শাহজাদপুর সংবাদ

কওমি শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতা: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:২২ PM

কওমি শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতা: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

সাংবাদিকতা পেশাটি সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। আর তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সংবাদমাধ্যম যেভাবে বাড়ছে, ঠিক তেমনিভাবে এই অঙ্গন ও এর সঙ্গে জড়িত সংবাদকর্মীরাও নতুন নতুন নানা ধরনের আরও রকমারি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং তা তাদের মোকাবেলাও করতে হচ্ছে। তারপরও ‘রঙিন’ এই পেশায় যুক্ত হতে উন্মুখ অসংখ্য তরুণ-যাদের মধ্যে একটা অংশ এমনও আছেন যারা কওমি মাদ্রাসায় পড়া শিক্ষার্থী।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা সিলেবাসে মাতৃভাষা বাংলা ও এর সাহিত্যচর্চা কিছুটা থাকলেও এখানে আসলে সাংবাদিকতা নিয়ে মৌলিক কোনও পড়াশোনা নেই। তা সত্ত্বেও এখানকার শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ ও ঝোঁক কিছুটা কৌতূহলোদ্দীপক। তাহলে প্রশ্ন, তাদের মধ্যে এই আগ্রহ কোত্থেকে এলো, কীভাবে এলো এবং কীভাবেই বা তারা সাংবাদিকতা শিখলেন।

এসব বিষয়ে জানতে আমরা কওমি পড়ুয়া কয়েকজন সাংবাদিক, যারা মূলধারার গণমাধ্যমে কর্মরত- তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদেরই একজন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঢাকা মেইলের প্রধান বার্তা সম্পাদক জহির উদ্দিন বাবর। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কওমি মাদরাসাপড়ুয়াদের সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন মাদ্রাসাছাত্রদের নিয়ে নিয়মিত সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। সেখান থেকে প্রেরণা পেয়ে অনেকে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন। গত প্রায় এক দশকে মাদ্রাসাপড়ুয়া কয়েক ডজন তরুণ মূলধারার গণমাধ্যমে ঠাঁই করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। কেউ কেউ তাদের কাজের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করতেও সক্ষম হয়েছেন।

তার মতে, একটা সময় কওমি মাদ্রাসায় বাংলা চর্চা করাই ছিল অনেকটা নিষিদ্ধের মতো, সেখানে এখন পুরোদস্তুর সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ হচ্ছে, সেটা ইতিবাচক দিক। তবে মাদ্রাসাপড়ুয়া যারা সাংবাদিকতায় যাচ্ছেন, সেটা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বলে দাবি করেছেন জহির উদ্দিন বাবর। তিনি দাবি করেন, এসব শিক্ষার্থীর পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে তারা আরও ভালো করতে পারবে। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড যদি এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়, তাহলে এর সুফল পাবে পুরো অঙ্গন।

জহির উদ্দিন বাবর আরও বলেন, মূলত মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে মূলধারার সাংবাদিকতায় নিজেকে ভালো কোনও অবস্থানে নিয়ে যাওয়া অনেক চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। আদর্শ ও বিশ্বাস অক্ষুণ্ন রেখে এবং লেবাস-পোশাকে কোনও পরিবর্তন না এনে এখানে টিকে থাকাটা অনেক কঠিন। তবে এটা অসম্ভব নয়। আর সেটাই দেখাচ্ছেন কিছু তরুণ। তারুণ্যের এই মিছিল অব্যাহত থাকুক সেটাই একান্ত প্রত্যাশা।

এ বিষয়ে আরেক কওমি পড়ুয়া সাংবাদিক বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকমের জয়েন্ট এডিটর মুফতি এনায়েতুল্লাহ বলেন, পড়াশোনা ও পরিবেশের ভিন্নতার কারণে কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের সাংবাদিকতায় আসা এবং বাস্তবতা একটু কঠিন। এরপরও সরাসরি খবর সংগ্রহের মাঠে হয়তো তারা এখনও সেভাবে পদচারণা শুরু করেনি, কিন্তু নিউজরুমে তারা সফলতার স্বাক্ষর রাখছে।

তিনি দাবি করেন, ফিচার ও বিদেশি সংবাদ অনুবাদে কওমি পড়ুয়া সাংবাদিকরা অনেকের চেয়ে বেশ এগিয়ে। মুফতি এনায়েতুল্লাহ বলেন, এই হিসাবে আমি মনে করি, তাদের সামনে রয়েছে অপার এক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। গণমাধ্যমগুলো যদি ‘মাদ্রাসাছাত্র’ বলে উপেক্ষা না করে তাদের কাজে লাগায়, তাহলে প্রথাগত সাংবাদিকতা আর ইসলামেকেন্দ্রিক লেখালেখির সমন্বয় ঘটানোর অপূর্ব এক সুযোগ তৈরি হবে।

উদাহরণ স্বরূপ তিনি বলেন, যেমন ধরুন, কেউ যদি বাংলা ছাড়া একটি আন্তর্জাতিক ভাষা জানেন, তাহলে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নানা খবর অনুবাদ করে এ বিষয়ে সফলতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন। কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষিত একজন ছাত্র বাংলার পাশাপাশি আরবি ও উর্দু বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেন। মোটামুটি ইংরেজিও তার জানা। এমতাবস্থায় তিনি কয়েকটি ভাষা জানার সুবিধা ভোগ করে সাংবাদিকতায় মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেন এবং দেখাচ্ছেনও।

‘আরেকটি কথা, বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামি দলগুলোর খবরা-খবর, খবরের বিশ্লেষণ, দলগুলোর সম্ভাবনার কথা কওমি থেকে উঠে আসা একজন সাংবাদিক যেভাবে নিপুনভাবে তুলে ধরতে পারবেন, অন্যরা তার মতো পারবেন না। সব মিলিয়ে কওমির ছেলের সাংবাদিকতায় ভালো করার অনেক সুযোগ রয়েছে। এ জন্য দরকার চেষ্টা ও সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক মনোভাব,’ যোগ করেন সিনিয়র এই আলেম সাংবাদিক।

কওমি শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতা নিয়ে মূল্যবান মত দিয়েছেন নয়া দিগন্তের সিনিয়র সাব-এডিটর ও আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান কওমি আলেম মাওলানা লিয়াকত আলীও। প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, কওমি শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে- এটা আশাব্যঞ্জক। তবে, এ অঙ্গনে টিকে থাকতে হলে মেহনতের বিকল্প নেই। যারা এখানে মেহনত করবে, তারা ভালো করতে পারবে। এজন্য পড়াশোনা ও দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য।

তবে শুধু নেশা ও পেশা থেকে কওমি শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করেন মাওলানা লিয়াকত আলী। বরং দীনী দায়িত্ব ও আলেম হিসেবে কর্তব্য পালনের অনুভূতি থেকে কওমি শিক্ষার্থীদের এ অঙ্গনে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সতর্ক করে মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, সাংবাদিকতা নিরস কাজ। এখানে প্রাপ্তিটা খুব সীমিত। তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তবে, কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এত পরে এসে সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ কেন তৈরি হলো, সে বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনলাইন এডিটরস অ্যালায়েন্সের সভাপতি এবং যুগান্তরের সম্পাদকীয় ও ফিচার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ হাসান শরীফ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কওমি শিক্ষার্থীরা কেন সাংবাদিকতায় পিছিয়ে পড়লেন, তা বুঝতে পারছি না। অবিভক্ত ভারতবর্ষে মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমুখরা দাপটের সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন। তবে, দেরিতে হলেও এখন আবার কওমি শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসছেন। খুব ভালো লাগছে। তাদের কয়েকজনের সাথে আমার পরিচয় আছে। খুবই সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে। তারা পেশাটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলে ভালো করবে আশা করি।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সম্পর্কিত সংবাদ