শাহজাদপুর সংবাদ

সুরা কাহাফ থেকে বন্ধুর পথে অবিচলতার শিক্ষা

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৫:০০ PM

সুরা কাহাফ থেকে বন্ধুর পথে অবিচলতার শিক্ষা

বাঁচার কোনো প্রত্যক্ষ দৃশ্যমান পথ যখন খোলা থাকে না, তখন মানুষের সামনে শুধু একটিই ক্ষীণ অবলম্বন অবশিষ্ট থাকে—নিজের বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে পরম করুণাময়ের এক অদৃশ্য রহমতের আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেওয়া।

ঠিক যেমনটি ঘটেছিল সুদূর অতীতে কয়েক ইমানদার যুবকের জীবনে; পার্থিব নিরাপত্তার কোনো সাজসরঞ্জাম ছাড়াই যাঁদের একমাত্র আশ্রয় হয়েছিল একটি অন্ধকার পাহাড়ের গুহা।

কোরআনের চিরন্তন উপাখ্যান ‘আসহাবে কাহাফ’ মানবজাতির প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তের এক শাশ্বত মনস্তাত্ত্বিক পাঠ—কীভাবে নিরেট তাওয়াক্কুল ও অবিচলতা প্রতিকূলতম পরিস্থিতিকেও স্বর্গীয় শান্তিতে রূপান্তর করতে পারে।

পার্থিব অনিশ্চয়তায় রহমতের আশ্রয়

সুরা কাহাফের সেই তরুণদের ঘটনাটি শুরু হয়েছিল অত্যাচারী বাদশাহ থেকে নিজেদের ইমান রক্ষার তাগিদে। এই যুবকরা নিজেদের রাজকীয় বৈভবের মোহ ত্যাগ করে গুহার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

কোরআনে তাঁদের কথোপকথন বিধৃত হয়েছে এভাবে, “আর যখন তোমরা তাদের থেকে এবং তারা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য তাঁর রহমত প্রশস্ত করে দেবেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকে ফলপ্রসূ ও সহজসাধ্য করে দেবেন।” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১৬)

বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে অপরিণামদর্শিতা ভাবা যায়। পেছনে লেগে আছে সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী, সেখানে কোনো খাদ্য, আত্মরক্ষা বা পালানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া একটি অন্ধকার ও ভীতিকর গুহায় আশ্রয় নেওয়াকে সাধারণ যুক্তি দিয়ে মেলানো যায় না।

কিন্তু বিশ্বাসের মানদণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। যখন কোনো বান্দা একমাত্র আল্লাহর জন্য পার্থিব মোহ ত্যাগ করে, তখন অন্ধকার গহ্বরও প্রাসাদে পরিণত হয়।

অলৌকিক সুরক্ষা

গুহায় প্রবেশের পর আল্লাহ-তাআলা তাঁদের ওপর অবিশ্বাস্য সুরক্ষা বিধান করেছিলেন। তাঁদের ওপর নেমে আসে গভীর, শতাব্দীকালব্যাপী ঘুম। শুধু তাই নয়, তাঁদের পাহারাদার হিসেবে গুহামুখে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের অনুগত কুকুরকে।

পবিত্র কোরআনে সেই দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ-তাআলা বলেন, “যদি তুমি তাদের দিকে উঁকি দিয়ে দেখতে, তবে নিশ্চিতভাবেই তাদের কাছ থেকে পিছু হটে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে তোমার অন্তর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ত।” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১৮)

সাধারণ ঘুমন্ত মানুষের দৃশ্য কখনো ভয় বা ত্রাস তৈরি করে না। ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ-তাআলা সেই যুবকদের চোখের পলক এবং অবয়বের ওপর এমন এক অপ্রতিরোধ্য গাম্ভীর্য ও অলৌকিক ভীতির আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তৎকালীন শিকারি বা পর্যটকদের কেউ তাদের ধারেকাছে যাওয়ার সাহস না পায়। (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, দারু তাইয়িবাহ, ৫/১৩৮)

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো জীববিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়মের স্থবিরতা। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় (৩০০ সৌর বছর বা ৩০৯ চান্দ্র বছর) তাঁরা কোনো খাদ্য গ্রহণ ছাড়া শুয়ে থাকলেন; অথচ তাঁদের দেহের টিস্যু, ত্বক বা পেশিতে কোনো পচন বা রূপান্তর ঘটেনি।

রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করতে আল্লাহ তাঁদের ডান ও বাম পাশে পাশ পরিবর্তন করিয়ে দিয়েছিলেন। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১৮)

প্রকৃতির সকল নিয়ম স্থগিত হয়ে গিয়েছিল শুধু রবের ওপর নির্ভরশীল কয়েক যুবকের জীবনের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য।

অবান্তর বিতর্ক ও কোরআনের প্রজ্ঞা

কোরআনের যে কোনো কাহিনির মূল উদ্দেশ্য হলো তার আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও হেদায়েত গ্রহণ করা। কিন্তু কিছু মানুষ মূল শিক্ষা ভুলে অপ্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে তর্কে মেতে ওঠা।

গুহাবাসীদের ক্ষেত্রেও ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা তাঁদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে নিরর্থক বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়েছিল। কোরআন তাদের এই প্রবৃত্তি উল্লেখ করে বলেছে, “তারা বলবে, তারা ছিল তিনজন এবং চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর; কেউ বলবে, তারা ছিল পাঁচজন এবং ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর—অদৃশ্যের বিষয়ে শুধু অনুমানের ভিত্তিতে; আবার কেউ বলবে, তারা ছিল সাতজন এবং অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলুন, আমার রবই তাদের সঠিক সংখ্যা সর্বাধিক জানেন; শুধু অল্প কয়েকজন ছাড়া তাদের সংখ্যা কেউ জানে না। সুতরাং স্পষ্ট দলিলের বাইরে তাদের বিষয়ে কোনো বিতর্কে লিপ্ত হবেন না।” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ২২)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলো, যে জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের আকিদা বা আমলের কোনো কল্যাণ জড়িত নেই, তার পেছনে সময় ও মেধা অপচয় করা বুদ্ধিমত্তার কাজ নয় (আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, ১০/৩৮১)

বন্ধুর পথে অবিচলতা

সমাজ যখন অনৈতিকতা, দুর্নীতি ও লাগামহীন ভোগবাদে নিমজ্জিত থাকে, তখন সত্যের ওপর অবিচল থাকা যেন হাতের তালুতে জ্বলন্ত অঙ্গার ধরে রাখার মতো কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে মুমিনেরও প্রয়োজন হয় এক আত্মিক ‘কাহাফ’ বা গুহার।

এই ‘গুহা’ হলো আল্লাহর সান্নিধ্য, একাকী তার কাছে চোখের পানি ফেলা এবং যাবতীয় অনাচার থেকে নিজের চরিত্রকে হেফাজত করার আত্মিক দুর্গ।

মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, “প্রতি জুমার দিন যে ব্যক্তি সুরা কাহাফ পাছ করবে, দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য এক বিশেষ নুর প্রজ্জ্বলিত থাকবে।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১০৭৯০)

আসহাবে কাহাফের ঘটনা আমাদের শেখায়, যখন পার্থিব সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন শুধু আল্লাহর দরজাই উন্মুক্ত থাকে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ