শাহজাদপুর সংবাদ

মিউজিশিয়ানদের যদি এআই ব্যবহারের সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই তা কাজে লাগানো উচিত: জেমস

২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:৩০ AM

মিউজিশিয়ানদের যদি এআই ব্যবহারের সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই তা কাজে লাগানো উচিত: জেমস

আজ ২ অক্টোবর মাহফুজ আনাম জেমস–এর জন্মদিন। এ উপলক্ষে গতকাল বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচল ক্লাবে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে বসেছিলেন এই ব্যান্ড তারকা। সেখানে ছিলেন নাজমুল হক

জীবনের এ পর্যায়ে জন্মদিন নিয়ে আপনার মধ্যে কী অনুভূতি কাজ করে?

জেমস : বিষয়টি নিয়ে আমার নিজের বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানিকতার পরিকল্পনা থাকে না। সত্যি বলতে, আমি নিজে কখনো ঘটা করে জন্মদিন উদ্‌যাপন করি না। তবে আমার ভক্তরা এটি উদ্‌যাপন করেন এবং আমি দেখি। তাঁদের এই ভালোবাসা ও আয়োজন দেখতেই ভালো লাগে।

নব্বইয়ের দশকের জেমস, আর এ সময়ের যে জেমসকে আমরা দেখছি—এই দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পান?

জেমস : শিল্পী হিসেবে নিজের মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্যই দেখতে পাই না। যেভাবে আগে গান তৈরি ও পরিবেশন করতাম, এখনো সেভাবেই ভাবি। যদি বাইরে থেকে কেউ কোনো পরিবর্তন দেখতে চায়, তবে দেখতে পাবে হয়তো আগের মতো অত চুল নেই, চুল কিছুটা কমে গেছে (হাসি)—পার্থক্য বলতে এটুকুই! আমার মূল সত্তা বা চিন্তায় কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি।

একটা সময়ে চারদিকে ব্যান্ডের গান আর নতুন অ্যালবামের জোয়ার ছিল। বর্তমানের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা এবং এর ভবিষ্যৎকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

জেমস : মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থাকে বোঝাতে গিয়ে আমি ফটোগ্রাফির উদাহরণ দিতে পছন্দ করি। একসময় ফটোগ্রাফির ফিল্মের আমলে ফটোগ্রাফার হওয়ার একটা অন্য রকম গুরুত্ব ছিল। কিন্তু এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও স্মার্টফোনের যুগে সবাই ফোন নিয়ে বসে আছে, সবাই নিজেকে ফটোগ্রাফার মনে করছে, ফলে বিষয়টিতে অতিরিক্ত স্যাচুরেশন চলে এসেছে। ঠিক একইভাবে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এখন অ্যানালগ মাধ্যম থেকে ডিজিটাল হয়ে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে চলে এসেছে। মিউজিক এখন শ্রোতাদের আর কিনতে হয় না; ইউটিউব বা স্পটিফাইয়ের মতো জায়গায় মানুষ ফ্রিতে মিউজিক পাচ্ছে। আর যে জিনিস মানুষ বিনা মূল্যে পেয়ে যায়, সেটার প্রতি মানুষের সেই কদর বা আকর্ষণ আর থাকে না।

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের এই ফ্রিতে মিউজিক পাওয়া কি এখনকার মিউজিশিয়ানদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করছে?

জেমস : আমি মনে করি, আমাদের আমলের মিউজিশিয়ানরা অত্যন্ত ভাগ্যবান ছিল। বর্তমানে যারা গান করছে, তারা আমাদের চেয়েও অনেক বেশি ট্যালেন্টেড এবং দুর্দান্ত মিউজিশিয়ান। কিন্তু সময় এবং এই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ফলে এখন গানের আর্থিক মূল্য বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। ইউটিউব বা স্পটিফাই থেকে একজন শিল্পী আর কতটুকুই–বা পেতে পারেন? ফলে প্রফেশনালি গান বানিয়ে বেঁচে থাকা এখন ভীষণ কঠিন। এখন মূলত যারা লাইভ পারফরম্যান্সে ভালো করবে, তারা কিছুটা সুফল পাবে।

বর্তমানে ডিজিটাল মাধ্যম বা এআইয়ের প্রভাব কি নিজস্ব ক্রিয়েটিভিটি বা নতুন কিছু সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে?

জেমস : না, ক্রিয়েটিভিটির জায়গায় আমি একদমই তা মনে করি না। এখন যারা মিউজিক করছে বা ফটোগ্রাফি করছে, তারা বিশুদ্ধ প্যাশন থেকে করছে। পটারি বা মৃৎশিল্পের কথা চিন্তা করুন—পটারি বানিয়ে তো কেউ এখন বড় ব্যবসা করার চিন্তা করে না; মানুষ এটা ভালোবেসে একটা আর্ট ফর্ম হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। ঠিক তেমনি মিউজিকও একটি প্যাশন। আর প্রযুক্তির কথা বললে, এআই তো শুধু মিউজিক বা ছবি নয়, কোডিং বা অন্যান্য সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনছে। সামনে আর্টের বহু ফর্ম হয়তো হারিয়ে যাবে বা বদলে যাবে, সেটা মেনে নিতেই হবে। মিউজিশিয়ানদের যদি এআই বা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই তা কাজে লাগানো উচিত।

ভক্তরা সব সময় আপনার কাছে নতুন গান শুনতে চান। নতুন কোনো গান বা পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশের পরিকল্পনা কি আছে এ মুহূর্তে?

জেমস : অবশ্যই নতুন গান করার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা আছে। তবে কনসার্ট, দেশ-বিদেশের ট্যুর এবং লাইভ শোর এত ব্যস্ততা থাকে যে ট্যুর শেষে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। লাইভ পারফরম্যান্স সামলে স্টুডিওতে নতুন গান রেকর্ড করার মতো পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর অ্যালবাম বলতে ১০টি বা ৯টি গানের চেনা ছকে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গান আসে, তবে অবশ্যই করব।

তরুণ প্রজন্মের অনেক নতুন শিল্পী বা ব্যান্ড আপনার গানগুলো কাভার করে। কাভার করার এ চর্চাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

জেমস : আমি মনে করি, সংস্কৃতি হলো নদীর মতো। নদী যেমন তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে, সংস্কৃতিকেও তেমনি বইতে দিতে হয়। সেখানে বাধা দেওয়া বা নিষেধ তৈরি করা মোটেও ভালো কিছু নয়। গান তো তৈরিই করা হয়েছে মানুষ শুনবে এবং হাটে-মাঠে-ঘাটে যার যার মতো গাইবে বলে। যে যেভাবে ইচ্ছা গান গাইতে চায়, গাক না! এতে বাধা দেওয়ার কিছু নেই।

আপনার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক গুণী মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন। শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে গান করেছেন। তাঁর সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কেমন ছিল?

জেমস : শামসুর রাহমান আমার জন্য বেশ কিছু গান লিখেছিলেন, তবে দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো রেকর্ড করা হয়নি এবং গানগুলো হারিয়ে গেছে। তবে তাঁর লেখা ‘তারায় তারায়’ গানটির সঙ্গে আমার অনেক চমৎকার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমার নিজের গাওয়া গানের মধ্যে এ মুহূর্তে স্টেজে যেগুলো পারফর্ম করছি, সেগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম প্রিয় গান, শামসুর রাহমানের স্মৃতি ও তাঁর এই লেখা গান আমার হৃদয়ের খুব কাছের।

প্রয়াত গিটারিস্ট নিলয় দাস বা আপনার পুরোনো সহশিল্পীদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা কীভাবে মনে পড়ে?

জেমস : নিলয়দার সঙ্গে একসময় প্রচুর সময় কাটিয়েছি, বিশেষ করে ‘সারগাম’ স্টুডিওতে। পরে একধরনের দূরত্ব বা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল এবং তাঁর প্রয়াণের আগে আর দেখা হয়ে ওঠেনি। পুরোনো মানুষগুলোকে খুব মিস করি।

আপনার নামের সঙ্গেই বাংলা ব্যান্ডসংগীতের আরেক আইকন আইয়ুব বাচ্চুর নাম আসে। আপনাদের সম্পর্ক এবং প্রতিযোগিতা কেমন ছিল?

জেমস : (আইয়ুব) বাচ্চুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল অসাধারণ। আমাদের মধ্যে গানের একটা সুস্থ ও দারুণ প্রতিযোগিতা ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, তখন এক শিল্পী অন্য শিল্পীর রেকর্ডিংয়ে যেত। আমি স্টুডিওতে রেকর্ড করছি, বাচ্চু হয়তো চলে এল; আবার বাচ্চু রেকর্ড করছে, আমি সেখানে গিয়ে বসে আছি। তখন সবাই স্টুডিওতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত, মিউজিক আদান-প্রদান হতো। কিন্তু এখন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি হোম স্টুডিওভিত্তিক হয়ে গেছে। সবাই যার যার ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, যার ফলে আগের মতো মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ বা আড্ডা আর দেখা যায় না।

আইয়ুব বাচ্চুকে আমি সব সময় মিস করি। প্রচণ্ড আড্ডাবাজ এবং রসিক মানুষ ছিলেন। মাঝেমধ্যে ওর ওপর খুব রাগও হয় যে কেন এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেল! সর্বশেষ আমাদের যে কথা হয়েছিল, সেগুলো একান্তই আমাদের নিজেদের, তা জনসমক্ষে বলার মতো নয়। তবে আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। অনেক মিস করি দিনটা।

আপনার দীর্ঘ সংগীতজীবনে কোনো আক্ষেপ বা অপ্রাপ্তি কি আছে

জেমস : জীবনের প্রাপ্তি নিয়ে কোনো হিসাব-নিকাশ করার প্রয়োজন বোধ করি না। কী পেলাম কী পেলাম না—এসব নিয়ে কখনোই ভাবি না। আর আনন্দ-দুঃখের কথা বললে, আমি সবকিছুতেই আনন্দ খুঁজে পাই। এই যে আজকে আপনাদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি, এটাই তো অনেক বড় আনন্দ! জীবনে দুঃখ বলে কিছুকে ধরে রাখার পক্ষপাতী আমি নই; দুঃখকে সব সময় ইরেজ করে বা মুছে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

আপনার প্র্যাকটিস রুটিন কেমন?

জেমস : সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আমরা স্টুডিওতে সবাই মিলে প্র্যাকটিস করি।

আর তরুণ প্রজন্ম যারা সংগীতজগতে আসতে চায়, তাদের প্রতি আপনার কী বার্তা

জেমস : নতুন মিউজিশিয়ানদের উদ্দেশে আমার স্পষ্ট বার্তা হলো গান-বাজনা কেবল বিশুদ্ধ প্যাশন বা ভালোবাসা থেকে করো। যদি কোনো ফায়দা, অর্থ বা পাওয়ার চিন্তায় গান করতে চাও, তবে গান-বাজনা বন্ধ করে দেওয়া ভালো। ফায়দার উদ্দেশ্যে গান করতে গেলে দিন শেষে হতাশ হতে হবে। তাই কোনো স্বার্থ না দেখে শুধু ভালোবেসে সংগীত সাধনা করে যাওয়া উচিত।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ