শাহজাদপুর সংবাদ

বন্ধ হয়ে আছে ৪৫ হাজার তাঁত কারখানা, বেকার ৯৬ হাজার শ্রমিক

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:০১ AM

বন্ধ হয়ে আছে ৪৫ হাজার তাঁত কারখানা, বেকার ৯৬ হাজার শ্রমিক

হস্তচালিত তাঁতের খটখট শব্দে একসময় সরব ছিল বিভিন্ন এলাকা। ধীরে ধীরে শব্দটা ক্ষীণ হতে শুরু করেছে। হয়তো একদিন একেবারেই এই শব্দ বন্ধ হয়ে যাবে। এটা অন্য মানুষের কাছে কাঠখোট্টার এক শব্দ, কিন্তু এ শব্দ এই পাড়ার বাসিন্দাদের জীবনেরই ছন্দ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাড়ার বাসিন্দাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, উত্থান-পতন। এখানকার মানুষকে একদিন জীবনের নতুন ছন্দ খুঁজতে হবে।

দেশের হস্তচালিত তাঁতিদের দুর্দিন চলছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জ জেলার গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার ঐতিহ্যবাহী তাঁতগুলো। নিরুপায় হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন তাঁতিরা।

বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলায় প্রায় ৪৫ হাজার তাঁত কারখানা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এতে অন্তত ৯৬ হাজার ২৫০ শ্রমিক বেকার হয়ে বসে আছেন। তবে তাঁত কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন মালিক ও শ্রমিকরা।

তাদের ভাষ্য, ঈদের আগে কাপড়ের চাহিদা বাড়লে অনেক মালিক বন্ধ তাঁত কারখানা আবার চালু করেন। চাহিদা কমে গেলে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে সেগুলো আবার বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেই অবস্থা চলছে। বর্তমানে বন্ধ থাকা ৪৫ হাজার তাঁত কারখানার মধ্যে কিছু সাময়িক এবং বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে বন্ধ আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। ঈদ এলে কিছু চালু হয়, বাকিগুলো বন্ধই থাকে সবসময়।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চারটি বেসিক সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, উল্লাপাড়া, কামারখন্দ, এনায়েতপুর, কাজিপুর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও শাহজাদপুর উপজেলায় মোট তাঁত কারখানা রয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭০০টি। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদরের ৩২ হাজার ১৫০টি তাঁত কারখানার মধ্যে ১০ হাজার, বেলকুচির ৭০ হাজারের মধ্যে ১৫ হাজার, উল্লাপাড়ার ২৫ হাজার ২০০টির মধ্যে ৩ হাজার ৫০০ এবং শাহজাদপুরের ৩০ হাজার ৩৫০টির মধ্যে ১০ হাজার তাঁত কারখানা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

অর্থাৎ এসব উপজেলায় মোট তাঁতের প্রায় ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি তাঁত কারখানা বন্ধ রয়েছে বেলকুচিতে, ১৫ হাজার। তবে মোট তাঁত কারখানার অনুপাতে বন্ধের হার সবচেয়ে বেশি শাহজাদপুরে, প্রায় ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। এরপর সিরাজগঞ্জ সদর ৩১ দশমিক ১ শতাংশ এবং উল্লাপাড়া প্রায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

প্রতি তাঁত কারখানায় গড়ে ২ দশমিক ৫ জন শ্রমিক কাজ করেন—এই হিসাবে বন্ধ থাকা তাঁতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আনুমানিক ৯৬ হাজার ২৫০ শ্রমিক বর্তমানে বেকার হয়ে বসে আছেন। তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা জানান, তাদের অনেকে অটোরিকশা চালানো, কৃষিকাজ, হোটেলে কাজসহ বিভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছেন।

উল্লাপাড়ার বালসাবাড়ি এলাকার পাওয়ারলুম শ্রমিক আব্দুর রউফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে দুটি তাঁত কারখানায় দিনে আটটি লুঙ্গি উৎপাদন হতো। এখন একই তাঁতে উৎপাদন হচ্ছে চারটি। আমার সাপ্তাহিক আয়ও ৪ হাজার টাকা থেকে কমে দুই হাজার টাকায় নেমে এসেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ লোডশেডিং। প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে তাঁত মালিকদের জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। মহাজনরা বাড়তি খরচের কারণে নিয়মিত জেনারেটর চালাতে চান না। কখনও কখনও আমাদের অনুরোধে কাজ করার জন্য জেনারেটর চালান। কিন্তু জেনারেটর খরচ চালিয়ে খরচ উঠানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’

উল্লাপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৪৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৩২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১২ মেগাওয়াট। একই দিন বেলকুচিতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ মেগাওয়াট। তাদের হিসাবে, দিনে তিন-চার ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সুতা, রঙ ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁত কারখানার মালিকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। এমনটি জানিয়েছেন উল্লাপাড়ার মহাজন মনিরুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই বছর আগে আমার ১২টি পাওয়ারলুম থেকে প্রতি সপ্তাহে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হতো। এখন বিক্রি নেমে এসেছে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ গড়ে বিক্রি প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে।’

তিনি বলেন, ‘জেনারেটর চালাতে এখন প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁত চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

একই কথা বলেছেন আরেক মহাজন ইব্রাহিম হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, তিন বছর আগে তার ১২টি তাঁত ছিল। এখন মাত্র দুটি চালু আছে। বাকিগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন।

লোকসানের কারণে বাকি তাঁতগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কাঁচামালের দাম বেড়েছে, আবার কাপড়ের চাহিদাও কমেছে। আরও লোকসান এড়াতে তাঁতগুলো বন্ধ করতে হয়েছে।’

তাঁত মালিকরা জানান, ঈদের আগে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হয়। ঈদ সামনে রেখে লুঙ্গি, গামছা, শাড়িসহ বিভিন্ন কাপড়ের চাহিদা বাড়লে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা কিছু তাঁত আবার চালু করা হয়। ঈদের মৌসুমে উৎপাদন বাড়লেও উৎসবের পর আবার তা কমে যায়।

সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পে লুঙ্গি, গামছা, শাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড় উৎপাদন হয়। জেলার তৈরি তাঁতের শাড়ি ও গামছা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়। কিছু পণ্য বিদেশেও রফতানি করা হয়। জেলার ব্র্যান্ডিং হিসেবে সরকারি তথ্যেও তাঁতশিল্পকে জেলার অন্যতম প্রধান শিল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উৎপাদন ও চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে শাহজাদপুরের কাপড়ের হাটেও। শাহজাদপুর কাপড়ের হাট কমিটির সদস্য মাসুম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একসময় দেশের সর্ববৃহৎ এই কাপড়ের হাট ক্রেতা-বিক্রেতায় কানায় কানায় পূর্ণ থাকতো। দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা-বিক্রেতারা এখানে আসতেন। এমনকি ভারত থেকেও নিয়মিত ক্রেতারা শাড়ি, লুঙ্গিসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড় কিনতে আসতেন।’

তিনি বলেন, ‘এখন হাটের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। আগের মতো ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি নেই। উৎপাদন ও কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে।’

বাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, জেলার প্রধান কাপড়ের বাজারে আগে প্রতি সপ্তাহে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হতো। এখন তা কমে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় গড়ে সাপ্তাহিক লেনদেন প্রায় ৬৪ শতাংশ কমেছে। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিও কমেছে।

প্রায় ৪০ বছর ধরে তাঁতশিল্পে কাজ করা ছুরমান আলী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার মালিকের ১২টি তাঁতের মধ্যে ১০টিই বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সুতা ও রঙের দাম বেড়েছে, কিন্তু কাপড়ের চাহিদা আর আগের মতো নেই। এর মধ্যে থাকে না বিদ্যুৎ। এভাবে বাকি কারাখানা চালানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

৫০ বছরের বেশি বয়সী মোশাররফ হোসেন তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পেশা পরিবর্তন করেছেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁতশিল্পে কাজ করা এই ব্যক্তি এখন একটি হোটেলে খাবার পরিবেশনের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার মতো অনেক শ্রমিকই নিয়মিত কাজ না পাওয়ায় অন্য পেশায় চলে গেছেন।

তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, সুতা, রঙ ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম কমাতে পদক্ষেপ এবং তাঁতের কাপড়ের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারের অনিশ্চয়তা কমানো না গেলে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা কিছু তাঁত শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সম্পর্কিত সংবাদ