শাহজাদপুর সংবাদ

ভ্রমণের ধর্মীয় আদবকেতা

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৫:০০ PM

ভ্রমণের ধর্মীয় আদবকেতা

ইসলামি জীবনদর্শনে প্রতিটি পদক্ষেপই সেখানে মহান আল্লাহর আনুগত্য ও স্মরণে আবদ্ধ। মুহাম্মদ (সা.) সফরকে চিহ্নিত করেছেন ‘আজাবের একটি অংশ’ হিসেবে। কারণ এতে ব্যক্তির স্বাভাবিক আহার, নিদ্রা ও স্বস্তিতে বিঘ্ন ঘটে এবং প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়।

এই ঝুঁকি ও প্রতিকূলতা জয় করে কীভাবে একটি সাধারণ যাত্রাকে বরকতময়, নিরাপদ ও মহা সওয়াবের ইবাদতে রূপান্তর করা যায়, নবীজি নিজের সুন্নতের মাধ্যমে তার রূপরেখা দিয়ে গেছেন।

১. যাত্রার পূর্বে দুই রাকাত নফল নামাজ

সফরে বের হওয়ার পূর্বেই মানুষের পার্থিব ও ধর্মীয় দায়দায়িত্বগুলো পরিচ্ছন্ন করে নেওয়া উচিত। কারো ঋণ পাওনা থাকলে তা পরিশোধ করা কিংবা অসিয়ত লিখে যাওয়া, পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ভরণপোষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পিতামাতা বা আপনজনদের কাছ থেকে সন্তুষ্টচিত্তে বিদায় নেওয়া সুন্নত।

ঘর থেকে বের হওয়ার পূর্বমুহূর্তে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। অনেক আলেমের মতে, এই নামাজের প্রথম রাকাতে সুরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পাঠ করা উত্তম।

সালাম ফেরানোর পর আয়াতুল কুরসি, সুরা কুরাইশ, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে আল্লাহর দরবারে সফরের নির্বিঘ্নতা ও নিজের যাবতীয় প্রয়োজনের জন্য কায়মনোবাক্যে দোয়া করা বাঞ্ছনীয়। (ওয়াহবা জুহাইলি, আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ২/১৩৮০–১৩৮২)

২. ঘর থেকে বের হওয়ার পূর্বে দোয়া

বাসা থেকে পা বাড়ানোর মুহূর্তেই একজন মুমিন সমস্ত অহমিকা ত্যাগ করে পরম স্রষ্টার জিম্মাদারিতে নিজেকে সঁপে দেয়। মহানবী (সা.) যখনই ঘর থেকে বের হতেন, আকাশের দিকে দৃষ্টি তুলে এই দোয়া পাঠ করতেন:

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা আন আদিল্লা আও উদাল্লা, আও আযিল্লা আও উযাল্লা, আও আজলিমা আও উজলামা, আও আজহালা আও ইউঝহালা আলাইয়া।”

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন আমি নিজে পথভ্রষ্ট না হই কিংবা অন্য কারো দ্বারা বিভ্রান্ত না হই; আমি যেন লাঞ্ছিত না হই বা অন্য কাউকে লাঞ্ছিত না করি; আমি যেন কারো ওপর জুলুম না করি কিংবা নিজে কারো জুলুমের শিকার না হই; এবং আমি যেন অজ্ঞতাসুলভ আচরণ না করি কিংবা কারো মূর্খতার পাত্র না হই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৪)

ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বললে ফেরেশতারা ঘোষণা করেন, ‘তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তুমি নিরাপত্তা লাভ করলে এবং শয়তান তোমার পথ থেকে দূরে সরে গেল।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৫)

৩. বাহনে আরোহণের সময় দোয়া

আধুনিক উড়োজাহাজ, দূরপাল্লার ট্রেন, বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি—যেকোনো বাহনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উচিত করুণাময় আল্লাহর শোকর আদায় করা।

মহানবী (সা.) যখন সফরে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের উটের পিঠে আরোহণ করতেন, তখন তিনবার তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলতেন; অতঃপর পবিত্র কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতেন:

উচ্চারণ: “সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাযা ওয়ামা কুন্না লাহু মুকরিনীন, ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনক্বালিবূন।”

অর্থ: পরম পবিত্র ও মহিমান্বিত সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত ও অনুগত করে দিয়েছেন; অথচ আমরা একে নিজের ক্ষমতায় বশে আনতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবের দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ১৩–১৪)

আয়াতটি পড়ার পর নবীজি (সা.) দোয়া পাঠ করতেন:

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফী সাফারিনা হাযাল বিররা ওয়াত তাক্বওয়া, ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওয়িন আলাইনা সাফারানা হাযা ওয়াতওয়ি আন্না বু‘দাহ। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফার, ওয়াল খালিফাতু ফিল আহলি ওয়াল মাল। আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন ওয়া‘সা-ইস সাফার, ওয়া কাআবাতিল মানযার, ওয়া সূ-ইল মুনক্বালাবি ফিল মালি ওয়াল আহল।”

অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের এই সফরে আমরা আপনার কাছে পুণ্য, তাকওয়া এবং এমন কর্মের প্রার্থনা করছি যা আপনাকে সন্তুষ্ট করে। হে আল্লাহ, আমাদের এই সফরকে সহজ করে দিন এবং এর দূরত্বকে সংকুচিত করে দিন। হে আল্লাহ, আপনিই তো সফরের পরম সঙ্গী এবং আমাদের পেছনে রেখে আসা পরিবার ও সম্পদের একমাত্র অভিভাবক ও রক্ষক। হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় চাই সফরের ক্লান্তি ও কষ্ট থেকে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাদময় দৃশ্য থেকে এবং পরিবার ও ধনসম্পদের মাঝে অশুভ প্রত্যাবর্তন থেকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪২)

৪. যাত্রা শেষে শোকর আদায়

সফর সফলভাবে সম্পন্ন করে ঘরে ফেরার মুহূর্তেও মহানবী (সা.) গাফেল হতেন না। তিনি ফিরে আসার সময় উপরোক্ত দোয়ার সঙ্গে আরও যুক্ত করতেন, ‘আয়িবূনা, তায়িবূনা, আবিদূনা, লিরব্বিনা হামিদূন’ (আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদতকারী এবং আমাদের রবের পরম প্রশংসাকারী)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪২)

ফিরে এসে হঠাৎ গভীর রাতে পরিবারকে চমকে দিয়ে ঘরে প্রবেশ করাকে মহানবী (সা.) অপছন্দ করেছেন। কেননা, তাতে পরিবারের সদস্যরা নিজেকে প্রস্তুত করার সময় পায় না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০১)

এছাড়া মহল্লা বা শহরে ফিরে সর্বপ্রথম নিকটস্থ মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত শুকরিয়া নামাজ আদায় করে ঘরে ফেরা ছিল নবীজির অন্যতম প্রিয় সুন্নত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৩)

৫. উপযুক্ত সঙ্গী নির্বাচন

ইসলামে একা একা দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সফর করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মহানবী (সা.) একাকী সফরকারীকে ‘শয়তানের সঙ্গী’ বলে সতর্ক করেছেন এবং অন্তত দুজন বা ততোধিক ব্যক্তি একসঙ্গে সফরের তাগিদ দিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৭৪)

একাধিক ব্যক্তি একসঙ্গে বের হলে তাদের মধ্য থেকে একজনকে দলনেতা বানিয়ে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৮)

এতে সফরের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা অক্ষুণ্ণ থাকে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ