শাহজাদপুর সংবাদ

বিদ্রোহের সময়ে প্রথম খলিফা আবু বকরের ৩ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১:০০ PM

বিদ্রোহের সময়ে প্রথম খলিফা আবু বকরের ৩ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত

ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকরের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনেকের মনেই ধারণা, তিনি অতি কোমল হৃদয়, প্রগাঢ় আবেগ এবং অশ্রুসিক্ত স্বভাবের একজন সাধক মানুষ। তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংকট মুহূর্তের দৃঢ়তাকে প্রায়শই আড়াল করা হয়।

নবীজির ওফাতের পর ইসলামি রাষ্ট্র যখন অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত হয়েছিল, তখন ওমর ইবনুল খাত্তাবের মতো শক্তিশালী সাহাবিও কৌশলগত নমনীয় নীতির পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কিন্তু সেই কঠিন সন্ধিক্ষণে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) অবিচল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনটি সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন; যা শুধু ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিই সুসংহত করেনি; বরং ইসলামের বিধান ও মৌলিক কাঠামোকে রক্ষা করেছিল।

১. ওসামার বাহিনী প্রেরণ

ওফাতের ঠিক কয়েক দিন পূর্বে নবীজি (সা.) ওসামা ইবনে জায়েদের নেতৃত্বে রোমান সীমান্তে পাঠানোর জন্য একটি সেনাদল প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু বাহিনী মদিনার উপকণ্ঠে পৌঁছতেই নবীজির বিদায়ের সংবাদ আসে।

এ সময় সমগ্র আরব উপদ্বীপে বিদ্রোহ ও স্বধর্মত্যাগের (রিদ্দা) আগুন জ্বলে ওঠে। মদিনা যখন চতুর্দিক থেকে বিদ্রোহী ও শত্রুগোত্রগুলোর আক্রমণের আশঙ্কায় মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি, তখন জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের একটি দল নিরাপত্তার স্বার্থে ওসামার অভিযান স্থগিত রাখার কিংবা সেনাদলকে মদিনা রক্ষায় নিয়োজিত রাখার পরামর্শ দেন।

আবু বকর (রা.) সাহাবিদের এই নমনীয় কৌশলগত প্রস্তাব দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে আল্লাহর রাসুল (সা.) যে সেনাদলের পতাকা বেঁধেছেন, তা স্থগিত করার অধিকার তাঁর নেই।

কৌশলগত বিচারে আবু বকরের এই সিদ্ধান্তটি ছিল এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

মদিনা নগরী যখন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংকটে জর্জরিত, তখন এত বিশাল ও সুসজ্জিত সেনাদলকে পারস্য ও রোমান সীমান্তের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে বিদ্রোহী গোত্রগুলো চলে ওঠে।

তারা ভাবতেও পারেনি যে মদিনার কেন্দ্রীয় প্রশাসন এতটা শক্তিশালী ও নির্ভীক হতে পারে। ফলে মদিনা দখলের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয় এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। (আলি মুহাম্মদ আস-সাল্লাবি, আবু বকর আস-সিদ্দিক: সাহাকসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু, ১/১৮৫, মাকতাবাতুস সাহাবাহ, জেদ্দা, ২০০১)

২. জাকাত অস্বীকারকারীদের দমন

নবীজি-পরবর্তী সময়ের ধর্মত্যাগী ও বিদ্রোহীদের মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

ক. পৌত্তলিকতায় প্রত্যাবর্তনকারী: যারা ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় মূর্তিপূজায় ফিরে গিয়েছিল।

খ. ভণ্ড নবীদের অনুসারী: যারা মুসায়লিমা কাজ্জাব ও আসওয়াদ আনাসির মতো ভণ্ড নবীদের আনুগত্য স্বীকার করেছিল।

গ. জাকাত অস্বীকারকারী: যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করত এবং নামাজ আদায় করত, কিন্তু রাষ্ট্রে জাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। তারা সুরা তাওবার ১০৩ নম্বর আয়াতের অসৎ ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেছিল যে জাকাত শুধু নবীজির ব্যক্তিগত অধিকার ছিল।

ওমর (রা.) এবং অনেক শীর্ষ সাহাবি জাকাত অস্বীকারকারীদের সঙ্গে সাময়িক নমনীয় আচরণ এবং তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে সুপথে রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু বকরের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করতে পেরেছিল যে নামাজ ও জাকাত উভয়ই ইসলামের সমমানের দুটি অবিচেছদ্য স্তম্ভ।

নামাজ হলো আল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক, আর জাকাত হলো রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। ইসলামের এই মৌলিক উপাদানে আপস করার অর্থ হলো সদ্য গঠিত রাষ্ট্র ও ধর্মের ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে দেওয়া।

আবু বকর (রা.) সরাসরি যুদ্ধে নামার আগে দূত পাঠিয়ে ইসলামের নীতি ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু তারা অবিচল থাকলে তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, “শপথ খোদার, যে ব্যক্তি নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করবে, আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। কারণ জাকাত হলো সম্পদের ওপর নির্ধারিত হক। শপথ করে বলছি, তারা যদি নবীযুগের একটি রশি বা ছাগলছানাও জাকাত হিসেবে দিয়ে থাকে এবং এখন তা দিতে অস্বীকার করে, তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব।”

এরপর তিনি ১১টি সামরিক পতাকা প্রস্তুত করে অভিজ্ঞ সেনাপতিদের অধীনে সেনাদল পাঠান এবং ফেতনার উৎস উৎখাত করে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/৩১১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৬৬)

৩. কোরআন সংকলনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল ইয়ামামার প্রান্তরে ভণ্ড নবী মুসায়লিমার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধে বহু সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন, যাঁদের মধ্যে প্রায় সাতশত জন ছিলেন হাফেজে কোরআন।

হাফেজ সাহাবিদের এই ব্যাপক শাহাদাতে ওমর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আশঙ্কা করেন যে এভাবে চলতে থাকলে কোরআনের বহু অংশ হাফেজদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে। তিনি খলিফা আবু বকরের কাছে গিয়ে একটি একক গ্রন্থে (মুসহাফ) পুরো কোরআন সংকলন ও সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন।

প্রথমে আবু বকরের মধ্যে চিরাচরিত সতর্কতা দেখা যায়। তিনি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলেন, “যে কাজ নবীজি নিজে করে যাননি, তা আমি কীভাবে করব?” কিন্তু ওমর যখন সার্বজনীন কল্যাণের বিষয়টি বোঝান, তখন আবু বকরের হৃদয়ে সত্য উন্মোচিত হয়।

তিনি তরুণ সাহাবি ও ওহি লেখক জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে দায়িত্ব দেন, যেন তিনি সর্বাত্মক সতর্কতা ও দুই জন সাক্ষীর নীতির ওপর ভিত্তি করে লিখিত ও সংরক্ষিত টুকরোগুলো একত্র করে মুসহাফ সংকলন করেন।

এই সিদ্ধান্তের ফলেই কেয়ামত পর্যন্ত উম্মাহর জন্য পবিত্র কোরআনের অবিকৃত সংস্করণ সংরক্ষিত হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৮৬)

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর সুদৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও ধর্মের মৌলিক নীতির প্রশ্নে নমনীয়তার চেয়ে সুদূরপ্রসারী কঠোরতাই আসল প্রজ্ঞা। তাঁর কৌশল, সময়োচিত সিদ্ধান্ত এবং আপসহীন দূরদর্শিতার মাধ্যমেই মহান আল্লাহ নবীজির ওফাত-পরবর্তী উম্মতকে এক মহাসংকটের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ