শাহজাদপুর সংবাদ

হাউসে কাউসার কী ও কেমন

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM

হাউসে কাউসার কী ও কেমন

কেয়ামতের বিভীষিকাময় প্রান্তর। চারদিকে তীব্র উত্তাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা ও অন্তহীন অস্থিরতায় মানুষের কণ্ঠনালি শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসবে। পিপাসায় কাতর মানবজাতি যখন একটু শীতল পানির জন্য ব্যাকুল থাকবে, তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীজির উম্মতের জন্য অপেক্ষা করবে এক অনন্য নেয়ামত—হাউসে কাউসার।

এটি কোনো অলীক কল্পনা নয়; বরং পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে এর বিশদ বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে।

কাউসার কী

মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুলকে সম্বোধন করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ১)

আরবি ‘কাউসার’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রভূত কল্যাণ ও অফুরন্ত অনুগ্রহ। তবে পারিভাষিক ও ধর্মীয় বিবরণে কাউসার মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়—বেহেশতের একটি বিশেষ নদী এবং কেয়ামতের ময়দানে অবস্থিত একটি সুবিশাল পানির জলাধার বা হাউস।

মহানবী (সা.) মিরাজের রাতে সেই নদীর প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমি বেহেশতে বিচরণ করছিলাম। হঠাৎ একটি নদী চোখে পড়ল, যার দুই তীরে ছিল ফাঁপা মুক্তার তৈরি অসংখ্য গম্বুজ। আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, “জিবরাইল, এটি কী?” তিনি বললেন, “এটি কাউসার, আপনার প্রতিপালক যা আপনাকে দান করেছেন।” এর মাটি—অথবা এর সুবাস ছিল উৎকৃষ্ট কস্তুরির মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৮১)

মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরদের ঐকমত্য অনুযায়ী, বেহেশতের মূল ‘কাউসার’ নদী থেকেই দুটি বিশেষ নলের মাধ্যমে কিয়ামতের ময়দানে স্থাপিত নবীজির হাউসে অবিরাম পানি প্রবাহিত হবে। এ বিষয়ে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি উল্লেখ করেছেন, বেহেশতের মূল নদীটির নাম কাউসার এবং হাশরের মাঠে উম্মতের জন্য স্থাপিত সংরক্ষিত জলাশয়টির নাম হাউস; বেহেশতের নদী থেকেই পানি এসে এই হাউসে পতিত হবে। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি, ১১/৪৬৬, দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হি.)

যেমন হবে হাউজে কাউসার

হাদিসে হাউসে কাউসারের রূপ, বিস্তৃতি ও পানির বৈশিষ্ট্যের অপূর্ব বর্ণনা এসেছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমার হাউসের বিস্তৃতি এক মাসের পথের দূরত্বের সমান। এর চার কোণ সমান। এর পানি রুপার চেয়েও শুভ্র এবং এর সুবাস কস্তুরির চেয়েও সুমিষ্ট। এর পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির মতো অসংখ্য। যে ব্যক্তি সেখান থেকে একবার পানি পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৯২)

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫৪২)

পার্থিব পানি মানুষের শারীরিক তৃষ্ণা নিবারণ করে সাময়িকভাবে; কিন্তু হাউসে কাউসারের স্নিগ্ধ ও সুমধুর পানি পান করার পর বেহেশতে প্রবেশের আগপর্যন্ত আর কখনোই পিপাসা স্পর্শ করবে না।

ইমাম কুরতুবি লিখেছেন, কেয়ামতের ময়দানে হিসাব-নিকাশ ও পুলসিরাত পার হওয়ার আগেই এই হাউসের অবতরণ ঘটবে, যাতে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় উম্মতে মুহাম্মদি সেখান থেকে পানি পান করে অন্তহীন শান্তি লাভ করতে পারে। (মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-কুরতুবি, আত-তাজকিরাহ বি-আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরাহ, পৃষ্ঠা: ৩৩২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৪)

উম্মতের প্রতীক্ষায় নবীজি

কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে মহানবী (সা.) নিজেই হাউসের কিনারায় দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার্ত উম্মতকে পানি পান করানোর জন্য অপেক্ষা করবেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি হাউসের কিনারায় তোমাদের আগেই পৌঁছে অপেক্ষা করব। যে ব্যক্তি আমার কাছে আসবে, সে হাউসের পানি পান করবে। আর যে একবার তা পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৮৩)

যাঁকে পার্থিব জীবনে চর্মচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, শুধু নিখাদ ইমানের দাবিতে যাঁকে ভালোবেসে পথচলা—সেই নবীজির পবিত্র হাত মোবারক থেকে পানি পান করার মুহূর্তটি যে কত পরম আনন্দের, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

কাউসার থেকে বঞ্চিত হওয়ার সতর্কবার্তা

এই পরম প্রাপ্তির সংবাদের পাশাপাশি হাদিসে এসেছে এক কঠোর সতর্কবার্তা। কিয়ামতের দিন কিছু মানুষকে হাউসে কাউসারের নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

নবীজি (সা.) সেই দুঃখজনক দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক আমার কাছে এগিয়ে আসবে। আমি যখন তাদের পানি পান করানোর জন্য হাত বাড়াব, তখনই আমার ও তাদের মাঝখান থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। আমি বলব, “হে আমার প্রতিপালক, এরা তো আমারই উম্মত!” তখন বলা হবে, “আপনি জানেন না, আপনার বিদায়ের পর তারা আপনার ধর্মের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করেছিল।”’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৯৩)

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি উল্লেখ করেছেন, যারা নবীজির সুন্নাহ পরিত্যাগ করে ধর্মের মৌলিক আদর্শে বিকৃতি (বিদআত) ঘটিয়েছিল, মুনাফিকিতে লিপ্ত ছিল কিংবা ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, তাদেরই ফেরেশতারা হাউসের কিনারা থেকে কঠোরভাবে তাড়িয়ে দেবেন। (আন-নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ, ৩/১৩৬-১৩৭, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)

অতএব, হাউসে কাউসারের পানি পানের সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে সুন্নাহর অনুসারী হওয়া এবং যাবতীয় মনগড়া মতবাদ ও বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।

কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির ডাক

কাউসারের মহা অনুগ্রহের ঘোষণা দেওয়ার পরই মহান আল্লাহ এর শোকরিয়া আদায়ের পথ বাতলে দিয়েছেন, ‘অতএব, আপনি আপনার রবের উদ্দেশে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ২)

পরকালের অনন্য এই প্রাপ্তির আশা শুধু মুখের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না; বরং পার্থিব জীবনে নিষ্ঠার সঙ্গে নামাজ আদায়, ত্যাগ স্বীকার ও আমল সংশোধনের মাধ্যমেই সেই পথ প্রশস্ত হয়।

আজ আমরা নিজেদের জীবনকে যেভাবে গড়ে তুলব, পরকালে তারই প্রতিফল হিসেবে মিলবে হাউসে কাউসারের তীরে দাঁড়ানোর এবং প্রিয় নবীজির হাত থেকে চিরতৃপ্তির পানি পান করার অনন্য সৌভাগ্য।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ