“বিদেশী চিল-প্রবাসী আয়”
২৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:২৩ PM

(লায়ন মাহফুজ রহমান)
বিএনপি সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয়ে ৩ জন মন্ত্রী, আর তারা প্রত্যেকেই বিদেশে বসবাস করেছেন। চারদিকে এ নিয়ে দেশ-বিদেশে ভাইরাল আলোচনা চলছে। বিষয়টি অনেকটা সেই প্রবাদটির মতো “চিলে কান নিয়ে গেছে” আর সবাই চিলের পেছনে ছুটছে। যেমন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া, তেমনি আমাদের দর্শক-শ্রোতা। এখন সোশ্যাল মিডিয়া আয়ের একটি বড় মাধ্যম। দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সুরসুরি দিয়ে, হা-হুতাশ সৃষ্টি করে ভিউ বাণিজ্য এখন একটি ব্যবসায়িক আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
২৪-এর পূর্বে ও পরে ন্যারেটিভ একভাবে পরিচালিত হতো, আর বর্তমান সরকার পরিচালনায় সেই ন্যারেটিভে কিছু পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারেন, বুঝেও চুপ করে থাকেন। বাকিরা সেই ন্যারেটিভকে ভাইরাল করে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেন। দেশের ভেতরে ও বাইরে এমন সিন্ডিকেট বা শ্রেণি-পেশার লোক রয়েছে, যারা জাতীয় ইস্যু বা সমস্যা তৈরি করতে মরিয়া। তারা তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তাদের পালিত কর্মী ও মিডিয়াকে। আর এই ভিউ বাণিজ্য সেখান থেকেই শুরু হয়। কোনো একটি গোষ্ঠী তাদের স্বার্থকে ন্যারেটিভের রূপ দেয়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় সেটি প্রচারে সহায়তা করে, আর বাকিরা নিজেদের অর্থ খরচ করে ডাটা কিনে ভিউ বাড়াতে সাহায্য করে। এভাবেই তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে।
আমরা জানি, হাসিনা গং ও আওয়ামী লীগ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী বিশ্বাসে আস্থাশীল ছিল এবং ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। এর প্রমাণ হিসেবে অনেকে উল্লেখ করেন যে, একটি দেশের সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মসজিদের খতিব পর্যন্ত অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। বর্তমানে ভারতে তাদের অবস্থান বেশ স্বচ্ছন্দ। যে দেশের সীমান্তে একটি মুরগি বা ছাগলও নিরাপদ নয়, সেখানে কয়েক লাখ আওয়ামী কর্মী পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই ভারতের মাটিতে অবস্থান করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। যখন এই ভারতঘেঁষা রাজনীতির মাধ্যমে ১৮ বছর দেশ পরিচালিত হয়েছে, তখন তো “বিদেশী নাগরিক” শব্দটি তেমন শোনা যায়নি। যেখানে আওয়ামী ক্যাবিনেটের অনেক এমপি, মন্ত্রী এবং শেখ পরিবারের আত্মীয়-স্বজন ব্রিটেন বা আমেরিকার নাগরিকত্বধারী ছিলেন, এমনকি বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও বিদেশি নাগরিকত্বধারী ব্যক্তিরা ছিলেন তখন তো এ ধরনের ন্যারেটিভ শোনা যায়নি।
সেখানে এই সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ে দুই-তিনজন প্রবাসী থাকলে সমস্যা কোথায়? তারা যদি দায়িত্ব পালনের যোগ্য হন এবং ভালো কাজ করেন, তবে সেটি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ে তারা ভারতীয় সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং দেশের জন্য ইতিবাচক কিছু করতে ভূমিকা রাখছেন বলেই তাদের “বিদেশী” তকমা দেওয়া হচ্ছে যাতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। সমস্যা মূলত আমাদের জ্ঞানের গভীরতায়।
প্রবাসীদের নিয়ে আমাদের আবেগ সব জায়গায় সমানভাবে কাজ করে না। যেমন ধরুন, বাংলাদেশ ফুটবল দলের অর্ধেকেরও বেশি খেলোয়াড় প্রবাসী। দেশের ফুটবলের ক্রান্তিকালে জামাল ভূঁইয়া, তারিক কাজী, হামজা চৌধুরীর মতো খেলোয়াড়রা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিলাসী জীবন ছেড়ে দেশের জন্য কাজ করছেন, দেশের মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করছেন। তাহলে কি তারা বিদেশে জন্মেছেন বা বড় হয়েছেন বলে তাদেরও বাদ দিতে হবে?
প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে দেশ চলে। প্রবাসীদের অর্থ ভালো লাগে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো লাগে, তাদের দিয়ে অনুষ্ঠান সাজাতে আপত্তি নেই; কিন্তু নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কেউ দেশের জন্য কাজ করতে চাইলে তাকে “বিদেশী” তকমা দিতে আমরা কার্পণ্য করি না। এটি আমাদের জাতীয় জীবনের এক ধরনের দৃষ্টিকটূ ভণ্ডামি।
মিডিয়া বন্ধুদের বলবো, দেশ গড়তে দেশপ্রেমিক, যোগ্য ও মেহনতি মানুষের প্রয়োজন। তাদের উৎসাহ দিন, তাহলে দেশ উপকৃত হবে। আর যারা দেশের রাজনীতির নাম ভাঙিয়ে দেশের অর্থ লুট করে বিদেশে পালিয়েছে, তাদের বয়কট করুন। তাদের মুখোশ উন্মোচন করুন, যেন বিদেশেও তারা স্বস্তিতে থাকতে না পারে।
প্রবাসী দুই ধরনের। একদল হলো যারা কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। শিক্ষা অর্জন, কর্মসংস্থান ও জীবিকার তাগিদে শূন্য হাতে বিদেশে গিয়ে নিজ যোগ্যতায় সমাজ ও দেশকে মেধা, অভিজ্ঞতা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা করছেন। আরেক দল হলো সেইসব রাজনৈতিক ব্যক্তি, আমলা বা কর্মচারী, যারা দেশের অর্থ ও সম্পদ লুট করে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। একদল প্রবাসী পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখেন, আরেক দল গরিবের অর্থ লুট করে বিদেশে পাচার করেন।
বিএনপি সরকারের বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ে যারা দায়িত্বে আছেন, তারা শিক্ষা, যোগ্যতা ও আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে সমৃদ্ধ। তাদের বিরুদ্ধে দেশের অর্থ বিদেশে পাচারের কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি। আশা করি ভবিষ্যতেও এমন কিছু হবে না। তাহলে তাদের নিয়ে এত ভাইরাল প্রচারণা কেন? কারা এত আগ্রহী? কেন তারা এত অর্থ ব্যয় করছে “বিদেশী” তকমা দিয়ে তাদের সরিয়ে দিতে?
পরিশেষে বলবো, যারা দেশের অর্থ লুট করে পরিবার নিয়ে বিদেশে পালিয়েছে, তাদের ঘৃণা করুন। আর যারা বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এবং দেশের জন্য কাজ করতে চান, তাদের সম্মান করুন। এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা সবার মধ্যে জাগ্রত হোক।
১৯৭১ এবং ২০২৪ দেশের প্রয়োজনের সময় এই প্রবাসীরাই তাদের উপার্জনের অর্থ নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য ব্যয় করেছেন। সারা পৃথিবীতে ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে প্রবাসীরাই আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে তথ্য ও সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে নতুন সরকার এলেও তারা আপনাদের কাছে কিছু চাননি। প্রবাসী হিসেবে তারা শুধু সামান্য সম্মান প্রত্যাশা করেন।
পুরো সোশ্যাল মিডিয়া আজ ভারতীয় একতারার সুরে ঝংকৃত হচ্ছে। আশা করি দেশপ্রেমিক জনগণ বিষয়টি বুঝতে পারছেন। আওয়ামী লীগকেও দেখছি এই ভিউখোরদের সমীহ করতে। তাই বলবো, দেশের সব দুর্ভোগের কারিগর চাটুকার ও তেলবাজ মিডিয়া থেকে সাবধান থাকুন। পলাতক গোষ্ঠীগুলো বারবার বিভিন্ন ন্যারেটিভ নিয়ে ফিরে আসবে। তাই সত্যিকারের সাংবাদিকতা আজ জাতীয়ভাবে ভীষণ প্রয়োজন।
ধন্যবাদ সবাইকে।
লায়ন মাহফুজ রহমানরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মীপ্রবাসী পেশাজীবী সম্পাদক, কেন্দ্রীয় পেশাজীবী অধিকার পরিষদ (BPRC)কনসালটেন্ট এজেন্ট, ব্রিটিশ কাউন্সিল
The post “বিদেশী চিল-প্রবাসী আয়” appeared first on দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ.
সূত্র: দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
সম্পর্কিত সংবাদ
কালিয়াহরিপুরে চেয়ারম্যান প্রার্থী মুরশিদা জাহান নিপার গণসংযোগ ও পথসভা
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:২৬ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
সিরাজগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযান,গাঁজাসহ ২ জন গ্রেপ্তার
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৫১ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
সিরাজগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবী মিলন মেলা ২০২৬ উপলক্ষে মতবিনিময় সভা ১৯ সেপ্টেম্বর
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৩৮ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
শাহজাদপুরে সেনেটারী ল্যান্ডফিল্ড এলাকায় বৃক্ষ রোপন করলেন জেলা প্রসাশক আমিনুল
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:৪৬ PM · dainiksokal.com
কালোবাজারে চাউল বিক্রির অভিযোগ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি সত্য নয়- ডিলার জামাল উদ্দিন
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:২৪ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
