শাহজাদপুর সংবাদ

হজ বা ওমরাহর সফরে মৃত্যুবরণকারীর মর্যাদা

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:২১ PM

হজ বা ওমরাহর সফরে মৃত্যুবরণকারীর মর্যাদা

আল্লাহর ঘর জিয়ারতের জন্য যাত্রা করা মুমিন-জীবনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। সেই যাত্রায় কারও মৃত্যু হলে তার জন্য রয়েছে বিশেষ সুসংবাদ। আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হজ বা ওমরাহর পথে বেরিয়ে মৃত্যুবরণ করার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপরিসীম সওয়াব এবং আখিরাতের আশাব্যঞ্জক মর্যাদা।

হাদিসে হাজি ও ওমরাহ পালনকারীদের আল্লাহর মেহমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি তাঁদের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর মেহমান তিন শ্রেণির মানুষ, আল্লাহর পথের যোদ্ধা, হজ পালনকারী এবং ওমরাহ পালনকারী।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২৬২৫)

একজন মেহমান যেমন উত্তম আতিথেয়তার আশা করেন, তেমনি আল্লাহর ঘরের জিয়ারতে আসা বান্দাও তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রত্যাশা নিয়ে আসেন।

মানুষ সাধারণত জীবনের অর্জন দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করে। অথচ মুমিনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে আল্লাহর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতার ওপর। কেউ কোনো নেক কাজের সংকল্প করে তা বাস্তবায়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলে, কাজটি সম্পন্ন করার আগে মৃত্যু এসে গেলেও তার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রয়েছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশে হিজরত করে নিজ ঘর থেকে বের হয়, অতঃপর মৃত্যু তাকে পেয়ে বসে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে অবধারিত হয়ে যায়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০০)

আয়াতটি হিজরতকারীর বিষয়ে নাজিল হলেও এর মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো নেক কাজের পথে বের হওয়া ব্যক্তির জন্য প্রতিদানের আশাব্যঞ্জক শিক্ষা রয়েছে।

হজ বা ওমরাহর সফরের মৃত্যু প্রসঙ্গে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনাগুলোর একটি হলো ইহরাম অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির ঘটনা। এতে মৃত্যুর সময় বান্দার ইবাদতরত থাকার যে অনন্য মর্যাদা, তা ফুটে ওঠে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি আরাফার মাঠে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তিনি বাহন থেকে পড়ে মারা যান। তখন নবীজি (সা.) তাঁর গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন।

পাশাপাশি বলেন, তাঁকে সুগন্ধি লাগানো যাবে না এবং তাঁর মাথা ঢেকে দেওয়া যাবে না। এরপর তিনি কারণ জানিয়ে বলেন, কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তি তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৬৫)

এখানে লক্ষণীয়, রাসুল (সা.) ইহরামের বিধান মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সাধারণ মৃতের কাফনের সঙ্গে ইহরামধারীর কিছু নিয়মের পার্থক্য রয়েছে।

এর পেছনে রয়েছে তাঁর ইবাদতের বিশেষ অবস্থা। কিয়ামতের দিন তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় পুনরুত্থিত হওয়ার এই সুসংবাদ তাঁর জন্য নিঃসন্দেহে অনন্য সম্মানের পরিচায়ক।

হজ ও ওমরাহর সফর শুরু করার পর কেউ যদি গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মারা যান, তাহলে তাঁর নেক নিয়তের প্রতিদান সম্পর্কে হাদিসে সুসংবাদ এসেছে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি হজ, ওমরাহ অথবা জিহাদের জন্য বের হয়ে পথে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ-তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য গাজি, হাজি ও ওমরাহ পালনকারীর সওয়াব লিখে দেন।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৪১০০)

আল্লাহ কারও আন্তরিক নেক আমল ও প্রচেষ্টা নষ্ট করেন না। আর চূড়ান্ত প্রতিদান নির্ধারণের মালিক একমাত্র তিনিই।

হজ ও ওমরাহ শুধু পবিত্র স্থানগুলোয় উপস্থিত হওয়ার নাম নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও আনুগত্যের অনুশীলন। ইহরামের সাদা কাপড় মানুষকে দুনিয়ার জৌলুশ ও বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তালবিয়ায় প্রতিধ্বনিত হয় বান্দার আত্মসমর্পণের ঘোষণা।

এ সফরে মৃত্যুবরণকারীর ঘটনা জীবিত মানুষের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে। মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই নেক কাজের ইচ্ছা পোষণ করার পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে হজ বা ওমরার প্রস্তুতি হওয়া উচিত শারীরিক সামর্থ্য, আর্থিক সক্ষমতা, ইবাদতের জ্ঞান এবং আন্তরিক নিয়তের সমন্বয়ে।

দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী; আর আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া।

হজ বা ওমরাহর সফরে মৃত্যুবরণকারীর জন্য ইসলামে যে সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে, তা আমাদের আল্লাহর প্রতি আশা বাড়ায় এবং নেক আমলের পথে অবিচল থাকতে অনুপ্রাণিত করে।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

faizullahriyadh75@gmail.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ