ প্লট হস্তান্তর করা হলেও চীনা উদ্যোক্তারা তাদের নির্ধারিত প্লট বুঝে নেননি। এরপর কয়েক দফা যোগাযোগ করে বিসিক কর্তৃপক্ষ।
বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমরা কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। সর্বশেষ তারা ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়েছে, তারা আর আসবে না। এজন্য এসব প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।
বিসিক সূত্র আরো জানায়, গত সোমবার (১৭ আগস্ট) সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে ৫৫৭টি প্লট বরাদ্দের জন্য নোটিশ জারি করা হয়েছে।
তবে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্লট বরাদ্দ পেলেও শিল্পপার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় এখনো কারখানা স্থাপন করতে পারছেন না। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকঋণের সুদ এবং প্লট বরাদ্দের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে তাদের। কারখানা স্থাপনে বিলম্বের কারণে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে হতাশাও বাড়ছে।
দেশীয় উদ্যোক্তা রনি বলেন, মাত্র আটটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। এখনো স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। পানি ও গ্যাসেরও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। প্লটগুলোর মাটির কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। আগামী চার বছরেও কারখানা চালু করতে পারব কি না, বলতে পারছি না। ব্যাংকঋণ ও প্লটের কিস্তি পরিশোধ করে কারখানা স্থাপন ও উৎপাদনে যাওয়া নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় আছি।
সরেজমিনে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে প্লটের জায়গা গর্ত ও অসমতল অবস্থায় রয়েছে। রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কাজ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। নকশাগত ত্রুটির কারণে প্রায় ২০ একর আয়তনের একটি পুকুরও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও ওই পুকুরের ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শিল্পপার্কে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগের স্থায়ী ব্যবস্থা হয়নি বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের।
নাম না প্রকাশের শর্তে বিসিকের এক কর্মকর্তা জানান, আগের সরকারের আমলে প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরাফাত কনস্ট্রাকশনসহ একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তাদের শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিসিকের প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক আব্দুল মতিন ও প্রকল্প পরিচালক জাফর বায়েজিদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
শিল্পপার্ক নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তৎকালীন বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের সময় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের নির্মাণকাজ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেসব প্রতিবেদনে হেরিংবন্ডে নিম্নমানের ও অর্ধাংশ ইট ব্যবহার, নিম্নমানের ইট দিয়ে খোয়া তৈরি, টেন্ডারের শর্তের বাইরে কাজ করা এবং সড়কের কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব কম রাখার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডারে কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব ৭৫ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হলেও কোনো কোনো স্থানে ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ মিলিমিটার পর্যন্ত কার্পেটিং করা হয়েছে। সাববেজের মান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অভিযোগ ছিল। প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তার পিচ ব্যবহারের আগেই বিভিন্ন স্থানে উঠে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে।
২০২৪ সালের জুনে বিসিক কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিসিকের পক্ষ থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুদকের একটি দল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনও করে। তবে ওই তদন্তের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট বিসিক শিল্পপার্কের প্রধান পরিচালক আব্দুল মতিনসহ একাধিক কর্মকর্তা প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় ড্রেন নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রী, সড়কের পুরুত্ব, সড়কে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী এবং প্রকল্প এলাকার বালু দিয়ে সাববেজ ও সোল্ডারের কাজ করার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ড্রেন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান এবং সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স লিমিটেড নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় তাদের প্রায় ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। তবে ওই জরিমানার অর্থ এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান বেনজির আহমেদ টিটুর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
আরও জানা যায়, যমুনা সেতুর পশ্চিম পাশে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম মৌজার প্রায় ৪০০ একর জমিতে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর পর সর্বশেষ প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা।
শিল্পপার্কে মোট ৮২৯টি প্লটে কমপক্ষে ৫৭০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু চীনা উদ্যোক্তাদের সরে যাওয়া এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় প্রকল্পটির কাঙ্ক্ষিত সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে দ্রুত বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগসহ বাকি অবকাঠামোগত কাজ শেষ করে শিল্পকারখানা স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এ শিল্পপার্ক দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: Rupali Bangladesh
সম্পর্কিত সংবাদ
সিরাজগঞ্জে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকি
২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৮:৫২ PM · bangladesherkhabor.net
সিরাজগঞ্জে এমপির গাড়িতে হামলার মামলায় দুই আসামী রিমান্ডে
২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৮:০০ PM · nagorik tv
সিংড়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত
২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৬:৫৮ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
সিরাজগঞ্জে বয়রা ভেন্নাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ এখন দুর্গন্ধযুক্ত ডোবা,দ্রুত সংস্কার দাবি
২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৬:৫১ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
মাঠে ঘাম ঝরছে, চোখে জাতীয় দলের স্বপ্ন সিরাজগঞ্জের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েদের
২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৬:২২ PM · উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ
