শাহজাদপুর সংবাদ

যেভাবে বদলে গেল গিফার গোত্রের ভাগ্য

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:১৬ PM

যেভাবে বদলে গেল গিফার গোত্রের ভাগ্য

মক্কায় তখন জাহেলিয়াত। কাবাঘর ঘিরে প্রতিদিন নানা গোত্রের মানুষের আনাগোনা; আর জীবিকার তাগিদে কোরাইশের বাণিজ্য কাফেলা ছুটে যেত সুদূর সিরিয়ার পথে।

মক্কা থেকে সিরিয়াগামী সেই প্রাচীন বাণিজ্যপথেই ছিল রুক্ষ মরুভূমির দুর্ধর্ষ ‘বনু গিফার’ গোত্রের বসতি। আরবে এই গোত্রটির পরিচয় ছিল ভয়ংকর পথদস্যু হিসেবে। কিন্তু সেই গোত্রেই জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক ব্যতিক্রমী মানুষ, যাঁর নাম জুনদুব ইবনে জুনাদাহ।

ইতিহাসের পাতায় বিশ্ব যাঁকে চেনে মহান সাহাবি হজরত আবু জর গিফারি (রা.) নামে।

জাহেলি আরবের অনেক দেব–দেবীর পূজা ও গোত্রীয় অন্ধত্ব আবু জরের বিবেক মেনে নিতে পারেনি। তিনি স্বভাবজাতভাবেই এক অদৃশ্য আল্লাহর ইবাদতের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।

এমনই এক সন্ধিক্ষণে তাঁর কানে এক চমকপ্রদ খবর পৌঁছাল, ‘মক্কায় এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে, যিনি নিজেকে আল্লাহর রাসুল বলে ঘোষণা করেছেন এবং মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকছেন।’

সংবাদটি আবু জরের অন্তরে আলোড়ন তুলল। এত দিন ধরে যে সত্যের সন্ধান তিনি অন্তরে খুঁজে ফিরছিলেন, এ কি তবে তারই হাতছানি? কৌতূহল ও সত্যের পিপাসা নিবারণে তিনি নিজের ভাই উনাইসকে প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধানের জন্য মক্কায় পাঠালেন।

উনাইস ছিলেন দক্ষ কবি ও দূরদর্শী ব্যক্তি। তিনি মক্কায় গিয়ে গোপনে নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, তাঁর বাণী শুনলেন এবং মক্কার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এলেন।

আবু জর ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী দেখে এলে? তাঁর দাওয়াত কেমন?’

উনাইস জবাব দিলেন, ‘দেখে এসেছি—তিনি মানুষকে সৎচরিত্র ও উত্তম কাজের নির্দেশ দেন এবং অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে নিষেধ করেন। আর তিনি এমন এক বাণী পাঠ করেন, যা নিছক কোনো কবিতা নয়।’

কিন্তু ভাইয়ের এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় আবু জরের হৃদয়ের তৃষ্ণা মিটল না। তিনি বললেন, ‘আমি নিজেই মক্কায় যাব!’

সামান্য পাথেয় ও একটি মশকভর্তি পানি নিয়ে আবু জর (রা.) একাকী মক্কার পথে পা বাড়ালেন। অচেনা শহর, অজানা মানুষ। আর যাঁর খোঁজে এসেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে পুরো কোরাইশ সমাজ উন্মত্ত হয়ে আছে। ফলে শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশে কাউকে সরাসরি নবীজির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করা ছিল আত্মঘাতী।

তিনি মসজিদুল হারামের এক কোণে অবস্থান করতে লাগলেন। ক্ষুধাতৃষ্ণা নিবারণের একমাত্র অবলম্বন ছিল জমজমের পানি। হাদিসের বর্ণনানুযায়ী, তিনি একটানা ৩০ দিন পর্যন্ত শুধু জমজমের পানি পান করে সেখানে অবস্থান করেছিলেন; অন্য কোনো খাবার না পেয়েও জমজমের বরকতে তাঁর শারীরিক শক্তি অক্ষুণ্ণ ছিল।

একদিন কাবার প্রাঙ্গণে তরুণ সাহাবি আলী (রা.) তাঁকে দেখে বুঝতে পারলেন—লোকটি ভিনদেশি কোনো মুসাফির। তিনি কোনো প্রশ্ন না করে সম্মানজনক মেহমানদারির উদ্দেশ্যে আবু জরকে নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। পরদিন ও তার পরের দিনও একইভাবে কাটল; মেহমানের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করে কোনো পরিচয় জানতে চাইলেন না।

অবশেষে তৃতীয় দিনে তিনি বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই, আপনার এই শহরে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?’

গোপনীয়তা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে আবু জর বললেন, ‘আমি দূর দেশ থেকে এসেছি এই খবর পেয়ে যে—এখানে এক নবীর আবির্ভাব ঘটেছে। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁর কথা শুনতে চাই।’

আলী (রা.) উজ্জ্বল মুখে ঘোষণা করলেন, ‘তিনি সত্যই আল্লাহর রাসুল। আপনি ঠিক জায়গায় এসেছেন। আগামীকাল সকালে আমি যখন হাঁটব, আপনি দূর থেকে আমাকে অনুসরণ করবেন। আমি যেখানে প্রবেশ করব, আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন।’

পরদিন আলীর পিছু পিছু গিয়ে আবু জর (রা.) পৌঁছে গেলেন নবীজির পবিত্র দরবারে। সত্যের সন্ধানে পথচলা মরুচারী মানুষটি অবশেষে দাঁড়ালেন বিশ্বমানবতার মুক্তির দূতের সামনে।

নবীজি (সা.) তাঁকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও পবিত্র কোরআনের আয়াত পাঠ করে শোনালেন। ওহির সুর আবু জরের অন্তরে প্রবেশ করতেই সব সংশয়ের পর্দা ছিঁড়ে গেল।

তিনি কালবিলম্ব না করে কালেমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করলেন। ইসলামের একেবারে প্রারম্ভিক যুগের চতুর্থ বা পঞ্চম মুসলমান তিনি।

ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল (সা.) মক্কার চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁকে সতর্ক উপদেশ দিলেন, ‘ইমানের কথা এখন গোপন রাখো এবং নিজ গোত্রে ফিরে যাও। যখন আমাদের বিজয়ের সংবাদ পাবে, তখন প্রকাশ্যে চলে এসো।’

কিন্তু আবু জর আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম, আমি কোরাইশ মুশরিকদের নাকের ডগায় গিয়ে কাবার চত্বরে প্রকাশ্যে এই সত্যের ঘোষণা দেব!’

তিনি সোজা কাবার আঙিনায় চলে গেলেন—যেখানে কোরাইশ নেতারা আড্ডায় মগ্ন ছিল। আবু জর (রা.) জলদগম্ভীর কণ্ঠে চিৎকার করে ঘোষণা করলেন, ‘হে কোরাইশ সম্প্রদায়, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল!’

মুহূর্তের মধ্যে পুরো চত্বর ক্ষোভে ফেটে পড়ল। কোরাইশরা চারপাশ থেকে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তাঁকে রক্তাক্ত করে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তে নবীজির চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) দৌড়ে এসে নিজের শরীর দিয়ে আবু জরকে ঢেকে ফেললেন।

তিনি কোরাইশদের ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়েছে? তোমরা কি ভুলে গেছ ইনি বনু গিফারের লোক? সিরিয়াগামী তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর যাতায়াতপথ তো তাদের এলাকার ওপর দিয়েই! তোমরা এই ব্যক্তিকে হত্যা করলে তোমাদের বাণিজ্যের সব পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে!’

বাণিজ্যিক স্বার্থের ভয়ে কোরাইশরা তাঁকে ছেড়ে দিল। কিন্তু আবু জর ছিলেন নির্ভীক। পরদিনও তিনি একইভাবে কাবার বুকে প্রকাশ্যে তাওহিদের ঘোষণা দিলেন, আবারও নির্মম মারধরের শিকার হলেন এবং পুনরায় আব্বাস (রা.) তাঁকে রক্ষা করলেন।

নবীজির নির্দেশ অনুযায়ী আবু জর (রা.) ফিরে গেলেন নিজ গোত্র গিফারে। তিনি প্রথমে নিজের ভাই উনাইসকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। উনাইস তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর তাঁদের মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও একে একে তাওহিদের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন।

গিফার গোত্রের কঠোর হৃদয়ের মানুষেরাও আবু জরের প্রজ্ঞাময় আচরণ ও সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে শুরু করল। নবীজির মদিনায় হিজরতের আগেই গিফার গোত্রের অর্ধেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে! আর বাকি অর্ধেক মদিনায় হিজরতের অপেক্ষা করেন। পরে তারাও মদিনায় এসে মুসলমান হন।

প্রতিবেশী ‘আসলাম’ গোত্রও তাদের দেখাদেখি ইসলাম।

বনু গিফার ও বনু আসলামের এই গণ-ইসলাম গ্রহণের ঐতিহাসিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে রাসুল (সা.) প্রাণভরে দোয়া করে বলেছিলেন, ‘গিফার গোত্র—আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিন; আর আসলাম গোত্র—আল্লাহ তাদের শান্তিতে রাখুন!’

(তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫১৩, ৩৫২২ ও ৩৮৬১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৭৩; ইবনে হাজার আসকালানি, আল-ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবা, ৭/১০৭)

মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ