শাহজাদপুর সংবাদ

প্রতিবেশীর ৬ অধিকারের কথা বলে ইসলাম

৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:৫৬ AM

প্রতিবেশীর ৬ অধিকারের কথা বলে ইসলাম

প্রতিবেশী বলতে শুধু কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, গোষ্ঠী বা রক্তের সম্পর্কের মানুষকে বোঝায় না; বরং সামাজিক, ধর্মীয় বা পেশাগত অবস্থাননির্বিশেষে যাঁরাই আমাদের কাছাকাছি বসবাস করেন, তাঁরাই প্রতিবেশী। চাই তিনি মুসলিম হোন বা অমুসলিম, ধনী হোন কিংবা দরিদ্র, স্বাধীন নাগরিক হোন বা দিনমজুর।

জীবনের উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনা ও প্রাত্যহিক নানা প্রয়োজনে প্রতিবেশীরাই সবার আগে একে অপরের সান্নিধ্যে আসেন। বিপদে-আপদে স্বজনদের চেয়েও অনেক সময় প্রতিবেশীর সহায়তাই আগে পৌঁছায়।

তাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা শুধু একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ ইমানের অপরিহার্য দাবি।

প্রতিবেশীর শ্রেণিবিভাগ

পবিত্র কোরআনে প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ–তাআলা বলেন,

‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না। আর পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সঙ্গী, মুসাফির এবং তোমাদের অধীনদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬)

এই আয়াতে প্রতিবেশীর তিনটি ভিন্ন স্তরের উল্লেখ পাওয়া যায়:

১. নিকট–প্রতিবেশী: যার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় নৈকট্য রয়েছে অথবা যার বাসস্থান একেবারেই সন্নিকটে।

২. দূর-প্রতিবেশী: যার সঙ্গে আত্মীয়তার কোনো যোগসূত্র নেই, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কিংবা যার বাড়ি কিছুটা দূরে অবস্থিত।

৩. পার্শ্ববর্তী সঙ্গী: শিক্ষাঙ্গনের সহপাঠী, কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী, সফরের সঙ্গী কিংবা সাময়িকভাবে পাশে বসা সহযাত্রী। ইসলাম এদের সবার সঙ্গেই সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে।

প্রতিবেশীর মর্যাদা

রাসুল (সা.) প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে অত্যন্ত সচেষ্ট ছিলেন। ওহি নিয়ে আসার পর জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর অধিকার বিষয়ে বারবার নবীজিকে তাগিদ দিতেন।

নবীজি নিজেই বলেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে অবিরাম প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে থাকেন; এমনকি আমার মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৪)

আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের জন্যও প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ জরুরি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা পেতে চাও, তবে প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করো।’ (তাবারানি, হাদিস: ৬৫১৭)

মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসা নিঃস্ব মুহাজির সাহাবিদের মদিনার আনসাররা যেভাবে প্রতিবেশী হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন, পবিত্র কোরআনে সেই অনুপম দৃষ্টান্তের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে, ‘নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়।’ (সুরা আল-হাশর, আয়াত: ৯)

প্রতিবেশীর মৌলিক অধিকার

১. সমাদর ও সম্মান রক্ষা: প্রতিবেশীর আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন না করা একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম ভূষণ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

২. কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া: বাসাবাড়ি কিংবা কর্মক্ষেত্রের আশপাশে ময়লা ফেলা, যৌথ ব্যবহারের জায়গা অপরিচ্ছন্ন রাখা কিংবা উচ্চ শব্দে সুর-যন্ত্র বাজিয়ে অন্যের বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটানো প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার নামান্তর।

রাসুল (সা.) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন,

‘শপথ খোদার, সে ব্যক্তি মুমিন নয়, সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, কে সেই ব্যক্তি? তিনি বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৬)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, এক নারী রাতভর নামাজ পড়ত এবং দিনে রোজা রাখত; কিন্তু প্রতিবেশীকে কটু কথায় কষ্ট দিত। এ কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, ‘তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, সে নরকবাসী।’ (আল-মুস্তাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস: ৭৩৮৫)

৩. দুর্ব্যবহারে ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন: প্রতিবেশীর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং সামান্য কারণে বিরোধে না জড়ানো উচ্চতর আখলাকের পরিচায়ক।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে মুমিন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে এবং তাদের পক্ষ থেকে আসা কষ্টে ধৈর্য ধরে, সে ওই মুমিনের চেয়ে উত্তম—যে মানুষের সঙ্গে মেশে না এবং তাদের কষ্টে ধৈর্য ধারণও করে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫০৭)

৪. অভাব ও প্রয়োজনের খোঁজ নেওয়া: প্রতিবেশী অনাহারে কিংবা চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছে কি না, সে বিষয়ে সজাগ থাকা প্রতিবেশীর নৈতিক দায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সে ব্যক্তি আমার প্রতি প্রকৃত ইমান আনেনি, যে নিজে তৃপ্ত হয়ে রাত যাপন করল অথচ তার পাশের প্রতিবেশী অভুক্ত রইল এবং সে তা জানত।’ (আল-মুজামুল কবির, হাদিস: ৭৫১)

৫. মতভেদ দূর করা ও সম্প্রীতি রক্ষা: সামাজিক জীবনে ভুল-বোঝাবুঝি দেখা দিলে তা দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত মীমাংসা করে ফেলা ইসলামের নির্দেশ। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১০)

৬. উপহার আদান-প্রদান:উপহার আদান-প্রদান পারস্পরিক সম্পর্কের দূরত্ব কমিয়ে হৃদ্যতা বাড়ায়। উপহারের পরিমাণ বা মূল্য কম হলেও তা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে মুসলিম নারীরা, কোনো প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীর সামান্য উপহারকেও তুচ্ছ না ভাবে—তা যদি একটি বকরির পায়ের খুরও হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৬৬)

একইভাবে ঘরে বিশেষ খাবার তৈরি হলে তার কিছু অংশ প্রতিবেশীর ঘরে পাঠানো ইসলামের অনন্য শিষ্টাচার।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন তরকারি রান্না করো, তখন তাতে ঝোল কিছুটা বাড়িয়ে দাও এবং তোমার প্রতিবেশীর পরিবারের খোঁজ নাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫)

উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে কাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে রাসুল (সা.) দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, ‘যার ঘরের দরজা তোমার সবচেয়ে কাছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২১)

পূর্বসূরিদের আদর্শ

প্রতিবেশীর অধিকার নিশ্চিত করতে সাহাবি ও তাবেয়িরা ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) যখনই ঘরে পশু জবাই করতেন, নিজের সেবককে বারবার তাগিদ দিয়ে বলতেন, ‘আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে গোশত পৌঁছে দিয়েছ তো?’ (ইবনে আবিদ দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক, পৃ. ৭০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৯)

তাবেয়ি হাসান বসরির প্রতিবেশী একবার তাঁর ঘরের দেয়ালে ছিদ্র করে ফেলেছিল; তিনি ক্ষুব্ধ না হয়ে প্রসন্নচিত্তে বলেছিলেন, ‘হয়তো তার আলোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।’ (ইবনুল জাওযি, সিফাতুস সাফওয়াহ, ২/৯৫, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৯৭৯)

উমাইয়া খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলতেন, ‘প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে তৃপ্ত হয়ে ঘুমানো চরম অন্যায়—চাই সেই প্রতিবেশী অমুসলিমও হোক না কেন।’ (আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, কিতাবুজ জুহদ ওয়ার রাকায়েক, পৃ. ১১৬৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)

ইমাম গাজালির রূপরেখা

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থে প্রতিবেশীর অধিকারের একটি সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরে লিখেছেন, ‘প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হলে প্রথমে সালাম দেওয়া, অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, বিপদে সমবেদনা জানানো ও পাশে দাঁড়ানো এবং আনন্দের সংবাদে অভিনন্দন জানানো। তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া, প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ কিংবা ওপর থেকে ভেতরে উঁকি না দেওয়া, তাঁর পারিবারিক গোপনীয়তা প্রকাশ পেলে তা গোপন রাখা, তাঁর পরিবারের নারীদের প্রতি দৃষ্টি সংযত রাখা। ড্রেন বা চালের পানিনিষ্কাশনের পথ দেওয়া এবং যাতায়াতের রাস্তায় কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা। প্রতিবেশী বিপদে পড়লে তাঁকে উদ্ধার করা, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর বাড়িঘর ও সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটালে তাতে কর্ণপাত না করা। তাঁর সন্তানদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করা এবং দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজনীয় বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।’ (আল-গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ২/২১৩, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২)

নূর মুহাম্মদ রাহমানী: শিক্ষাসচিব, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, নারায়ণগঞ্জ

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ