খলিফা ওমরের যুগে পারস্য বিজয়ের কাহিনি
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৩:২৯ PM

সুপ্রাচীনকাল থেকে বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চ শাসন করে আসছিল দুই মহাশক্তি—রোমান বাইজেন্টাইন ও পারস্যের সাসানিয়া সাম্রাজ্য। এর মধ্যে আধুনিক ইরান, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত সাসানীয় সাম্রাজ্য ছিল চার শতাব্দীর এক অপরাজেয় সামরিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তি।
পারস্য সাম্রাজ্যের এই ঐতিহাসিক পতন ছিল এক দীর্ঘ সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের পরিণতি। খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল—প্রথমটি ইরাকের মাটিতে সংঘটিত ‘কাদিসিয়ার যুদ্ধ’; আর দ্বিতীয়টি ইরানের পাহাড়ি প্রান্তরের ‘নাহাওয়ান্দ’।
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সময় শুরু হওয়া ইরাক অভিযানের ধারাবাহিকতায় মুসলিমরা যখন মেসোপটেমিয়ার উর্বর সমভূমিতে একের পর এক বিজয় অর্জন করতে শুরু করেন, তখন সাসানিয়া রাজদরবার বুঝতে পেরেছিল যে এটি কোনো সাধারণ সীমান্ত সংঘর্ষ নয়।
অস্তিত্বের সংকট আঁচ করতে পেরে পারস্যের তরুণ সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রবীণ ও ঝানু সেনাপতি রুস্তমের নেতৃত্বে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার সৈন্যের এক সুবিশাল ও আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী ময়দানে নামান।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে খলিফা ওমর (রা.) মদিনা থেকে দিকনির্দেশনা দিয়ে সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করেন নবীজির মামা ও বিশিষ্ট সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের ওপর।
হিজরি ১৬ সনে ইরাকের কাদিসিয়া নামক স্থানে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের আগে রক্তপাত এড়াতে মুসলিমদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়ে পারস্য সেনাপতির সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সেই কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে সাধারণ পোশাকে সজ্জিত সাহাবি রিবয়ি ইবনে আমির (রা.) পারস্যের রত্নখচিত রাজকীয় তাঁবুতে প্রবেশ করেন। রুস্তম যখন আরবের মতো এক অনগ্রসর জাতির অভিযানের কারণ জানতে চাইলেন, তখন রিবয়ি বিন আমির অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল।
তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহই আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনতে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে পরকালের প্রশস্ততার দিকে আহ্বান জানাতে এবং প্রচলিত ধর্মগুলোর শোষণ ও অবিচার থেকে ইসলামের ন্যায়বিচারের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিতে।” (তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৩/৫২০, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭)
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পারসিকরা অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে চাইল। ফলে শুরু হলো রক্তক্ষয়ী কাদিসিয়ার যুদ্ধ। যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে পারস্যের প্রশিক্ষিত হাতির বহর মুসলিম ঘোড়াগুলো আতঙ্কিত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল।
হাতির পিঠে থাকা তীরন্দাজদের বাণে বহু মুসলিম যোদ্ধা আহত হন। কিন্তু মুসলিমরা দ্রুত রণকৌশল পাল্টে ফেলেন; তাঁরা বল্লম ও তির দিয়ে হাতির চোখ ও শুঁড়কে লক্ষ্যবস্তু বানান। এতে আহত হাতিগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে পেছন ফিরে নিজেদের পারস্য সৈন্যদেরই পদতলে পিষ্ট করতে শুরু করে।
টানা চার দিনব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শেষ রাতটি ইতিহাসে ‘লাইলাতুল হারির’ বা ক্রন্দনের রাত হিসেবে পরিচিত। সেই রাতে অন্ধকারে ঢাল ও তরবারির ঝনঝনানি আর যোদ্ধাদের চিৎকার ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৪৩–৪৫, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
ভোরের আলো ফুটতেই সেনাপতি রুস্তম মুসলিম সেনাদের হাতে নিহত হন। প্রধান সেনাপতির মৃত্যুতে পারস্য বাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
৩০ হাজারের বেশি পারসিক সৈন্য নিহত হয়। অন্যদিকে সাড়ে আট হাজার মুসলিম যোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেন। প্রাথমিক যুগের ইসলামি ইতিহাসে এটিই ছিল মুসলিমদের পক্ষে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।
কাদিসিয়ার বিজয়ের মাধ্যমে পারস্য সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ও তৎকালীন রাজনৈতিক রাজধানী ‘আল-মাদায়েন’ (বর্তমান ইরাকের তিসফুন)-এর পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যায়। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) টাইগ্রিস নদী পার হয়ে মাদায়েন অবরোধ করেন। পারসিকরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়।
মাদায়েনের বুকে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত রাজপ্রাসাদ ‘আইওয়ানে কিসরা’ (হোয়াইট প্যালেস) দখল করেন মুসলিমরা। সাদ (রা.) বিজয়ী বেশে প্রবেশ করে পবিত্র কোরআন থেকে পাঠ করেন, “তারা পেছনে ফেলে গিয়েছিল কত উদ্যান ও প্রস্রবণ, কত শস্যক্ষেত ও সুরম্য বাসস্থান, এবং কত সুখের সামগ্রী যাতে তারা আনন্দ উপভোগ করত।” (সুরা দুখান, আয়াত: ২৫–২৭)
মাদায়েনের পতনের মধ্য দিয়ে পারস্যের কেন্দ্রীয় শাসনের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ রাজধানী ছেড়ে প্রাণভয়ে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে যাযাবরের মতো ছুটতে থাকেন। প্রথমে হুলওয়ান, তারপর রায়, সেখান থেকে ইসফাহান, এরপর কিরমান এবং অবশেষে দূরবর্তী খোরাসানে পালিয়ে আশ্রয় নেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬৫, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
জলুলা ও তুসতারের মতো কৌশলগত শহরগুলোর পতনের পর পারস্যের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
খোরাসানের সীমান্তে বসেও ইয়াজদেগার্দ আশা ছাড়েননি। তিনি সমগ্র পারস্যের গোত্রপ্রধানদের কাছে দূত পাঠিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত মহাযুদ্ধের ডাক দেন। হিজরি ২১ সনে ইরানের পাহাড়ি জনপদ ‘নাহাওয়ান্দ’-এ প্রায় দেড় লাখ পারসিক সৈন্যের এক বিশাল সমাবেশ ঘটে।
খলিফা ওমর মদিনায় জরুরি শুরার বৈঠক ডাকেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় এই মহাযুদ্ধের সেনাপতি হবেন অভিজ্ঞ সমরনায়ক নুমান ইবনে মুকররিন আল-মুজানি (রা.)। নাহাওয়ান্দে পৌঁছে মুসলিমরা দেখেন, পারসিকরা পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে পরিখা খনন করে এবং মাটিতে ধারালো লোহার কাঁটা বিছিয়ে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থানে অবস্থান নিয়েছে।
মুসলিমরা এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল গ্রহণ করেন। সাহাবি তালহা বিন খুওয়াইলিদের বুদ্ধিতে মুসলিম অগ্রবর্তী দল কিছুটা আক্রমণ চালিয়ে পিছু হটার ভান করে। পারসিকরা মুসলিমদের দুর্বল ভেবে পরিখা ছেড়ে উন্মুক্ত পাহাড়ি উপত্যকায় তাড়া করতে বেরিয়ে আসে।
যুদ্ধ শুরুর ঠিক প্রাক্কালে সেনাপতি নুমান ইবনে মুকররিন প্রার্থনায় বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমাকে এমন এক শাহাদাত দান করুন যা মুসলিমদের বিজয়ের পথ উন্মুক্ত করবে!”
তুমুল সংঘাতের একপর্যায়ে নুমান শহীদ হন। এই সংবাদ গোপন রেখে হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। (ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ২/৫৭৫–৫৭৭, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ২০১২)
এই পরাজয়ের পর পারস্যের পক্ষে আর কোনো কেন্দ্রীয় সৈন্যবাহিনী গঠন করা সম্ভব হয়নি। মুসলিম ঐতিহাসিকেরা নাহাওয়ান্দকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ফাতহুল ফুতুহ’ বা ‘বিজয়ের মহাবিজয়’ হিসেবে।
বিজয়ের বার্তা যখন মদিনায় পৌঁছাল, খলিফা ওমর (রা.) স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ঠিকই, কিন্তু সেনাপতি নুমানের শাহাদাতের খবর শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন। সংবাদবাহক যখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনিন, নুমানের পাশাপাশি এমন বহু সাধারণ মুসলিম শহীদ হয়েছেন যাঁদের আপনি চেনেন না।’
খলিফা ওমর চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, “তাঁরা হয়তো দুনিয়ার চোখে সাধারণ মানুষ ছিলেন; কিন্তু যিনি তাঁদের শাহাদাত দিয়ে সম্মানিত করেছেন, সেই আল্লাহ তাঁদের চেহারা ও পরিচয় সবই জানেন; ওমরের তাঁদের চেনার তো কোনো প্রয়োজন নেই!” (আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি, সিরাতু আমিরিল মুমিনিন উমার ইবনুল খাত্তাব: শখসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু, ২/১৯৮, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ২০০৩)
নাহাওয়ান্দের পর একে একে হামাদান, ইসফাহান ও আজারবাইজান মুসলিমদের অধীনে চলে আসে। বছর কয়েকের মাথায় খোরাসানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় আততায়ীর হাতে সম্রাট ইয়াজদেগার্দ নিহত হলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয় সাসানিয়া সাম্রাজ্য।
সূত্র: প্রথম আলো
