শাহজাদপুর সংবাদ

হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫% অপুষ্টির শিকার

২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ২:০০ PM

হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫% অপুষ্টির শিকার

অপুষ্টির শিকার শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের নমুনা পরীক্ষায় ৯৫ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) যৌথভাবে এই গবেষণা করেছে। গতকাল বুধবার শিশু হাসপাতাল মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতসহ স্বাস্থ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, গবেষক ও চিকিৎসকেরা উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণা ফলাফল অবহিতকরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, দেশের মানুষ হামের মহামারির মধ্যে পড়ে গেছে। হামের এই প্রাদুর্ভাব থামানো কঠিন। হাম থামাতে টিকা ছাড়া আর কোনো পথ জানা নেই। টিকা দেওয়ার জন্য মাঠকর্মীর পদ আছে ৪০ হাজার। এসব পদে মানুষ আছে ২৫ হাজার। প্রায় ৪০ শতাংশ পদ খালি রেখে সব শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বহুমাত্রিক ব্যর্থতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ‘ম্যাজিক বুলেট’ দিয়ে এটি ঠিক করা যাবে না। সবকিছু ঠিক থাকলে হাম নিয়ন্ত্রণে আসতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এ বছর মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে চিকিৎসা নিতে আসা ৩৫৪ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা হয়েছে। এদের বয়স ১৪ বছরের কম। গবেষকেরা শিশুদের জনমিতিক ও চিকিৎসাগত তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি তাদের নমুনা পরীক্ষা করেছেন এবং নমুনা থেকে সংগৃহীত জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন।

নমুনা পরীক্ষা ও জিন বিশ্লেষণের পরীক্ষা হয়েছে আইসিডিডিআরবির ল্যাবরেটরিতে। দুই প্রতিষ্ঠানের ১২ জন বিজ্ঞানী, গবেষক ও কর্মকর্তা এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে গবেষণার প্রথম অংশ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম। তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৭১ শতাংশ সরাসরি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চলে আসে। বাকি ২৯ শতাংশ শিশু আসে ঢাকা বা ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে টিকিৎসা নেওয়ার পর ‘রেফার’ হয়ে। চিকিৎসা নিতে আসা ৫ শতাংশের কিছু বেশি শিশুর আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) সেবা দরকার হয়েছে।

গবেষকেরা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেন। এই বয়সী শিশুর সংখ্যা ছিল ৩০৮ জন। গবেষণায় দেখা গেছে, এদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগেছে ১২ শতাংশ শিশু। মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে আক্রান্ত ৫৩ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টির শিকার। শিশুদের ৩৪ শতাংশের পুষ্টি পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। বাকি ১ শতাংশ শিশুর ওজন বয়সের তুলনায় বেশি ছিল।

মায়ের দুধের সঙ্গে শিশুর পুষ্টির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আবার বিশেষজ্ঞরা বলেন, মায়ের দুধ শিশুর শরীরে হামসহ নানা রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পায়নি। শাল দুধ এবং জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ শিশুর জন্য টিকার কাজ করে। এই সময় শিশুর অন্য কোনো খাবারের দরকার হয় না। দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া ১১ শিশুর মধ্যে ৯ (৮২ শতাংশ) শিশু শুধু বুকের দুধ খেত না।

টিকা হাম থেকে সুরক্ষা দেয়। দেশে ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ও ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। টিকা দেওয়া, না দেওয়ার ব্যাপারে ৩৪২ জনের তথ্য পর্যালোচনা করেছেন গবেষকেরা। তাতে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত ৪৩ শতাংশ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। অর্থাৎ তাদের বয়স ৯ মাসের কম।

অন্যদিকে টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার পরও ৩৭ শতাংশ শিশুকে কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি। হামের টিকা এক ডোজ পেয়েছে ১৪ শতাংশ শিশু। আর দুই ডোজ পেয়েছে ৬ শতাংশ শিশু।

দেখা যাচ্ছে, হামের টিকা দুই ডোজ পাওয়ার পরও বেশ কিছু শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও শিশুরা কেন হামে আক্রান্ত হলো, তার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে হামের ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণের তথ্য উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে হামের ভাইরাসের ২৮টি ধরন আছে। বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে হামের ভাইরাসের বি৩ ধরনেই মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়। এই ধরনে খুবই সামান্য রূপান্তর ঘটেছে। সেই রূপান্তর ভাইরাসটিকে আরও বেশি সংক্রামক করে তোলেনি। এর অর্থ, ভাইরাসের কারণে দেশে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে—বিষয়টি এমন নয়।

মো. মোস্তাফিজুর রহমান আইসিডিডিআরবিরই অন্য একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, শিশু মায়ের শরীর থেকে যে প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জন্মায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিরোধক্ষমতা কমতে থাকে। এই গবেষণা রাজধানীর কমলাপুরে ২০০ মা ও ২০০ শিশুর ওপর হয়েছিল।

গবেষণাটিতে দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় ৮৫ শতাংশ মায়ের রক্তে হামের অ্যান্টিবডি থাকে। জন্মের পর প্রথম এক মাসের সময় ৬০ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি থাকে। তবে মায়ের শরীর থেকে আসা অ্যান্টিবডি দ্রুতই তা কমতে থাকে। শিশুর ছয় মাস বয়সে হামের কোনো অ্যান্টিবডি থাকে না। ৯ মাসে তো থাকেই না।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছয় মাস বয়সে হামের টিকা দিলে তা ভালো কাজ করে না। ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়, বয়স আরও একটু বেশি হলে আরও ভালো।

গবেষকেরা কিছু সুপারিশ করেছেন, এর মধ্যে আছে শিশুদের জন্য টিকা নিশ্চিত করতে হবে, কার্যকর টিকাদান কৌশল গড়ে তুলতে হবে, চিকিৎসা ও রোগতাত্ত্বিক গবেষণা বাড়াতে হবে এবং গবেষণা ফলাফলকে হাম নির্মূলের কাজে লাগাতে হবে।

এই অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. রিয়াজ মোবারক। গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন শেষে বৈজ্ঞানিক আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মো. মনির হোসেন, প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক মো. মাহবুবুল হক ও শিশু বিভাগের অধ্যাপক মো. আতিকুল ইসলাম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) মো. নুরুল ইসলাম ও আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান এ কে এম আজিজুল হক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গতকাল বিজ্ঞপ্তিতে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা হলো ৮২৩। এ ছাড়া এ বছর হাম শনাক্ত হয়েছে এমন ৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলে হামে মৃত্যু হয়েছে ৯২২ জনের।

মৃত্যুর তথ্যের পাশাপাশি হামে আক্রান্তের খবরও দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৩১ জন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিল। এ নিয়ে এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১১ জনকে।

অন্যদিকে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সরকারি ল্যাবরেটরি ৮৭ জনের নমুনায় হাম শনাক্ত করেছে। সেই হিসাবে গতকাল পর্যন্ত দেশে ১৮ হাজার ৭৬ জন নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। গতকাল সারা দেশে তিন হাজারের বেশি হামের রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ