গাভি ছাড়াই ‘দুধ’: দুধের মতো দেখালেই দুধ নয়!
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:৪২ PM

সাদা রং, দুধের মতো ঘনত্ব, দেখতে প্রায় একই—এমনকি চর্বির মাত্রাও এমনভাবে সামঞ্জস্য করা হচ্ছে যে প্রাথমিক পরীক্ষায় সহজে সন্দেহ ধরা নাও পড়তে পারে। অথচ সেই সাদা তরল তৈরিতে কখনো সামান্য গরুর দুধের সঙ্গে পানি, তেল, চিনি, সোডা কিংবা অন্য উপাদান মেশানোর অভিযোগ উঠছে। তাহলে আমরা আসলে কী পান করছি—দুধ, নাকি দুধের ছদ্মবেশে তৈরি একটি নকল তরল?
প্রশ্নটি এখন আর তাত্ত্বিক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান দুগ্ধ উৎপাদনকারী অঞ্চল পাবনা-সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে নকল ও ভেজাল দুধ তৈরির একের পর এক খবর সামনে এসেছে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সোডা, সয়াবিন তেল, চিনি, লবণ, পানি ও অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে দুধের মতো সাদা তরল তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাবনার ফরিদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়াসহ আশপাশের এলাকাতেও একই ধরনের ঘটনার খবর এসেছে। এই বিস্তৃত অঞ্চল বাঘাবাড়ী ঘাটকেন্দ্রিক দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
গত ২ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাবনার ফরিদপুরে গত এক বছরে নকল দুধ তৈরিতে জড়িত অন্তত ১২ জনকে জেল বা জরিমানা করার পরও এ কারবার বন্ধ হয়নি। ২৬ আগস্ট চাটমোহরে অভিযানে প্রায় ৩০০ লিটার নকল দুধ জব্দ করা হয়। ৩১ আগস্টের আরেক প্রতিবেদনে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের আরও কয়েকটি এলাকায় নকল দুধ তৈরির অভিযোগ উঠে আসে।
এতগুলো ঘটনাকে একটি উপজেলা বা জেলার বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। আবার পাবনা বা সিরাজগঞ্জে কয়েকটি নকল দুধের ঘটনা পাওয়া মানে এই দুই জেলার সব দুধ বা সব খামারিকে সন্দেহ করাও অন্যায়। বরং এসব ঘটনাকে বড় একটি সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা দরকার।
নকল বা ভেজাল দুধের ঝুঁকি শুধু পাবনা-সিরাজগঞ্জ কিংবা বাঘাবাড়ী দুগ্ধবলয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ—এমন ধরে নেওয়ারও কারণ নেই। দেশের যেখানে কাঁচা দুধ সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল রয়েছে, যথাযথ নজরদারির ঘাটতি থাকলে সেখানেও একই ধরনের জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই এখন শুধু কে নকল দুধ বানাচ্ছে, তা জানলেই হবে না। জানতে হবে—কে কিনছে, কোন পথে যাচ্ছে, কোথায় মিশছে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছাচ্ছে।
দুগ্ধবিজ্ঞান, দুধের গুণমান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা, পাঠদান ও মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—দুধের বিশুদ্ধতা শুধু চোখে দেখে, স্বাদ নিয়ে কিংবা একটি সাধারণ পরীক্ষা দিয়ে নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।আমার লেখা ‘মিল্ক অ্যান্ড ডেইরি ফুডস: নিউট্রিশন, প্রসেসিং অ্যান্ড হেলদি এজিং’ বইয়েও দুধের গঠন, পুষ্টিমান ও গুণমান নিয়ে আলোচনা করেছি। দুধ শুধু সাদা রঙের একটি তরল নয়।
প্রাকৃতিক দুধে পানি, চর্বি, প্রোটিন, ল্যাকটোজ ও খনিজ স্বাভাবিক ভারসাম্যে থাকে। কিন্তু পানি, তেল ও অন্য উপাদান মিশিয়ে দুধের মতো সাদা ও ঘন তরল তৈরি করা সম্ভব। দুধের চেহারা নকল করা যায়, প্রকৃত গঠন ও পুষ্টিমান নয়।
সাম্প্রতিক উল্লাপাড়ার প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, তৈরি করা তরলের চর্বির মাত্রা এমনভাবে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করা হয়, যাতে সাধারণ পরীক্ষায় সেটিকে স্বাভাবিক দুধের কাছাকাছি মনে হয়। তাই শুধু ঘনত্ব বা চর্বির মাত্রা দেখে সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
দুধে পানি মেশানোর সন্দেহ হলে ঘনত্ব, হিমাঙ্ক, চর্বি ও চর্বিবিহীন কঠিন পদার্থসহ কয়েকটি সূচক দেখতে হয়। আবার শ্বেতসার, ইউরিয়া, ক্ষারজাতীয় পদার্থ, বহিরাগত চর্বি, প্রক্ষালকজাতীয় পদার্থ, ফরমালডিহাইড বা হাইড্রোজেন পার–অক্সাইডের সন্দেহ হলে আলাদা পরীক্ষা প্রয়োজন। অর্থাৎ নকল বা ভেজাল দুধ শনাক্ত করার একটিমাত্র সর্বজনীন পরীক্ষা নেই। প্রাথমিক পরীক্ষায় সন্দেহ পাওয়া গেলে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু একটি নমুনা নকল প্রমাণিত হওয়াই তদন্তের শেষ নয়; বরং আসল তদন্ত তখন থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
কেউ নিয়মিত নকল দুধ তৈরি করলে তার ক্রেতাও থাকার কথা। বাজার না থাকলে এই অবৈধ পণ্য বারবার তৈরির অর্থনৈতিক কারণ থাকে না। তাই শুধু উৎপাদনস্থলে অভিযান চালিয়ে কয়েক শ লিটার তরল জব্দ বা ধ্বংস করলেই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত নয়। জানতে হবে—কে তৈরি করছে, কে কিনছে, কোন সংগ্রাহকের মাধ্যমে যাচ্ছে, কোন সংগ্রহকেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছে, খাঁটি দুধের সঙ্গে মিশছে কি না এবং মিষ্টি, ছানা, দই কিংবা অন্য কোনো দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে কি না।
যিনি নকল দুধ তৈরি করছেন, তাঁকে ধরার পাশাপাশি যিনি জেনেশুনে সেটি কিনছেন বা বাজারজাত করছেন, তাঁকেও শনাক্ত করতে হবে। কারণ, ক্রেতা ও বাজার অক্ষত থাকলে একজন উৎপাদনকারী ধরা পড়ার পর আরেকজন তাঁর জায়গা নিতে পারেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে—জরিমানা হচ্ছে, কারাদণ্ড হচ্ছে, নকল দুধ নষ্ট করা হচ্ছে; তারপরও আবার নতুন ঘটনার খবর আসছে। অর্থাৎ শুধু ঘটনাভিত্তিক অভিযান যথেষ্ট হচ্ছে না।
নকল দুধ তৈরি ও বিক্রি করে যে অর্থনৈতিক লাভ হচ্ছে, শাস্তির ঝুঁকি যদি তার তুলনায় সামান্য হয়, তাহলে জরিমানা কার্যকর প্রতিবন্ধক নাও হতে পারে। সমস্যাটিকে তাই শুধু ‘ভেজাল দুধ’-এর সমস্যা হিসেবে নয়, উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, ক্রয় ও বাজারজাতকরণের একটি সম্ভাব্য চক্রের সমস্যা হিসেবেও দেখতে হবে।
পাবনা-সিরাজগঞ্জ ও বাঘাবাড়ী দুগ্ধবলয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে দেশের সামগ্রিক দুধ সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা উচিত। দেশের অন্যান্য দুগ্ধ অঞ্চল, কাঁচা দুধের বাজার, সংগ্রহকেন্দ্র ও দুগ্ধজাত খাদ্য প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি প্রয়োজন। কোথাও ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো অঞ্চল বা প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা উচিত নয়। তবে খাদ্যনিরাপত্তার কার্যকর ব্যবস্থা শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলকও হতে হবে।
প্রথমত, যেসব এলাকায় বারবার নকল বা ভেজাল দুধের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়া নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দুগ্ধ উৎপাদন ও সংগ্রহ এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে নজরদারি বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কোনো নমুনায় ভেজাল প্রমাণিত হলে তদন্ত উৎপাদনস্থলে থামানো যাবে না। সেই দুধ কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় গেছে—দুই দিকেই অনুসন্ধান করতে হবে। কোন খামারি বা সংগ্রাহকের কাছ থেকে কত দুধ এসেছে, কোন সংগ্রহকেন্দ্রে গেছে এবং পরে কোথায় সরবরাহ হয়েছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, সংগ্রহকেন্দ্রে শুধু চর্বি বা ঘনত্ব পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। ঝুঁকি অনুযায়ী চর্বিবিহীন কঠিন পদার্থ, হিমাঙ্ক এবং সম্ভাব্য ভেজালের দ্রুত প্রাথমিক পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বারবার অপরাধে জড়িত হলে শুধু জরিমানা নয়, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পঞ্চমত, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও পরীক্ষাগারগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্যবিনিময় ও সমন্বয় দরকার।
কোনো এলাকায় নকল দুধ পাওয়া মানে সেই এলাকার সব দুধ নকল নয়। পাবনা ও সিরাজগঞ্জে হাজার হাজার খামারি পরিশ্রম করে প্রকৃত দুধ উৎপাদন করছেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য তাঁদের সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা অন্যায়।বরং নকল দুধের কারবারে সৎ খামারিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। কম খরচের নকল তরল বাজারে ঢুকলে তাঁরা ন্যায্য দাম হারান; আবার পুরো এলাকার দুধের ওপর মানুষের আস্থাও কমে যায়। তাই নকল দুধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুধু জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয় নয়; এটি সৎ খামারি ও দেশের দুগ্ধশিল্পকে রক্ষারও বিষয়।
একই ধরনের ঘটনা যখন বারবার ঘটে, তখন তদন্ত ও নজরদারির ধরনও বদলাতে হয়। শুধু ‘কে বানাচ্ছে’—এই প্রশ্নের উত্তর যথেষ্ট নয়। জানতে হবে—কে কিনছে, কোন পথে যাচ্ছে, কোথায় মিশছে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছাচ্ছে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনে রাখা দরকার—দুধের রং, ফেনা, ঘনত্ব বা স্বাদ দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। চোখ সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু শেষ কথা বলবে পরীক্ষাগার। তবে পরীক্ষাগারে নকল দুধ শনাক্ত হলেই দায়িত্ব শেষ নয়। সেই প্রমাণ ধরে উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত পুরো সরবরাহপথ অনুসরণ করতে হবে। কারণ, একজন নকল দুধ প্রস্তুতকারীকে ধরলে একটি ঘটনা হয়তো বন্ধ হবে; কিন্তু তার ক্রেতা, বাজার ও সরবরাহের পথ অক্ষত থাকলে একই কারবার আবার ফিরে আসতে পারে।
তাই নকল দুধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে শুধু উৎপাদনস্থলে অভিযান নয়, উৎস থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো চক্রকে নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবেই নিরাপদ থাকবেন ভোক্তা, সুরক্ষিত থাকবেন সৎ খামারি এবং দেশের দুধ ও দুগ্ধশিল্পের প্রতি মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ন থাকবে।
•ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd
*মতামত লেখকের নিজস্ব
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
সিরাজগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবীদের সম্মাননা দিলেন ‘সুজন’স সার্চ ফর সোশ্যাল হিরো’ নামের সংগঠন
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৩:৩৪ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
সিরাজগঞ্জে নানা আয়োজনে শ্রীশ্রী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আবির্ভাব দিবস পালন
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:২৬ AM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
