শাহজাদপুর সংবাদ

আল্লাহকে নবী সোলাইমান যেভাবে ভালোবাসতেন

৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:২৭ AM

আল্লাহকে নবী সোলাইমান যেভাবে ভালোবাসতেন

হজরত সোলাইমান (আ.) এমন বিস্ময়কর রাজত্বের অধিকারী ছিলেন, মানুষ ও জিন তো বটেই, অন্যান্য প্রাণীও ছিল যার অধীনস্থ। এই বিশাল সাম্রাজ্যের মাঝে ডুবে থেকেও তিনি আল্লাহকে ভুলে যাননি। রাজত্বের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জিকির ছিল তাঁর অধিক প্রিয়।

আল্লাহর জন্য প্রিয় বস্তু উৎসর্গ

একদিন বিকেলে তাঁর সামনে উৎকৃষ্ট ও দ্রুতগামী ঘোড়াগুলো পেশ করা হলো। সেগুলো দেখতে দেখতে সূর্য অস্তমিত হয়ে বৈকালীন নামাজের সময় পেরিয়ে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন, ঘোড়াগুলোর প্রতি মনোযোগ তাঁকে নামাজ থেকে গাফেল করে ফেলেছে।

তিনি বললেন, ‘আমি আমার প্রতিপালকের স্মরণের তুলনায় এসব কল্যাণময় বস্তুর প্রতি বেশি ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম, যতক্ষণ না তা (সূর্য) আড়ালে চলে গেল।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩২)

ঘোড়াগুলো তাঁর প্রিয় ছিল, তবু আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল হওয়া তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি আদেশ করলেন, ‘“এগুলো আমার কাছে ফিরিয়ে আনো।” তারপর সেগুলোর পা ও ঘাড়ে হাত বুলাতে (আঘাত করে হত্যা করতে) লাগলেন।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৩)

ঘটনাটি আল্লাহর ভালোবাসার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। দুনিয়ার বৈধ সৌন্দর্য ও প্রিয় বস্তু মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু সেগুলোর প্রতি আকর্ষণ যেন আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতের পথে প্রতিবন্ধক না হয়।

নবী সোলাইমানের ক্ষেত্রে ঘোড়ার প্রতি মনোযোগ তাঁকে এমনভাবে ব্যস্ত করে ফেলেছিল যে নামাজের সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়। বিষয়টি উপলব্ধি করামাত্র তিনি আল্লাহর স্মরণকে অগ্রাধিকার দেন এবং ঘোড়াগুলো আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করে সেগুলোর গোশত গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেন।

এরপর তিনি নামাজ আদায়ের জন্য সূর্য ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। আল্লাহ তাঁর জন্য সূর্য ফিরিয়ে দেন এবং তিনি নামাজ আদায় করেন। (ইবনে মাসউদ বাগাবি, তাফসিরে বাগাবি, ৭/৯০, দারে তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৪১২ হি.)

রাজত্ব পেয়েও আল্লাহর অনুগত

নবী সোলাইমানের রাজত্ব ছিল অনন্য। আল্লাহ তাঁকে এমন ক্ষমতা দিয়েছিলেন, যা অন্য কাউকে দেননি। তিনি আল্লাহর কাছে এমন রাজত্বের দোয়া করেছিলেন, যা তাঁর পরে আর কারও জন্য উপযুক্ত হবে না।

আল্লাহ-তাআলা সে দোয়া কবুল করে বাতাসকে অনুগত করে দেন এবং জিনদের মধ্য থেকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিতদেরও তাঁর অধীন করে দেন। (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৫–৩৮)

কিন্তু এই অসীম ক্ষমতার মাঝেও কোরআন তাঁর যে পরিচয়টি তুলে ধরেছে, তা হলো, ‘তিনি কতই না উত্তম বান্দা! নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন (আল্লাহর দিকে) অধিক প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩০)

কোরআনের এই প্রশংসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর পরিচয়ে আগে রাজা বা ক্ষমতাবান বলা হয়নি, বলা হয়েছে ‘আল্লাহর উত্তম বান্দা’। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা বাহ্যিক ক্ষমতায় নয়, বরং আল্লাহর আনুগত্যে নিহিত।

নেয়ামত পেয়ে কৃতজ্ঞতা ও বিনয়

নবী সোলাইমানের জীবনে ক্ষমতা ও নেয়ামত যত বিস্তৃত হয়েছে, কৃতজ্ঞতাও তত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাবার রানি বিলকিসের ঘটনা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

হুদহুদ পাখির সংবাদ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে যখন তাঁর সামনে আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নিদর্শন প্রকাশ পেল, তখন তিনি আত্মতৃপ্তিতে ডুবে যাননি। বরং বিলকিসের রাজপ্রাসাদের সিংহাসন নিজের সামনে উপস্থিত দেখে বলেছিলেন, ‘এ আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন, আমি কৃতজ্ঞ হই, নাকি অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৪০)

কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের কী অপূর্ব দৃষ্টান্ত! মানুষ যেখানে সামান্য অর্জনেই নিজের যোগ্যতার গল্প বলতে শুরু করে, সেখানে তিনি এত বড় নিদর্শনের পরও বললেন, ‘এ আমার রবের অনুগ্রহ।’

নবী সোলাইমানের প্রার্থনা

তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, ‘হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি যে নেয়ামত দান করেছেন, তার শুকরিয়া আদায় করার সামর্থ্য আমাকে দান করুন এবং এমন সৎকর্ম করার তাওফিক দিন, যা আপনি পছন্দ করেন। আর আপনার রহমতে আমাকে আপনার নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। (সুরা নামল, আয়াত: ১৯)

কৃতজ্ঞ হৃদয় আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহেরই ফল। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি মুমিনের জন্য অনন্য শিক্ষা।

ঘোড়ার ঘটনা ও বাতাসের আনুগত্য

ঘোড়াগুলো ছিল তাঁর রাজকীয় শক্তি ও সামর্থ্যের অন্যতম উপকরণ। আল্লাহর ইবাদতে বিঘ্ন ঘটানোর কারণে তিনি যখন সেগুলো কোরবানি করে ফেললেন, তখন আল্লাহ বাতাসকে তাঁর অনুগত করে দিলেন।

কোরআনে এসেছে, ‘অতঃপর আমি তাঁর জন্য বাতাসকে অনুগত করে দিলাম, তাঁর নির্দেশে ও ইচ্ছানুযায়ী তা মৃদুভাবে প্রবাহিত হতো।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৬)

এরপর আল্লাহ তাঁর জন্য জিনদেরও বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৭–৩৮)

এসব ছিল তাঁর প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।

নবী সেলাইমানের জীবন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তাঁর অন্তরের গতিপথ ছিল আল্লাহর দিকে। সম্পদ, রাজত্ব ও ক্ষমতা তাঁকে অহংকারী, ইবাদতের ব্যাপারে গাফেল এবং আল্লাহবিমুখ করতে পারেনি।

আমাদের জীবনেও দুনিয়ার প্রয়োজন আছে। পরিবার, জীবিকা, সম্পদ, পেশা, জ্ঞান ও নানা বৈধ আনন্দ মানুষের জীবনের অংশ। ইসলাম এগুলোকে নিষিদ্ধ করেনি। নিষেধ হলো এসবের মোহে এমনভাবে ডুবে যাওয়া, যাতে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য থেকে দূরে সরে যেতে হয়।

নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

nahidasultana753375@gmail.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ