শাহজাদপুর সংবাদ

চলে গেলেন ইতালি ও ইন্টারের কিংবদন্তি মাজ্জোলা

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:১৬ AM

চলে গেলেন ইতালি ও ইন্টারের কিংবদন্তি মাজ্জোলা

সর্বকালের অন্যতম সেরা ইতালিয়ান ফুটবলার স্যান্দ্রো মাজ্জোলা মারা গেছেন। আজ ইন্টার মিলান ৮৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

পেশাদার ক্লাব ক্যারিয়ারে পুরো সময়ই ইন্টারে কাটিয়েছেন মাজ্জোলা। ক্লাবটির হয়ে ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে চারবার লিগ জয়ের সঙ্গে দুবার ইউরোপিয়ান কাপও জিতেছেন মাজ্জোলা। ১৯৬৮ সালে ইতালির ইউরো জয়ী দল এবং ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সাবেক এ ফরোয়ার্ড।

ইন্টারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে মাজ্জোলার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলা হয়, ‘সান্দ্রো মাজ্জোলা শুধু নেরাজ্জুরিদের (ইন্টার) ইতিহাসেই নন, বরং ফুটবলের ইতিহাসেই অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি ছিলেন ইন্টারের ইতিহাসের সমার্থক; ছেলেবেলায় ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর আর কখনো ছেড়ে যাননি।’

স্যান্দ্রো মাজ্জোলার বাবা ভ্যালেন্তিনো মাজ্জোলা অনেকের চোখেই ইতালির সর্বকালের সেরা ফুটবলার। কেউ কেউ তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ১০ নম্বর জার্সির খেলোয়াড়ও মনে করেন। চল্লিশের দশকে বিশ্ব কাঁপানো ‘গ্র্যান্ড তুরিনো’ নামে খ্যাতি পাওয়া তুরিনো ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন ভ্যালেন্তিনো। ১৯৪৯ সালে লিসবন থেকে ম্যাচ খেলে ফেরার পথে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া তুরিনো দলের সব খেলোয়াড়ের মধ্যে ভ্যালেন্তিনোও ছিলেন। তখন ভ্যালেন্তিনোর বড় ছেলে স্যান্দ্রো মাজ্জোলার বয়স মাত্র ৬ বছর। তাঁর ছোট ভাই ফেরুচ্চিও মাজ্জোলাও ফুটবলার ছিলেন এবং পরে কোচিংয়ে নামেন।

বাবা তুরিনোর কিংবদন্তি হলেও দুই ভাই একই পথে পা বাড়াননি। স্যান্দ্রো এবং ফেরুচ্চিও দুজনেই যোগ দেন ইন্টার মিলানে। ১৮ বছর বয়সে ইন্টারের মূল দলে মাজ্জোলার অভিষেক ঘটনাবহুল। ১৯৬১ সালে ইতালিয়ান সিরি আ–তে সেই ম্যাচে জুভেন্টাস সমর্থকরা মাঠে ঢুকে পড়ায় ইন্টারকে ২-০ গোলে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন। পরবর্তীতে সিদ্ধান্তটি বাতিল করে ম্যাচ পুনরায় খেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে যুব দল নিয়ে মাঠে নামে ইন্টার, আর এই ম্যাচেই ক্লাবটির সিনিয়র দলে অভিষেক ঘটে মাজ্জোলার।

শৈশবে ইন্টারের ‘মাসকট’ হিসেবে মাঠে নামা মাজ্জোলা সেদিন স্কুলের পরীক্ষা শেষ করে তুরিনে রওনা দেন। জুভেন্টাসের কাছে ৯-১ গোলে সেই ম্যাচে পেনাল্টি থেকে ইন্টারের হয়ে একমাত্র গোলটি ছিল মাজ্জোলার।

দ্রুত ইন্টারের মূল একাদশের নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন মাজ্জোলা। ১৯৬৪ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে ইন্টারের প্রথম ইউরোপসেরা হওয়ায় জোড়া গোলের অবদান ছিল তাঁর। ম্যাচের পর রিয়ালের কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাস তাঁর ১০ নম্বর জার্সিটি মাজ্জোলাকে উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার বাবার যোগ্য সন্তান। আমি তার বিপক্ষে খেলেছি।’পরের মৌসুমে ইন্টারের এই শিরোপা ধরে রাখায়ও মাজ্জোলার ভূমিকা ছিল অনন্য। সেমিফাইনালে লিভারপুলের বিপক্ষে গোল করেছিলেন।

গতি, সৃষ্টিশীলতা ও খেলার কৌশলগত জ্ঞানের কারণে সমসাময়িক তারকা ফুটবলারদের মধ্যে আলাদা ছিল মাজ্জোলা। মাঠের একটু গভীরে মিডফিল্ডার কিংবা প্লে মেকার হিসেবেও দারুণ খেলতেন। সিরি আ ও ইউরোপিয়ান কাপে মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন।

ইতালি জাতীয় দলে মাজ্জোলার অভিষেক ১৯৬৩ সালে ২০ বছর বয়সে। সান সিরোয় পেলের ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ৩–০ গোলের জয়ে অভিষেকেই পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইতালি গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার আগে চিলির বিপক্ষে গোল পান। মাজ্জোলা পরের দুটি বিশ্বকাপেও খেলেন। ১৯৭০ বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের ব্রাজিলের বিপক্ষে। ইতালির জার্সিতে তাঁর সেরা সাফল্য ১৯৬৮ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে। শিরোপা জয়ের পথে সেবারের ইউরোর সেরা একাদশেও জায়গা পান। ইতালির হয়ে ৭০ ম্যাচে করেছেন ২২ গোল। ইন্টারের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫৬৬ ম্যাচে করেছেন ১৬২ গোল।

নিয়তির কী অদ্ভুত কাকতাল, ইন্টারের ঘরের মাঠ সান সিরো স্টেডিয়াম উদ্ধোধনের শতবর্ষ পূর্ণ হলো আজ। আর আজই কি না না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন মাজ্জোলা!

বাবা ভ্যালেন্তিনোর কারণে ‘দ সন অব আর্ট’ নামে খ্যাতি পাওয়া মাজ্জোলা ১৯৭৭ সালে সব ধরনের ফুটবল ছাড়েন। পরবর্তীতে দুই মেয়াদে ইন্টারের ক্রীড়া পরিচালক হিসেবে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও এবং উরুগুয়ে কিংবদন্তি আলভারো রেকোবাকে সান সিরোয় নিয়ে আসায় বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। বাবার ক্লাব তুরিনোতেও ক্রীড়া পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন মাজ্জোলা।

ইতালিয়ান এই কিংবদন্তির মৃত্যুতে ইন্টার তাদের বিবৃতিতে শোক জানিয়েছে এভাবে, ‘গোঁফওয়ালা সেই তারকার দ্যুতি মাঠে যেমন ছড়িয়েছে, তেমনি আজও উজ্জ্বল। প্রায়ই বলতেন, তাঁর একটাই শেষ ইচ্ছা—তা হলো তাঁকে যেন একজন ভালো মানুষ হিসেবে মনে রাখা হয়, যিনি জয় অসম্ভব জেনেও লড়াই চালিয়ে যান, ঠিক যেমনটি হয়েছিল সেই ৯-১ ব্যবধানের ম্যাচে।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ