শাহজাদপুর সংবাদ

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে চাপে পড়েছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

২১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:৪৪ PM

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে চাপে পড়েছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

ঢাকার উত্তরে আশুলিয়ায় হা–মীম গ্রুপের পোশাক কারখানায় তখন বেলা ১১টা। প্রতিটি তলায় চলছে বিরামহীন কর্মযজ্ঞ। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাটিং মেশিনে ডেনিম কাপড় কেটে নিখুঁত মাপের টুকরা তৈরি করা হচ্ছে। পাশেই কর্মীরা সেসব কাপড় সেলাই করে বানাচ্ছেন জিনস, স্কার্ট ও জ্যাকেট।

এরপর কাপড় ধোয়া, ইস্তিরি করা, বোতাম ও চেইন লাগানোর কাজ। সবশেষে যুক্ত হচ্ছে ব্র্যান্ডের লেবেল। এরপর কিছু কর্মী তৈরি পোশাক বাক্সে ভরছেন। হা–মীম গ্রুপের বড় গ্রাহকদের মধ্যে আছে গ্যাপ, আমেরিকান ইগল ও জেসি পেনি। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ৯৩ লাখ পোশাক তৈরি করে।

কিন্তু হঠাৎ আলো কেঁপে উঠল। মুহূর্তের জন্য কর্মযজ্ঞ অন্ধকারে ডুবে গেল। পরক্ষণেই আবার আলো জ্বলে উঠল; সঙ্গে চালু হলো বিকট শব্দের চারটি ডিজেল জেনারেটর। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় এসব জেনারেটর।

হা–মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের অবস্থা খারাপ, ঘন ঘন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গ্যাসের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ডিজেল। গ্রিডের বিদ্যুতের অবস্থান তৃতীয়। যেন প্রায় পুরো অর্থনীতিই ডিজেলের ওপর চলে।’

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫১০ বিলিয়ন বা ৫১ হাজার কোটি ডলার। কিন্তু দেশটি এখন তীব্র বিদ্যুতের সংকটে পড়েছে। ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ দেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থার দুর্বলতাই সামনে এসেছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছে।

এই পরিস্থিতি দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য বড় দুঃসংবাদ। এই শিল্প দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস। সরাসরি ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এ খাতে। পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহ করেন আরও অসংখ্য মানুষ। গত বছর দেশটির পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। শুধু হা–মীম গ্রুপ থেকেই রপ্তানি হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের পোশাক।

তবে এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; উন্নয়নশীল দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকটে ভুগছে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে বিশ্বের দরিদ্র মানুষের ওপর। নাইজেরিয়ায় ডিজেলের দাম বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। তানজানিয়া ও ইথিওপিয়ায় বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। এতে কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন ও জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। পরিণামে চাল ও ভুট্টার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ছে।

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরকার ব্যাপক লোডশেডিং চালু করেছে। হাসপাতাল ও ফার্মেসির মতো জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান অবশ্য এর বাইরে রাখা হয়েছে। ব্যস্ত বাণিজ্যিক সড়কের আলোকিত বিলবোর্ডগুলো সূর্যাস্তের পরপরই নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দোকানপাটও এক ঘণ্টা আগে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সম্প্রতি সেখানকার বাসিন্দাদের দিনে সর্বোচ্চ ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়েছে।

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন এক কঠিন হিসাব–নিকাশের মধ্যে আটকে গেছে। চুলায় গ্যাসের চাপ পর্যাপ্ত থাকতে পারে—এই আশায় ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠতে হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত ভুলও বাইরের সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বিনিয়োগ করেছে। ফলে বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেকই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়। এর প্রধান কারণ ছিল হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ঘিরে সরবরাহে বিঘ্ন এবং দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি পুনঃ গ্যাসীকরণ টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ড। আগুনের কারণে টার্মিনালটি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘জ্বালানি এখন নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এটি বিরোধীদের একত্র করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’

ভূরাজনীতির টানাপোড়েনে জ্বালানিসংকট

বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকটের পেছনে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দায়ী হলেও বাংলাদেশের সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা।

২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুতের প্রায় এক–ষষ্ঠাংশ ভারত থেকে আমদানি করে। কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতার বিষয়টি ভারত যে ব্যবহার করতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এর পাশাপাশি শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের জ্বালানি নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অনেক কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্বে (নিষ্ক্রিয় করা) পাঠানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মূলত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি প্রতিবেশী অঞ্চলের বাইরের বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান রোসাটমের নির্মাণ করা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাংলাদেশ ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগের বড় অংশ এসেছে রাশিয়ার ঋণ থেকে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর কথা ছিল। কিন্তু বারবার বিলম্ব হয়েছে। এর একটি কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ব্যাংকের সঙ্গে অর্থ লেনদেন জটিল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আকাশ ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনেও বাধা সৃষ্টি হয়।

অবশেষে ১১ অক্টোবর কেন্দ্রটিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন ডিসেম্বরে কেন্দ্রটি চালু হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে ঘোষিত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতায় পৌঁছানোর আগে কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা চালাতে হবে।

এর মধ্যে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’। ১৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া এ আইনে রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সহায়তা করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ এবং পারমাণবিক জ্বালানি কেনার জন্য ঢাকাকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ছাড় অথবা অনুমোদিত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।

এদিকে বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরছে। বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানিপণ্যসহ বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে বাংলাদেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের দিকেও ঝুঁকছে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন। বেইজিংয়ে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘নতুন যুগ’ সূচনার ঘোষণা দিয়ে ১৭টি চুক্তি ও অন্যান্য সমঝোতা দলিলে সই করে। এর মধ্যে একটি চুক্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে।

তবে চুক্তিগুলোর দুটি এমন দুই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ঢাকার সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধিতে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সূত্রগুলো টাইম সাময়িকীকে জানিয়েছে।

এ ছাড়া চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সব দিকের চাপ সামলে বাংলাদেশ এখন জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা বাড়াতে মরিয়া। সরকার সম্প্রতি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থাসহ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। তবে পাঁচ বছরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এই গতি ছয় গুণ বাড়াতে হবে।

সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম টাইমকে বলেন, ‘আমরা আসলে জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছি। কোথা থেকে নতুনভাবে জ্বালানি সংগ্রহ করা যায়, তা খুঁজছি। পাশাপাশি আমরা সৌরবিদ্যুৎ নিয়েও কাজ করছি, যাতে প্রত্যেক নাগরিক জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হতে পারেন।’

তবে বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন কার্যকর হলেও অধিক জ্বালানিনির্ভর কারখানার জন্য এটি খুব বেশি কার্যকর নয়। হা–মীম গ্রুপের কারখানার ছাদে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা স্থাপন করা হয়েছে। এটি দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির তনুল চক্রবর্তী বলেন, কারখানাটি দিনরাত চালু থাকায় সূর্য যখন সবচেয়ে উজ্জ্বল থাকে, তখন মাত্র চার ঘণ্টার মতো এই সৌরবিদ্যুৎ কাজে লাগে।

জ্বালানির খরচ বাড়লেও উৎপাদন কমানোর সুযোগ নেই

পরিহাসের বিষয় হলো, জ্বালানিসংকটের মধ্যেও হা–মীম গ্রুপের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। গত তিন বছরে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ৪০০টির বেশি ছোট কারখানার কিছু ক্রয়াদেশ এখন হা–মীমের কাছে এসেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এড়াতে চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়া কিছু ক্রেতার ক্রয়াদেশও প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে।

কিন্তু হা–মীমের দৈনিক জ্বালানি বিল প্রায় দুই লাখ ডলার থেকে বেড়ে তিন লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন। ফলে উৎপাদনদক্ষতা বাড়ানোর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

হা–মীমের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মঈনের কার্যালয়ে একটি কম্পিউটার স্প্রেডশিটে প্রত্যেক কর্মীর ঘণ্টাভিত্তিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার হিসাব রাখা হয়। কোনো কর্মী লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে পড়লে ব্যবস্থাপকেরা তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।

মোহাম্মদ আবদুল মঈন বলেন, ‘হয়তো মেশিনে কোনো সমস্যা হয়েছিল। হতে পারে, সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।’ এ ধরনের ক্ষেত্রে কর্মীদের অতিরিক্ত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারপরও যাঁরা ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হন, তাঁদের পরিবর্তে অন্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকালে কারখানার ফটকে জীবনবৃত্তান্ত হাতে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।

মোহাম্মদ আবদুল মঈন আরও বলেন, ‘আমরা হয়তো কোনো ধরনের জ্বালানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু সেটাই উৎপাদনশীলতার সঙ্গে আপস না করার আরও বড় কারণ।’

উৎপাদনদক্ষতার ওপর মোহাম্মদ আবদুল মঈনের এই জোর দেওয়ার কারণ সহজেই বোঝা যায়। তৈরি পোশাকশিল্পে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। উৎপাদন খরচ বাড়লে কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানের প্রতিযোগীদের কাছে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে উৎপাদকদের।

শুধু জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করাই অবশ্য যথেষ্ট নয়। পশ্চিমা অনেক ব্র্যান্ড জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী অঙ্গীকার করেছে। ফলে বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের তৈরি পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশের শীর্ষ স্থান ধরে রাখাই যখন অনিশ্চিত, তখন অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা আরও কঠিন। দেশের ওষুধ ও চামড়াশিল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের মতো নতুন খাতে প্রবেশের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু এসব খাতে প্রতিযোগিতা কঠিন। আর মোমবাতির আলোয় বৈঠক করতে হয়—এমন দেশে বড় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করাও সহজ নয়।

গত মাসে বাংলাদেশ নতুন একটি জ্বালানি রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে। এতে নতুন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও দেশের গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন করে মোট ৩০০টি অনুসন্ধানকূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি কূপ ইতিমধ্যে খনন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এই পরিকল্পনা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। তিন থেকে চার বছরের মধ্যে হয়তো বিদ্যুতের সংকট আর থাকবে না।’

বিকেএমইএ দেশের ২ হাজার ৫০০টির বেশি পোশাক কারখানার প্রতিনিধিত্ব করে।

তবে আপাতত বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিক ও উন্নয়নশীল বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সামনে সংকট সহ্য করা ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে স্বস্তি ফেরার লক্ষণও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, শহর ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলায় রিয়াদে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। এতে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

বাংলাদেশের ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘বর্তমান সরকারের জন্য পরিস্থিতি কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে পরিস্থিতি অনেক ভালো হতো।’ ফতুল্লা অ্যাপারেলস প্রতিদিন ২২ হাজার তৈরি পোশাক উৎপাদন করে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ