শাহজাদপুর সংবাদ

টোকিও চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সিনেমা

২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:৩৫ PM

টোকিও চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সিনেমা

টানা ৩৫ দিনের রেকর্ড বৃষ্টির পর গতকাল বৃহস্পতিবার সুনীল ছিল টোকিওর আকাশ। রৌদ্রোজ্জ্বল এই দিনের আবহেই এল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য দারুণ এক সুসংবাদ। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩৯তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে রুবাইয়াৎ হোসেনের চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড”। উৎসবের প্রায় চার দশকের ইতিহাসে নির্বাচিত হওয়া প্রথম কোনো বাংলাদেশি চলচ্চিত্র এটি। সেদিক থেকে দেখলে এটি একটি মাইলফলক।

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ রুবাইয়াৎ হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটিতে ঢাকার এক হবু কনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। বিয়ের প্রস্তুতি, সৌন্দর্যচর্চা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক নিয়মের ঘেরাটোপের মধ্যে তার শরীর ও মন এক অস্বস্তিকর জগতে প্রবেশ করে। বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, ভয়, স্মৃতি ও অলৌকিকতার মিশেলে নারীর শরীর, ইচ্ছা, সৌন্দর্যবোধ ও বিয়ে ঘিরে সমাজে চালু থাকা জটিল ও বৈষম্যমূলক রীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় এই চলচ্চিত্র। এর আগে ভেনিস ও টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে রুবাইয়াৎ হোসেনের এ নির্মাণ।

টোকিওর স্পাইরাল হলে গতকাল যখন উৎসবের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছিল, তখন শুধু বিভিন্ন চলচ্চিত্রের নাম নয়; বরং আভাস পাওয়া গেল বিশ্ব চলচ্চিত্রের চলমান গতিধারার। সিনেমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একসূত্রে বাঁধার অঙ্গীকার নিয়ে টিফ এবার সাজিয়েছে পাঁচটি প্রতিযোগিতামূলক বিভাগসহ বিস্তৃত আয়োজন। এ বছরের থিম হচ্ছে ‘সংযোগ-চলচ্চিত্র আমাদের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে’। এই চিন্তাকে কেন্দ্র করেই ২৬ অক্টোবর থেকে আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনের এই আয়োজনে টোকিওর হিবিয়া-ইউরাকুচো-মারুনোউচি-গিনজা এলাকা পরিণত হবে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মিলনক্ষেত্রে। ২০০টির বেশি চলচ্চিত্র ও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান থাকবে উৎসবে; আগের বছরের মতো উদ্বোধনী রেড কার্পেট হওয়ার কথা হিবিয়া-নাকাদোরি অ্যাভিনিউতে। একই সময়ে ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে চলচ্চিত্র ও অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্টের বাজার টিফকম।

উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে থাকছে তাকাহিসা জেজের ‘সুকিয়াকি’, যাতে বিলবোর্ড চার্টজয়ী এক ঐতিহাসিক গানের নেপথ্যের গল্প উঠে এসেছে। সমাপনী ছবি ইয়ন সাং-হো’র কোরিয়ান জম্বি থ্রিলার ‘কলোনি’। আর সেন্টারপিস হিসেবে থাকছে ইয়ামাজাকি তাকাশির ‘গডজিলা মাইনাস জিরো’, যা ‘গডজিলা মাইনাস ওয়ান’-এর অস্কারজয়ী ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস দলের নির্মিত মহাকাব্যিক এক সিক্যুয়েল।এ বছর উৎসবে নতুন পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসামাৎসু তাকেও। তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে, চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্য ও প্রাণশক্তিকে দৃশ্যমান করা, জাপানি ও এশীয় নির্মাতাদের বৈশ্বিক পরিসরে এগিয়ে নেওয়া, নারী নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক যাত্রা জোরদার করা এবং টিফকে বিশ্বমঞ্চে প্রবেশের কার্যকর দ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। হিসামাৎসু বলেন, ‘আমরা চাই টিফকে ঘিরে অন্যান্য বড় উৎসবের মতোই মানুষ টোকিওতে একত্র হোক, আর এ বছরের আয়োজন আগামী বছরের আরও জাঁকজমকপূর্ণ ৪০তম আসরের ভিত্তি গড়ে দিক।’

এ বছরের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে জুরিদের নেতৃত্ব দেবেন অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াভিত্তিক বর্ষীয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা রলফ ডি হিয়ার, যিনি চার দশকের বেশি সময় ধরে লেখক, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করছেন। জুরি সদস্য হিসেবে আরও থাকবেন টোকিও ও নিউইয়র্কভিত্তিক প্রযোজক অ্যালেক্স লো, কোরিয়ান প্রযোজক ওহ জংওয়ান, ডিআই কালারিস্ট ইয়োভ মুর এবং জাপানি অভিনেত্রী ওয়াতানাবে মাকিকো।

অনুষ্ঠানে টিফের প্রোগ্রামিং ডিরেক্টর ইচিয়ামা শোজো জানান, এ বছর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নানা ঘরানার মোট ১৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে, যেগুলো ৩১টি দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছে। এগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে ১১২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে জমা পড়া ১ হাজার ৮৯২টি চলচ্চিত্র থেকে।

মূল প্রতিযোগিতার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে নবীন-প্রবীণ নির্মাতার মিশেল। রোমান্স, রাজনীতি, ভৌতিক, প্রকৃতি ও সামাজিক সংঘাতে টিকে থাকার লড়াইয়ে গাঁথা একগুচ্ছ ছবি। প্রদর্শিত হবে চীনের (হংকং) কিউ জিওংজিওংয়ের ‘ফুকশি: ফোর টেলস অব ফিস্টিং’, ইন্দোনেশিয়ার গারিন নুগ্রোহোর ‘রেড বিফোর ডন’, উত্তর মেসিডোনিয়ার মিলচো মানচেভস্কির ‘সিস্টার ব্রাদার ম্যানহোল কভার’ এবং চীনের (হংকং) ওয়াং জিয়াংইয়ংয়ের ‘দ্য নাইট দ্যাট বাইন্ডস আস’।

এ ছাড়া প্রতিযোগিতা বিভাগে এশীয় প্রিমিয়ার হবে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো আলোনসোর ‘ডাবল ফ্রিডম’, রোমানিয়ার তেওডোরা আনা মিহাইয়ের ‘হেইসেল ৮৫’, ইতালির সামুয়েলে রোসির ‘ইভেন ইফ হেল কেইম’, সিঙ্গাপুরের সুন শুনের ‘ম্যাজিক অ্যাটলাস’, পর্তুগালের সের্জিও গ্রাসিয়ানোর ‘মেমোরিজ অব প্রিজন’, ইরানের বাহমান ঘোবাদির ‘ট্রিজ আর ওয়াচিং’, সার্বিয়ার ইয়েলেনা মাক্সিমোভিচের ‘আনটিল দ্য ডে এন্ডস’এবং বাংলাদেশের রুবাইয়াৎ হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’।

প্রোগ্রামিং ডিরেক্টর ইচিয়ামা ইচিয়ামার ভাষায়, চলচ্চিত্রগুলোর অবলোকন তাঁকে এই বার্তা দেয় যে ‘মেরুকরণ ও সংকটের এই সময়ে অনেক নির্মাতাই অতীতের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন। তবে, ঠিক নস্টালজিয়ার জন্য নয়; বরং ইতিহাসের আলোয় বর্তমানকে অনুধাবনের জন্য।’

অনুষ্ঠান চলাকালীন মঞ্চে আরও উপস্থিত হন এ বছরের প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনীত হওয়া তিন জাপানি চলচ্চিত্রের পরিচালক ইকেদা আকিরা (‘দ্য ক্যানারিস লালাবাই’), মিশিমা ইউকিকো (‘টু সিগারেটস, থ্রি নাইটস’) এবং ইয়ামামোতো আকিরা(‘দ্য ইন্টারটুইনিং’)। তাঁরা তাঁদের চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। এ ছাড়া এবারের ফেস্টিভ্যাল নেভিগেটর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রিয় আইডল, অভিনেতা ও গায়ক নাকাজিমা কেনতোও মঞ্চে আসেন। উৎসব চলাকালীন তিনি দর্শকদের কাছে চলচ্চিত্রের ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবেন।

এবারের ‘এশিয়ান ফিউচার’ বিভাগেও সমকালীন বাস্তবতার ছাপ রয়েছে। টিফের সিনিয়র প্রোগ্রামার ইশিজাকা কেনজি নির্বাচিত ১০টি চলচ্চিত্রের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘বর্তমান অস্থির বিশ্বে এই ছবিগুলো পরিবার ও আশপাশের ছোট ছোট সম্প্রদায়ের গল্পকে সামনে নিয়ে আসে।’ এতে দেখানো হবে এশীয় তরুণ নির্মাতাদের দশটি ছবি। যার মধ্যে ইরান, কাজাখস্তান, তুরস্ক ও জাপানের ছবি রয়েছে।

অ্যানিমেশন বিভাগ বরাবরের মতোই টিফের অন্যতম আকর্ষণ। এবারে এতে নয়টি নতুন জাপানি ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র দেখানো হবে বলে জানিয়েছেন অ্যানিমেশন প্রোগ্রামিং উপদেষ্টা ফুজিৎসু রিওতা। নির্বাচিত ছবিগুলোর মধ্যে জাপানের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র কোনাননির্ভর ‘ডিটেকটিভ কোনান: দ্য ফিস্ট অব ব্লু সেফায়ার’ এবং মার্কিন ছবি ‘ফরগটেন আইল্যান্ড’ও রয়েছে।

উৎসবে আরও থাকবে প্রতিযোগিতামূলক ‘নিপ্পন সিনেমা নাউ’, ‘গালা সিলেকশন’, ক্রসকাট এশিয়া প্লাস, ‘উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট’, ‘ইউথ’, ‘ওয়ার্ল্ড ফোকাস’ ও ‘জাপানিজ ক্লাসিকস’ বিভাগ। পাশাপাশি ‘এশিয়ান স্টুডেন্টস ফিল্ম কনফারেন্স’এবং অন্যান্য বিশেষ প্রদর্শনী।

এর বাইরে জাতীয় চলচ্চিত্র আর্কাইভের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত হবে বিখ্যাত জাপানি নির্মাতা কেনজি মিজোগুচির চলচ্চিত্র নিয়ে বিশেষ রেট্রোস্পেকটিভ।মূল প্রদর্শনীর বাইরে আরও থাকছে নানা সংলাপ, সম্মাননা ও বিশেষ আয়োজন। ‘কুরোসাওয়া আ কিরা অ্যাওয়ার্ড’, ‘টিফ এথিক্যাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’ও ‘কাশিকো কাওয়াকিতা অ্যাওয়ার্ড’। পাশাপাশি জেজে তাকাহিসাকে নিয়ে ‘টোকিও টক’, জেজে ও ওয়েন ওয়াংয়ের মাস্টারক্লাস এবং জার্মান নির্মাতা উলরিকে ওটিঙ্গারের সঙ্গে আলোচনা।উৎসব চলাকালে, প্রধান ভেন্যুগুলোর অদূরে হামামাৎসুচো-কান ভবনে বসবে চলচ্চিত্রের বাজার টিফকম। সেখানে টোকিও গ্যাপ ফিন্যান্সিং মার্কেটে আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনা ও অর্থায়নের সুযোগ পেতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৪টি চলচ্চিত্র এবং অ্যানিমেশন প্রকল্প অংশ নেবে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৯তম টিফে প্রদর্শিত হবে মোট ২০৪টি চলচ্চিত্র যা গত বছরের ১৮৪-কে ছাড়িয়ে গেছে। তবে ঠিক সংখ্যার হিসাবে নয়, এ বছরের উৎসবের গুরুত্ব বাংলাদেশের অংশগ্রহণে। প্রায় চার দশকের ইতিহাসে প্রথমবার টোকিওর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রের উপস্থিতি শুধু একটি ছবির নির্বাচন নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রভাষা, নারী নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীন সিনেমার জন্য নতুন দরজা খুলে দেওয়ার মুহূর্ত। টোকিওর রৌদ্রোজ্জ্বল আবহে দেওয়া এই ঘোষণা তাই বাংলাদেশের সিনেমাকে বিশ্বমানচিত্রে আরও দৃশ্যমান করে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও বটে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ