শাহজাদপুর সংবাদ

মনোযোগ দিয়ে শোনা: হারিয়ে যাওয়া এক সুন্নত

৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৪:০৫ PM

মনোযোগ দিয়ে শোনা: হারিয়ে যাওয়া এক সুন্নত

‘আমি খুব ব্যস্ত’—কথাটি এখন শুধুই একটি তথ্য নয়, বরং কাউকে এড়িয়ে যাওয়ার একটা ভদ্র সামাজিক কৌশল। কাজের চাপ, স্ক্রিনটাইম, ডেডলাইন আর যান্ত্রিক ছোটাছুটিতে আমরা সবাই এক ক্লান্ত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

এমন এক জমানায়, যখন সবাই শুধু নিজের কথাটা বলতে কিংবা চাপাতে ব্যাকুল, অন্যকে একটু থামে মন দিয়ে শোনার মানুষ কই? অথচ গভীর মনোযোগ দিয়ে অন্যকে শোনা শুধু আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্য বা যোগাযোগের কোনো কৌশল নয়; এটি নবীজির জীবনের একটি আদর্শ।

আজকের দিনে কেউ যখন বুকের জমানো কষ্টের কথা বলতে আসে, সে অধিকাংশ সময় কোনো সমাধান চায় না। সে শুধু চায় এমন একজন মানুষ, যে কোনো বিচার ছাড়াই তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনবে।

মদিনার অতি সাধারণ এক নারী হজরত খাওলা বিনতে সালাবা (রা.)। তিনিওতৎকালীন সমাজব্যবস্থার নির্মম প্রথা ‘জিহার’-এর শিকার হয়ে নিঃস্ব আর অসহায় বোধ করছিলেন। নিজের সংসার বাঁচানোর করুণ আকুতি নিয়ে তিনি হাজির হলেন নবীজির দরবারে।

নবীজির ছোট কামরার এক কোণে বসা ছিলেন আয়েশা (রা.)। খাওলা এত বিনীত আর নিচু স্বরে কথা বলছিলেন যে পাশে বসেও তাঁর সব কথা তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন না। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৮)

একজন সাধারণ নারীর সেই ফিসফিসানি, যা ঘরের ভেতরের মানুষের কান পর্যন্তও পুরোপুরি পৌঁছাল না—আসমান থেকে নেমে এল তার জবাব।

আল্লাহ–তাআলা নাজিল করলেন, “‘আল্লাহ অবশ্যই সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সঙ্গে বাদানুবাদ করছিল এবং আল্লাহর কাছে নিজের অভিযোগ নিবেদন করছিল। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথোপকথন শুনছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১)

আয়েশা (রা.) পরে অভিভূত হয়ে বলতেন, ‘মহিমান্বিত সেই সত্তা, যার শ্রবণক্ষমতা পুরো মহাবিশ্বকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে!’ (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৮/৩৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

সমগ্র উম্মাহর ভার ছিল নবীজির কাঁধে। ওহি গ্রহণ, রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক বিচার, শত্রু সামলানো থেকে শুরু করে ইসলাম শেখানো—ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষ ছিলেন তিনি।

অথচ এত কাজের চাপের মধ্যেও সাধারণ কোনো শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি বা অসহায় নারী এসে দাঁড়ালে তিনি কখনো বলেননি, ‘আমার এখন সময় নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬১)

কারো কথা শোনার সময় নবীজি (সা.) শুধু কান পাততেন না; বরং পুরো শরীর ঘুরিয়ে সেই মানুষের দিকে মন দিয়ে দাঁড়াতেন। (শামায়িলে তিরমিজি, হাদিস: ৮)

তাঁর এই অখণ্ড মনোযোগের কারণে প্রতিটি মানুষ মনে করত, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের কাছে সে-ই বুঝি সবচেয়ে প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১১)

আমরা এমন এক মুখর যুগে বাস করছি, যেখানে শোনার চেয়ে বলার মানুষের ভিড়ই বেশি। আমরা অন্যকে বোঝার জন্য শুনি না; শুনি শুধু উত্তর দেওয়ার জন্য বা নিজের পাল্টা যুক্তি দাঁড় করানোর জন্য।

অথচ ইসলামি আখলাক আমাদের শেখায়, মনোযোগ দিয়ে শোনা নিজেই একটি ইবাদত। কারও মনের ভার হালকা করতে সব সময় বড় কোনো উপদেশের প্রয়োজন হয় না। শুধু নীরব সহমর্মিতায় এটুকু বার্তা দেওয়া, ‘আমি তোমার কথা শুনছি, তুমি একা নও’।

সবাই যেখানে বলতে ব্যাকুল, সেখানে নিজেকে একজন গভীর ও সহমর্মী শ্রোতা হিসেবে গড়ে তোলাই হতে পারে এই কোলাহলময় যুগে নবীজির চরিত্রকে লালন করার সবচেয়ে সুন্দর উপায়।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ