শাহজাদপুর সংবাদ

কামারখন্দে ৮২ লাখ টাকা দুর্নীতির মামলায় শিক্ষক হাসান ইমামের সাজা

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:২৯ PM

কামারখন্দে ৮২ লাখ টাকা দুর্নীতির মামলায় শিক্ষক হাসান ইমামের সাজা

মো. জুয়েল হোসেন,সিরাজগঞ্জ :

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ী গ্রামের মো. হাসান ইমাম তালুকদার। তিনি চৌবাড়ী ড. সালাম-জাহানারা ডিগ্রি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকার চেক ডিজঅনার মামলায় আদালত তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা জরিমানা করেছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, নেত্রকোণার যুগ্ম দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক মিথিলা ফারজানা নীপা গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ এক আদেশে মো. হাসান ইমাম তালুকদারকে ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন। চেকের অর্থের পরিমাণ বিবেচনায় তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার পুরো অর্থ অভিযোগকারী পাওয়ার অধিকারী বলে আদেশে উল্লেখও করা হয়।

মামলার নথিতে থেকে জানা গেছে, ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য হাসান ইমাম তালুকদার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন। চেকটির তারিখ ছিল ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ এবং এর পরিমাণ ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা। ২৬ অক্টোবর, ২০২১ চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে তার হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তা ডিজঅনার হয়। পরে ১৮ নভেম্বর, ২০২১ তাকে আইনি নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি পাওনা টাকা পরিশোধ করেননি।

আরও জানা গেছে, মামলার বিচার চলাকালে বাদীপক্ষ একজন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে সাক্ষ্য দেয়। তবে আসামি অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গঠিত অভিযোগ তাকে পড়ে শোনানো সম্ভব হয়নি এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা যায়নি।

এদিকে আদনান এগ্রো লিমিটেডের ম্যানেজার (সেলস) মো. সোহেল রানা কর্তৃক দায়ের করা অভিযোগে হাসান ইমাম তালুকদারের বিরুদ্ধে ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, হাসান ইমাম তালুকদার ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই আদনান এগ্রো লিমিটেডের পরিবেশক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন।

এরপর ২০১৮ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ২৪ মে পর্যন্ত তিনি বরিশালের ডিপো অফিস থেকে নগদ ও বাকিতে পোল্ট্রি ফিড ক্রয় করেন। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের কাছে তার ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা পাওনা হয়। ২০২১ সালের ২৪ মে’র পর থেকে ওই টাকা বকেয়া রেখে তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে পোল্ট্রি ফিড নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং যোগাযোগও বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিভিন্নভাবে পাওনা টাকা চাইলে তিনি টাকা দেওয়ার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরে ২০২২ সালের ২৪ মার্চ বরিশালের আদনান এগ্রো লিমিটেডের অফিসে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে পাওনা টাকার হিসাব-নিকাশ করে টাকা ফেরত চাওয়া হলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করে চলে যান। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পরে ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল আইনজীবীর মাধ্যমে তাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

অভিযোগপত্রের সঙ্গে পাওনা টাকার হিসাবের লেজার শিট, ব্যবসায়িক চুক্তিপত্র ও মামলা পরিচালনার অনুমতিপত্রের ফটোকপি দাখিল করা হয়। মামলাটি বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন ছিল।

এদিকে হাসান ইমাম তালুকদার শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিক পেশায় যুক্ত থাকায় তার দ্বৈত পেশা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে তিনি দুটি পেশায় যুক্ত আছেন। সিরাজগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক জয়সাগর পত্রিকার সম্পাদক এবং চৌবাড়ী ড. সালাম-জাহানারা ডিগ্রি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আদনান এগ্রো লিমিটেডের পরিবেশক হিসেবেও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের একাধিক চাকরি বা আর্থিক লাভজনক পদে থাকার বিষয়ে সরকারি নীতিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে। এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিয়েও আগে অভিযোগ ওঠে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। এমনকি এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মামলা করেছিলেন বলেও জানা গেছে।

পরে সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফুল ইসলাম ইন্না বিষয়টি উল্লেখ করে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক জেলার সব উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের তদন্তে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা বা অন্য পেশায় যুক্ত থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়।

সংশ্লিষ্ট তদন্তের তথ্যেই হাসান ইমাম তালুকদারের শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি প্রতীয়মান হয় বলে জানা গেছে। ফলে হাসান ইমাম তালুকদার কোন সময় থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং একই সময়ে সাংবাদিকতা বা অন্য কোনো পেশা থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয়।

অভিযুক্ত ভাইস প্রিন্সিপাল হাসান ইমাম বলেন, সাজার বিষয়ে আমার জানা নাই। আপনারা কাগজপত্র দেখেন, কি হয়।

চৌবাড়ী ড. সালাম-জাহানারা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. জোনায়েদ হোসেন বলেন, তিনি দীর্ঘদিন কলেজে আসেননি, তার জন্য বেতন কর্তন করা হয়েছিল। আবার শুনেছি তার নামে চেক ডিজঅনারের মামলায় ১ বছরের সাজা হয়েছে। এসব তো কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পাশাপাশি আমাদের প্রতিষ্ঠানের মানসম্মানও ক্ষুণ্ন হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ম্যানেজিং কমিটির এক সদস্য বলেন, স্বৈরাচারী আওয়ামীলীগ এর সময়ে হাসান ইমাম কলেজে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তিনি দ্বৈত পেশা করেন, তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

কলেজের সভাপতি আজিজ সরকার বলেন, সাজার বিষয় নিয়ে আমরা মিটিং এ বসেছিলাম। হাসান ইমাম আমাদের থেকে সময় নিয়েছেন। সময় পার হওয়ার পরে আমরা কলেজ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

The post কামারখন্দে ৮২ লাখ টাকা দুর্নীতির মামলায় শিক্ষক হাসান ইমামের সাজা appeared first on দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ.

সূত্র: দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ

সম্পর্কিত সংবাদ