শাহজাদপুর সংবাদ

‘জীবন এখন এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ, একাধিক কেনার সামর্থ্য নাই’ 

২২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৪৫ AM

‘জীবন এখন এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ, একাধিক কেনার সামর্থ্য নাই’ 

শারদীয় দুর্গাপূজার লম্বা ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি মুদি বাজারসহ কাঁচাবাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারদর এখন উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল রয়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমলেও চালের বাজার অপরিবর্তিত আছে। তবে সবজি ও মাছ মাংসের বাজারের দাম কমার কোনও নাম-গন্ধ নেই। ফলে দামাদামি করে যেকোনও এক তরকারি নিয়েই ঘরে ফিরছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার ও নয়াবাজার বাজার ঘুরে দেখা যায়, ফুলকপি, ঝিঙা, লাউ, কচুমুখি ও পটল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। বেগুন ও কাঁকরোলের কেজি ১০০ টাকা। শীতের আগাম জাতের মুলা ও ঢ্যাঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। তার দ্বিগুণ দামে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে শীতের আগাম শিম। নতুন আলু ১৪০ টাকা আর প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।

বিক্রেতারা বলছেন, পূজার ছুটিতে কাঁচা বাজারের বেচাকেনা খানিকটা কমলেও দাম অপরিবর্তিত আছে। রায়হান উদ্দিন নামের কাঁচাবাজারের একজন বিক্রেতা বলেন, ‘বাজারে আসা লোকজন মাছ-মাংস কিনুক আর না কিনুক সবাই কয়েক প্রকার শাকসবজি কিনে নেয়। এজন্য বেলা বাড়লেও বসে থাকি বিক্রি করার জন্য। সবকিছুর দাম আগের মতোই আছে। ওভাবে কোনও কিছুর দাম কমেনি। দাম কমলে আমরাই কম দামে বিক্রি করবো।’

রায় সাহেব বাজারে সকাল সকাল বাজার করতে এসেছেন কলতাবাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ নাসিম। পেশায় তিনি একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে থাকার কারণে আমাদের স্যালারির অর্ধেক যায় বাসা ভাড়ায়। বাকি অর্ধেক খরচ হয় সারা মাসের বাজার সদাই এবং ছেলেমেয়ের পড়াশোনা ও অসুস্থ মায়ের চিকিৎসায়। শখ আহ্লাদ বলতে তো কোনও কিছুই জীবনে অবশিষ্ট নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জীবন এখন এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ। একের অধিক তরকারি কেনার সামর্থ্য নাই। বাচ্চাকাচ্চার চাহিদা মেটাতে গেলে সংসারে টানাপোড়ন দেখা দেয়। এদিকে এক তরকারি খেতে খেতে একঘেয়েমি ধরে গেছে। তার ওপর আবার গ্যাসের সমস্যা। প্রতিমাসে গ্যাসের বিল ঠিকই দেই, কিন্তু ঠিকমতো গ্যাস পাই না। বাড়তি সিলিন্ডারের খরচ বহন করতে হয়। এসব সমস্যা থেকে কবে স্বস্তি পাবো তার কোন ঠিক ঠিকানা নাই।’

ঘরের জন্য বাজার করতে আসা ক্রেতারা দুই-এক প্রকার সবজি কিনলেও অধিকাংশ ক্রেতাদের মাছ-মাংসের দোকান উঁকি দিয়ে এড়িয়ে যেতে দেখা যায়। আবদুল হামিদ নামের একজন ক্রেতা বলেন, ‘আমাদের জন্য বাধা মাছ হচ্ছে তেলাপিয়া আর পাঙ্গাস। ওই দুইটার কেজি এখন প্রায় ৩০০ টাকা। অন্য মাছগুলোর কি দাম বা গরুর মাংস খাসির মাংসের দাম শুনে তো আমার কোনও লাভ নেই, তাই ওদিকে উঁকি দিয়েই চলে আসলাম।’

আজকের বাজারে আকার ও ওজন অনুযায়ী প্রতি কেজি রুই মাছ ৩৫০-৬০০ টাকা এবং কাতল মাছ ৪০০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কালিবাউশের দাম ৫০০-৮০০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৮০০-১৬০০ টাকা, কাঁচকি মাছ ৪০০-৬০০ টাকা এবং কৈ মাছ ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা কেজি। এ ছাড়া পাবদা মাছ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, বাতাসি মাছ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা।

অপরদিকে কাজলি মাছ ১০০০-১৬০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, টেংরা মাছ ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং মেনি মাছ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, বেলে মাছ ১০০০-১২০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং রূপচাঁদা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি।

ব্রয়লার মুরগি ১৭৫-১৮৫ টাকা, কক মুরগি ৩০০-৩১০ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩০৫-৩১০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি। প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৩৫ টাকা এবং সাদা ডিম ১২০-১৩০ টাকায়। হাঁসের ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা।

গত সপ্তাহের তুলনায় আজকের বাজারেও অনেকটা অপরিবর্তিত রয়েছে মুদিপণ্যের বাজার। বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি প্যাকেটজাত পোলাওয়ের চাল ২৩০ টাকা এবং খোলা পোলাওয়ের চাল মানভেদে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট মসুর ডাল প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ৯০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, খেসারির ডাল ৮৫ টাকা, বুটের ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ১০৫ টাকা এবং মাষকলাইয়ের ডাল ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ২০০ টাকা এবং খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৌটাজাত ও খোলা ঘি প্রতি কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা, প্যাকেটজাত ও খোলা চিনি ১১০ টাকা কেজি, দুই কেজির প্যাকেট ময়দা ১৭০ টাকা এবং দুই কেজির প্যাকেট আটা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মসলার মধ্যে প্রতি কেজি এলাচ ৫ হাজার ৪০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪০০ টাকা, সাদা গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ টাকা, কালো গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ টাকা, জিরা ৫০০ টাকা, কাজুবাদাম ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং কাঠবাদাম ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মুদি পণ্যের বিষয়ে বাকী বিল্লাহ নামের একজন ক্রেতা বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নাগালের মধ্যে আনা। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। চাকরি করে বউ-বাচ্চা নিয়ে শহরে জীবন কাটাই। কোনও ধরনের কার্ড আমাদের কপালে জুটে নাই। আমরা কোন দলও করি না তাই কোনও কার্ড কপালে জোটার সম্ভাবনাও নাই। আমাদের দাবিও প্রত্যাশা একটাই, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানো।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সম্পর্কিত সংবাদ