জলবায়ু অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:১৯ PM

বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।
সিরাজগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ার একটি বস্তিতে সৌরবিদ্যুতে চলে পানির পাম্প। দুই বছর আগে পাম্পটি চালু হওয়ার পর বস্তির মানুষের পানির কষ্ট কিছুটা কমেছে। গত জুনের এক দুপুরে সেখানে কথা হয় মাকসুদা বেগম, রাহেলা খাতুনসহ কয়েকজন নারীর সঙ্গে। রাহেলা বলেন, ‘আগে পৌরসভার লাইনের পানি আসত দিনে দুইবার। সেই পানির জন্য লাইন দ্যায়া লাগত। কখন আসব, তার কোনো গ্যারান্টি আছিল না। এখন তো যহন চাই, পানি পাই।’
স্থানীয় একটি এনজিওর উদ্যোগে জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নে পাম্পটি বসানো হয়েছে। তবে এই পাম্প যেন সিন্ধুতে বিন্দু। স্থানীয় লোকজন ও পৌরসভার কর্মকর্তাদের হিসাবে, শহরে প্রায় ৩০টি বস্তি থাকলেও আর কোথাও এমন ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ, জলবায়ু অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
বন্যা ও নদীভাঙনে ঘর হারিয়ে যাঁরা শহরে আসছেন, তাঁদের জন্য নিরাপদ পানি, বাসস্থান ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা সামান্য। আমলাপাড়ার পাম্পের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, অল্প অর্থের একটি প্রকল্পও মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আবার শহরের বাকি বস্তিগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, সেই অর্থের পরিমাণ কত সীমিত।
বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি ডলার (প্রায় ২৮ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখানো হয়েছে। অথচ ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব অর্থে যে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড চালায়, সেটি পেয়েছে মাত্র ১০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক সরকারি জলবায়ু অর্থের বড় অংশও আসছে ঋণ হিসেবে। অর্থের অঙ্ক বাড়লেও তা কি সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে—এ প্রশ্ন তাই থেকেই যাচ্ছে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রান্তিক কৃষক মিতা রানী দাশ (৫২) গত বছর দুবার বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। বিধবা এই নারীর সংসার চলে ছোট একটি মাছের ঘের থেকে। প্রচণ্ড গরমে ঘেরের প্রায় ৩০ শতাংশ মাছ মরে যায়। পরে জুলাইয়ের প্রবল বৃষ্টিতে ঘের উপচে নষ্ট হয় বাকি মাছের অধিকাংশ। তাঁর কাছে আগাম আবহাওয়ার কোনো সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি।
সাতক্ষীরার উপকূল থেকে সিরাজগঞ্জের বস্তি—জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বর্ষা মানুষের জীবিকা, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রতিদিন ঝুঁকিতে ফেলছে। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য হলেও ক্ষতির বোঝা বড়।
তবে অস্বাভাবিক বৃষ্টি, তাপপ্রবাহ বা নদীভাঙনের ঘটনাকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা ঠিক নয়। নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি, ভূমি ব্যবহার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল অবকাঠামোও ক্ষতি বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি বাড়িয়ে এসব পুরোনো সমস্যাকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। অর্থায়নের পরিকল্পনায় তাই জলবায়ুঝুঁকির পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ও শাসনের দুর্বলতাও ধরতে হবে।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বা ন্যাপ ২০২৩–২০৫০ অনুযায়ী, ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি ডলার দরকার। বছরে গড়ে প্রয়োজন ৮৫০ কোটি ডলার; এর মধ্যে ৬০০ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক তহবিল ও উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছে।
ন্যাপে ৬টি অভিযোজন লক্ষ্য ও ২৩টি কৌশলের অধীনে পানি, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, নগর, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ ৮টি অগ্রাধিকার খাত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ হিসাবটি শুধু বাঁধ বা বড় অবকাঠামোর নয়। স্থানীয় আগাম সতর্কবার্তা, জলবায়ুসহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, জীবিকা ও নগরে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের ব্যবস্থাও এর অংশ। মিতা রানী দাশের কাছে সময়মতো আবহাওয়ার বার্তা পৌঁছানো কিংবা আমলাপাড়ায় আরও পানির পাম্প বসানো তাই জাতীয় অভিযোজনেরই কাজ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে ১১ হাজার ৬১৮ কোটি ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৯৫ কোটি ডলারের ব্যবস্থা দেশীয়ভাবে করার কথা; বাকি ৯ হাজার ২৩ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
ন্যাপ ও এনডিসির অঙ্ক সরাসরি যোগ করা যাবে না। ন্যাপ মূলত দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের হিসাব। এনডিসির ওই অঙ্কটি প্রশমন বা নিঃসরণ কমানোর কার্যক্রমের জন্য; দুই নথির সময়সীমা ও খাতও আলাদা। তবে দুটিই দেখায়, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনার আর্থিক চাহিদা দেশীয় বাজেটের সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি।
জলবায়ু অর্থায়নের আলোচনায় তিন ধরনের কাজও আলাদা রাখা দরকার। প্রশমন হলো নিঃসরণ কমানো—যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। অভিযোজন হলো ইতিমধ্যে দেখা দেওয়া বা আসন্ন ঝুঁকির সঙ্গে মানুষ ও অর্থনীতিকে খাপ খাওয়ানো। আর ক্ষয়ক্ষতি অর্থায়ন প্রয়োজন তখন, যখন অভিযোজন করেও কোনো ক্ষতি ঠেকানো যায় না। নদীতে জমি বিলীন হওয়া বা ঘূর্ণিঝড়ে সম্পদ হারানো তার উদাহরণ। এক খাতের অগ্রগতি দিয়ে অন্য খাতের ঘাটতি ঢেকে দিলে প্রকৃত প্রয়োজন বোঝা যায় না।
অর্থ বিভাগের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এটি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট ২৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সম্মিলিত বরাদ্দের হিসাবে হারটি ১১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ; আগের অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
বাজেটে বন সৃজন, বায়ু ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্বন বাণিজ্য এবং ‘এক শিশু এক গাছ’ কর্মসূচির মতো উদ্যোগের কথা আছে। জলবায়ু ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় সরকার, পানি, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে থাকে। তাই শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দেখলে সরকারের মোট জলবায়ু ব্যয়ের ছবি পাওয়া যায় না। একইভাবে এসব মন্ত্রণালয়ের পুরো বাজেটকেও জলবায়ু ব্যয় বলা যাবে না; চিহ্নিত অংশটুকুই প্রতিবেদনের হিসাবে এসেছে।
এখানে ১০০ কোটি টাকার হিসাবটি আলাদা। এটি বাংলাদেশের পুরো জলবায়ু বাজেট নয়, শুধু বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের বরাদ্দ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বড় প্রকল্পের বাইরে তুলনামূলক ছোট ও জরুরি উদ্যোগে সরকার এই তহবিলের অর্থ ব্যবহার করতে পারে। জাতীয় বাজেট আট গুণের বেশি বাড়লেও দেড় দশক আগে গঠিত তহবিলটির বার্ষিক বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়েনি।
পরিবেশ ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, এবারের বাজেটে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কিছু ইতিবাচক প্রবণতা আছে। কিন্তু বড় লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তাঁর মতে, প্রয়োজনের তুলনায় ট্রাস্ট ফান্ডে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ হতাশাজনক।
জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন প্রকাশ ও ২৫টি মন্ত্রণালয়ের ব্যয় চিহ্নিত করা প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি। তবে ‘জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট’ হিসেবে দেখানো সব ব্যয় কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন আছে। সড়ক, সেতু, ড্রেনেজ বা পানি প্রকল্পের নকশায় জলবায়ুঝুঁকি, উপকারভোগী নির্বাচন ও দীর্ঘমেয়াদি ফল বিবেচনায় না নিলে শুধু নামের কারণে সেটি সহনশীল অবকাঠামো হয়ে ওঠে না।
বরাদ্দের সঙ্গে ফলের যোগসূত্রও প্রকাশ করা দরকার। একটি খাল খননে কত মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেলেন, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কতটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রস্তুত হলো বা উপকূলে নিরাপদ পানির দূরত্ব কতটা কমল—এ ধরনের সূচক না থাকলে ব্যয়ের গুণগত মান মাপা যায় না। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিও শুরুতেই ঠিক করা জরুরি। নইলে অবকাঠামো থাকবে, কিন্তু কয়েক বছর পর সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০২৫ সালের পর্যালোচনায় বলা হয়, কয়েক বছর ধরে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন প্রায় ৮৫ শতাংশে স্থির ছিল। গবেষণাটিতে যুক্ত সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, সমস্যা শুধু বরাদ্দের অঙ্ক নয়, ব্যয়ের গুণগত মানও। অর্থ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাচ্ছে কি না এবং নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, কৃষক ও জেলেরা প্রকল্পের কেন্দ্রে আছেন কি না, সেটি দেখতে হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সর্বশেষ হিসাবে, উন্নত দেশগুলো ২০২৩ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ১৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার এবং ২০২৪ সালে ১৩ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার জলবায়ু অর্থ দিয়েছে বা বেসরকারি উৎস থেকে সংগ্রহে সহায়তা করেছে। বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের যে লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে পূরণের কথা ছিল, তা প্রথম পূরণ হয় ২০২২ সালে—দুই বছর দেরিতে।
মোট অঙ্কের পাশাপাশি প্রশ্ন হলো, অর্থ কোথায় ও কোন শর্তে যাচ্ছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির অ্যাডাপ্টেশন গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ বলছে, ২০৩৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজনে বছরে ৩১ হাজার থেকে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। অথচ ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থ ছিল মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, আগের বছরের চেয়েও ২০০ কোটি ডলার কম। প্রয়োজন ও প্রাপ্তির ব্যবধান ১২ থেকে ১৪ গুণ।
বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহের হালনাগাদ ছবিতেও একই বৈপরীত্য। ক্লাইমেট পলিসি ইনিশিয়েটিভের গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ অব ক্লাইমেট ফাইন্যান্স ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট জলবায়ু অর্থায়ন প্রথমবার ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারই গেছে প্রশমনে। বিপরীতে অভিযোজন অর্থ ২০২৩ সালে কমে গিয়ে ২০২৪ সালে প্রায় স্থির ছিল। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মতো স্পষ্ট বাজার থাকা খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও নিরাপদ পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগসহনশীল জীবিকার অর্থায়ন একই গতিতে বাড়ছে না।
বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর অর্থও দ্রুত বাড়ছে। ১০টি বড় ব্যাংকের যৌথ হিসাবে, ২০২৫ সালে তাদের নিজস্ব জলবায়ু অর্থায়ন প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর ১০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার যায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে। সেখানে অভিযোজনের জন্য ছিল ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এই অর্থ উন্নয়নশীল দেশের বড় প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নের বড় অংশ ঋণ হওয়ায় শর্ত ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ওইসিডি, ইউএনইপি ও সিপিআইয়ের অঙ্ক সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। ওইসিডি উন্নত দেশগুলোর দেওয়া ও সংগ্রহে সহায়তা করা অর্থ গণনা করে; ইউএনইপি দেখে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থ; আর সিপিআই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক, সরকারি ও বেসরকারি—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক প্রবাহের ছবি দেয়। এই পার্থক্য না বুঝলে একই অর্থ একাধিকবার গণনার ঝুঁকি থাকে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় বিতর্ক হলো, সহায়তা অনুদান হবে, নাকি ঋণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঐতিহাসিক দায় মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোর। তাই যেসব দেশের নিঃসরণ কম, তাদের ক্ষতি সামলাতে নতুন ঋণের বোঝা চাপানো ন্যায্য নয়—ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থান এমনই।
ওইসিডির হিসাবে, ২০২৩ সালে উন্নত দেশগুলোর দেওয়া সরকারি জলবায়ু অর্থের ৭৩ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৬৭ শতাংশ ছিল ঋণ। অনুদানের অংশ ছিল যথাক্রমে ২৪ ও ২৯ শতাংশ। অবশ্য সব ঋণের শর্ত এক নয়—কোনোটি বাজারদরে, কোনোটি কম সুদে ও দীর্ঘ মেয়াদে। তাই সুদ, মেয়াদ, গ্রেস পিরিয়ড, মুদ্রা এবং প্রকল্প থেকে আয় হবে কি না—সবই বিবেচ্য।
সমস্যা হলো, অভিযোজনের বহু প্রকল্প সরাসরি রাজস্ব তৈরি করে না। বাঁধ, খাল পুনঃখনন, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, আগাম সতর্কবার্তা কিংবা দরিদ্র মানুষের নিরাপদ বাসস্থানের সামাজিক লাভ বড় হলেও বাণিজ্যিক আয় সীমিত। এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারি বাজেটেই পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ঋণে টাকার অবমূল্যায়ন সেই ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।
ঋণ কোথায় ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিবেচনাও জরুরি। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে আয় বা ব্যয় কমায়—এমন প্রকল্প সহজ শর্তের ঋণ পরিশোধ করতে পারে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে ঘর হারানো পরিবারকে পুনর্বাসন কিংবা লবণাক্ত এলাকায় সুপেয় পানি দেওয়ার প্রকল্প থেকে রাজস্ব আসার সুযোগ কম। এ ধরনের কাজে অনুদান বা অত্যন্ত সহজ শর্তের দীর্ঘমেয়াদি অর্থ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। নইলে জলবায়ু ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশের করদাতাকেই বহন করতে হয়।
বৈশ্বিক গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মোট ১০টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে জিসিএফ থেকে ৯.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে। ফলে অনুমোদিত অর্থের খুব সামন্যই পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রকল্প প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির অনুমোদিত সহায়তা আরও ৬১ লাখ ডলার। একই প্রকল্পে অন্য প্রতিষ্ঠানের সহ-অর্থায়ন থাকলে মোট আকার অবশ্য আরও বড় হতে পারে।
এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ, তবে ন্যাপের বছরে ৮৫০ কোটি ডলারের চাহিদার তুলনায় সামান্য। আবার অনুমোদন, চুক্তি, অর্থছাড় ও মাঠপর্যায়ে ব্যয়—চারটি আলাদা ধাপ। কোন ধাপে কত অর্থ আছে, তার সহজ ও হালনাগাদ সরকারি হিসাব প্রকাশিত না হলে প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা কঠিন। জিসিএফের অর্থ পেতেও জটিল প্রস্তাব, কারিগরি সক্ষমতা, পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘ জবাবদিহি প্রক্রিয়া পেরোতে হয়।
তাই আন্তর্জাতিক তহবিল পাওয়ার সক্ষমতা মানে শুধু আবেদন লেখা নয়। কোন এলাকার কোন ঝুঁকিতে কত বিনিয়োগ দরকার, প্রকল্পের সম্ভাব্য ফল কী এবং অর্থ শেষ হলে কাজ কীভাবে চলবে—এসব তথ্যসহ প্রস্তুত প্রকল্পের তালিকা থাকতে হবে। মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনের তথ্য একত্র না হলে একই ধরনের ছোট প্রকল্প বারবার হয়, কিন্তু বড় ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রস্তাব তৈরি হয় না।
ব্র্যাক ও জার্মান সরকারের কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ২০১৯ সালে ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড (সিবিএফ) গঠিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত বা বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে থাকা শহরের মানুষকে সহায়তা দিতে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাকে অনুদান দেয় এই তহবিল।
ওইসিডির ২০২৫ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, সিবিএফের প্রাথমিক মূলধন ছিল প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলার। সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে বছরে প্রায় ২০ লাখ ডলার আয় হচ্ছে। সেই অর্থ স্থানীয় অভিযোজন প্রকল্পে অনুদান দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬টি প্রকল্পে অনুদান গেছে; আবেদন থেকে প্রথম অর্থছাড় হতে গড়ে ছয় মাসের কম সময় লেগেছে।
ওইসিডি আরও বলেছে, এসব প্রকল্পে ১৫ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছে। এক লাখের বেশি মানুষের জন্য পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির অবকাঠামো হয়েছে; বন্যাসহনশীল হাঁটার পথ ও ড্রেনেজে উপকৃত হয়েছেন বস্তির ২৭ হাজার বাসিন্দা। ২০টি তৃণমূল সংগঠনের পরিচালনা, অর্থ ও কারিগরি সক্ষমতা বেড়েছে এবং ২০০টির বেশি সংগঠন প্রশিক্ষণ পেয়েছে। তবে এগুলো মূলত তহবিলটির নথিভুক্ত ফল; পরিবর্তনগুলো কতটা টেকসই, তা বুঝতে স্বাধীন ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এটি বড় আন্তর্জাতিক প্রকল্পের বাইরে স্থানীয় সংগঠনের কাছে অর্থ পৌঁছানোর একটি বিকল্প পথ। তবে সরকারি বন্ডের সুদ কমলে অনুদানের কী হবে, মূল্যস্ফীতির মধ্যে মূলধনের প্রকৃত মূল্য কীভাবে রক্ষা পাবে এবং প্রকল্প শেষে মানুষের ঝুঁকি কতটা কমল—এসব ফল নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। দ্রুত অর্থছাড়ের পাশাপাশি কয়েক বছর পরের প্রভাব দিয়েও তহবিলটির সাফল্য বিচার করতে হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক মো. গোলাম রব্বানী প্রথম আলোকে বলেন, নতুন উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানাতে হবে। তবে ছোট উদ্যোগ কিছু দূর যেতে পারে; বড় জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বৃহৎ অর্থায়নের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।
সিরাজগঞ্জের নদী রক্ষা বাঁধের কাছে পুঠিয়াবাড়ি এলাকায় নদীভাঙনে ঘরহারা মানুষের জন্য ১৫টি ঘর তৈরি হয়েছে। তাঁদের একজন ফরিদা পারভিন। নদীভাঙনের পর স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে শহরের একটি বস্তির ছোট ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। এখন সবুজ টিনের নতুন ঘরে উঠেছেন। টিনের নিচে তাপরোধী স্তর আছে; আছে নিরাপদ পানি ও শৌচাগার। আগের ঘরের তুলনায় এটি তাঁর কাছে অট্টালিকার মতো।
আমলাপাড়ার পানির পাম্প ও পুঠিয়াবাড়ির ঘর আশা দেখায়। কিন্তু লাখো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে বিচ্ছিন্ন ছোট প্রকল্প যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে তিন বাস্তবতা—ঝুঁকি বাড়ছে, সরকারি অর্থ সীমিত, আর আন্তর্জাতিক অর্থ অনিশ্চিত ও শর্তসাপেক্ষ।
তাই বেসরকারি বিনিয়োগ, গ্রিন বন্ড, মিশ্র অর্থায়ন, ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট, কার্বন বাজার, দুর্যোগঝুঁকি বিমা, স্থানীয় অভিযোজন তহবিল ও শহরভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের মতো উৎস বাড়াতে হবে। তবে এগুলো অনুদানের বিকল্প নয়। অভিযোজন প্রকল্পে বাণিজ্যিক মুনাফা কম বলে সরকারি অর্থ ও আন্তর্জাতিক অনুদানকে অনুঘটক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে হবে।
এসব উৎসের কাজও ভিন্ন। গ্রিন বন্ড দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অর্থ তুলতে পারে। মিশ্র অর্থায়নে সরকারি বা অনুদানের অর্থ প্রথম ঝুঁকি নিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি কমায়। বিমা দুর্যোগের পর দ্রুত নগদ সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু প্রিমিয়াম দরিদ্র মানুষের নাগালের বাইরে হলে ভর্তুকি প্রয়োজন। কার্বন বাজার থেকে আয় সম্ভব, তবে নিঃসরণ কমানোর নির্ভরযোগ্য হিসাব, স্থানীয় মানুষের ভূমি ও সম্পদের অধিকার, স্বচ্ছ যাচাই এবং আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত না হলে নতুন বিরোধ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় সরকারের ভূমিকাও বাড়াতে হবে। কোথায় পানি জমে, কোন বসতিতে পানির সংকট, কারা তাপপ্রবাহে সবচেয়ে ঝুঁকিতে—এই তথ্য স্থানীয় পর্যায়েই সবচেয়ে স্পষ্ট। অথচ প্রকল্প তৈরি, দরপত্র, হিসাব ও আন্তর্জাতিক তহবিলের শর্ত পূরণে ছোট পৌরসভা ও স্থানীয় সংগঠনের সক্ষমতা কম। শুধু অর্থ দিলেই হবে না; প্রকল্প তৈরির কারিগরি সহায়তা, সহজ আবেদনপদ্ধতি এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও দিতে হবে।
অর্থ বিভাগ ও ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কৌশল তৈরির কাজ করছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন সেলও আছে। এখন দরকার এক জায়গায় পূর্ণাঙ্গ জনসাধারণের ডেটাবেজ—দেশীয় বরাদ্দ, বিদেশি প্রতিশ্রুতি, অনুমোদন, ঋণ-অনুদানের শর্ত, অর্থছাড়, ব্যয় ও ফলাফল যেখানে দেখা যাবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিবেশও অনিশ্চিত। ওইসিডির প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫ সালে উন্নয়ন সহায়তা কমিটির সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর সরকারি উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে—এটি নথিভুক্ত ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন। জলবায়ু অর্থ ও উন্নয়ন সহায়তা এক নয়, তবে দাতা দেশগুলোর বাজেট সংকোচন জলবায়ু অনুদানের ওপরও চাপ বাড়াতে পারে। ফলে শুধু নতুন উৎস খোঁজা নয়, পাওয়া অর্থের অগ্রাধিকার ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই তিন ধরনের ব্যবস্থা—নিজস্ব বাজেটে ধারাবাহিক ও যথেষ্ট বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অনুদান ও সহজ শর্তের অর্থ বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি অর্থ পাওয়ার পথ তৈরি করা। প্রতিটি প্রকল্পে জলবায়ুঝুঁকি ও ফল মাপতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে পরিকল্পনা ও তদারকিতে যুক্ত করতে হবে। তা না হলে বড় অঙ্ক নথিতে থাকবে, আর আমলাপাড়ার মতো বহু বস্তির মানুষ নিরাপদ পানির একটি পাম্পের অপেক্ষাতেই থাকবেন।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
সিরাজগঞ্জে ইউপি সদস্যের কাছে চাঁদা দাবি, মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগ
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:৫৮ PM · Daily Tritiya Matra
ট্রেন লাইনচ্যুতর ঘটনায় সিরাজগঞ্জে দুর্ভোগে যাত্রীরা
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:২১ PM · Sarabangla
সলঙ্গায় যুবদলের ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত,বর্নাঢ্য শোভাযাত্রায় মানুষের ঢল
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:৩০ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
বনবাড়িয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি খায়রুল এনাম ফিরোজ
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:০৮ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের নির্বাচন বাতিলের নির্দেশ
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:০০ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
