শাহজাদপুর সংবাদ

কাবা পুনর্নির্মাণ: মক্কায় এক নতুন নেতৃত্বের আত্মপ্রকাশ

১২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৬:২৬ PM

কাবা পুনর্নির্মাণ: মক্কায় এক নতুন নেতৃত্বের আত্মপ্রকাশ

নবুয়তপ্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে, আনুমানিক ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে (১৮ হিজরি পূর্ব), মক্কার কেন্দ্রীয় উপাসনালয় কাবা শরিফ এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর কাঠামোগত দুর্বলতায় জীর্ণ এই প্রাচীন স্থাপনা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিতে গিয়ে কোরাইশ গোত্রগুলোর মধ্যে এমন তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয় যে তা প্রায় সশস্ত্র সংঘাতের দিকে গড়ায়।

মুহাম্মদ (সা.)–এর বয়স তখন ৩৫ বছর, নবুয়ত পাওয়ার ৫ বছর পূর্বের ঘটনা। কাবা নির্মাণ ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তিনি একটি সহজ অথচ বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দেন; যা সেই রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করে। আর এই ঘটনাই তাঁকে মক্কার সব গোত্রের কাছে এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ইসমাইল (আ.)-এর সময় থেকে কাবার উচ্চতা ছিল মাত্র নয় হাত (প্রায় ৪.৫ মিটার বা ১৩.৫ ফুট), চারপাশের দেয়াল ছিল মর্টার ছাড়া শুকনো পাথরের গাঁথুনি, কোনো ছাদ ছিল না। (আল-আজরাকি, আখবারু মাক্কা, ১/১৫৭, দারুল আন্দালুস, বৈরুত, ১৯৮৩)

পুনর্নির্মাণের কিছুদিন আগে এক কোরাইশ নারীর অসাবধানতায় ধূপের স্ফুলিঙ্গ লেগে কাবার চাদর ও কাঠামোয় আগুন লাগে। এতে দেয়ালের পাথরের ভারবহন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। (ইবনে হিশাম,আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯২, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দুটি সংকট:

বিধ্বংসী পাহাড়ি ঢল: মক্কা নগরী একটি গভীর অববাহিকায় (বাতহা) অবস্থিত। ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে আকস্মিক অতিবৃষ্টির ফলে উত্তর দিকের উচ্চভূমি ‘আল-মালা’ থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল; যাকে বলে সাইলুল জুহাফ। এই ঢল কাবার চত্বরে প্রবেশ করে এবং কাবার দক্ষিণ ও পশ্চিম দেয়ালে গভীর ফাটল ধরিয়ে দেয়। (আল-আজরাকি, আখবারু মাক্কা, ১/১৫৬–১৫৭)

কাবার ধনভাণ্ডার চুরি: কাবার ভেতরে একটি শুকনো অন্ধকূপ ছিল, যাকে বলা হতো ‘বিরু কাবা’। সেখানে কাবার জন্য নিবেদিত স্বর্ণ, মূল্যবান উপহার ও সুগন্ধি সংরক্ষিত থাকত। কাবার ছাদ না থাকায় এবং দেয়াল নিচু হওয়ায় কাবার সেই স্বর্ণভাণ্ডার চুরি যায়।

এসব ঘটনাই কোরাইশদের বাধ্য করেছিল একটি নতুন নকশায় কাবা নির্মাণ করতে; যাতে থাকবে সুরক্ষিত ছাদ এবং বাইরের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে উঁচু দরজা। এর আগে দরজা ছিল মেঝের মাটির সমতলে। (আল-বালাজুরি, আনসাবুল আশরাফ, ১/৯৯, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৫৯)

ভাঙা কাবা নতুন করে গড়ার সিদ্ধান্ত হলেও খোদায়ি অসন্তুষ্টির ভয়ে প্রথমে কেউ হাত দিতে সাহস করেনি। এদিকে কাবার ভেতরে ছিল একটি বিশাল বিষধর সাপ। সাপটি নিয়মিত দেয়ালের পাথরে উঠে ফণা তুলে হিসহিস করত, ফলে কাবার দেয়ালের কাছে কেউ ঘেঁষতে পারত না।

সিরাতের বিবরণে এসেছে, কোরাইশরা যখন পাথর ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন একদিন হঠাৎ আকাশ থেকে একটি বিশাল শিকারি পাখি (ঈগল বা বাজপাখি) ছোঁ মেরে সাপটি নখরে তুলে নিয়ে জাবালে আজইয়াদের দিকে উড়ে যায়।

কোরাইশরা এই দৃশ্য দেখে স্বস্তি পায় এবং একে শুভ লক্ষণ ধরে নিয়ে নির্মাণে এগিয়ে আসে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ৩/১২২, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)

কোরাইশদের শীর্ষ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা নিজ হাতে প্রথম আঘাত করে ভাঙার কাজ শুরু করেন। তারপর এক রাত নিরাপদে পার হওয়ার পর বাকিরাও নিশ্চিন্ত হয়ে কাজে যোগ দেন।

মরু মক্কায় ছাদ নির্মাণের উপযোগী কাঠ বা দক্ষ রাজমিস্ত্রি ছিল না। এ সময় মক্কা থেকে প্রায় ৮০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগরের উপকূলীয় শুআইবা বন্দরে একটি বাইজেন্টাইন বাণিজ্যিক জাহাজ ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়, যাতে শামের কোনো একটি গির্জার জন্য প্রস্তুত করা কাঠ ও মার্বেল ছিল।

কোরাইশ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে গিয়ে সেই কাঠ কিনে মক্কায় আনেন।

জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে একজন বাইজেন্টাইন রোমান স্থপতি ও কাঠমিস্ত্রি ছিলেন, বাকুম নাম। তাঁকে কাবার মূল স্থপতি ও কাঠমিস্ত্রি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনিই প্রথম রোমান ধাঁচে কাঠ ও পাথরের স্তরীভূত গাঁথুনি দিয়ে কাবার ছাদ ও দেয়ালের নকশা প্রস্তুত করেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৪৫, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

নির্মাণ শুরুর আগে বনু মাখজুমের এক প্রবীণ নেতা শর্ত দেন, এই পবিত্র গৃহ নির্মাণে কেবল হালাল উপার্জন ব্যয় করা যাবে—পতিতাবৃত্তি, সুদ বা জুলুমের অর্থ এতে এক দিরহামও প্রবেশ করানো যাবে না। এই নেতা ছিলেন আবু ওয়াহাব ইবনে আমর। কারও মতে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাই এই শর্ত উত্থাপন করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯৩)।

এই কঠোর শর্তের কারণেই তহবিলে ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে কোরাইশরা উত্তর দিকের প্রায় ছয় হাত জায়গা মূল দেয়ালের বাইরে রেখে দেয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)

ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা নিজ হাতে প্রথম কোদাল চালিয়ে ভাঙার কাজ শুরু করেন। গভীর পর্যন্ত খনন করার পর সেখানে উটের কুঁজের মতো পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে খাঁজকাটা সবুজ পাথরের আদি ভিত্তি উন্মোচিত হয়। (আল-আজরাকি, আখবারু মাক্কা, ১/১৬০)

খননকালে কাবার রুকন ও মাকামে ইব্রাহিমের তলদেশ থেকে প্রাচীন পাথরের কয়েকটি ফলক উদ্ধার করা হয়, যাতে প্রাচীন সুরিয়ানি লিপিতে খোদাই করা কিছু ঐতিহাসিক বাণী লিপিবদ্ধ ছিল। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯৫–১৯৬)

কাবার দেয়াল তোলার দায়িত্ব কোরাইশদের চারটি প্রধান গোত্রজোটের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়:

পূর্ব দেয়াল (দরজা সংলগ্ন): বনু আবদে মানাফ ও বনু জুহরাহ।

দক্ষিণ দেয়াল (রুকনে ইয়ামানি ও আসওয়াদ): বনু মাখজুম ও বনু তাইম।

পশ্চিম দেয়াল (পেছনের অংশ): বনু জুমাহ ও বনু সাহম।

উত্তর দেয়াল (হাতিমের অংশ): বনু আসাদ, বনু আবদুদ দার ও বনু আদি।

এই নির্মাণকাজে মুহাম্মদ (সা.) নিজে কাঁধে পাথর বহনের কায়িক শ্রমে অংশ নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮২)

দেয়াল যখন হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের উচ্চতায় পৌঁছায়, তখনই আরবের গোত্রীয় অহমিকার চরম বিস্ফোরণ ঘটে। প্রতিটি গোত্র দাবি করে এই সম্মান একান্তই তাদের প্রাপ্য। উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দুই পক্ষ রক্তপাতের শপথ নেয়।

বনু আবদুদ দার ও বনু আদি ইবনে কাব এই সম্মানের জন্য একটি পাত্রে তাজা রক্ত ভর্তি করে আনে এবং সেই রক্তে হাত চুবিয়ে একে অপরের হাত চাটে। আরবের ইতিহাসে এটি ‘রক্ত চাটার জোট’ নামে পরিচিত। টানা কয়েক দিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে। তরবারি কোষমুক্ত করে গোত্রগুলো পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। (ইবনে হিশাম, আস–সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯৬)

এই সংকটময় মুহূর্তে এক প্রবীণ নেতার প্রস্তাব অনুযায়ী ঠিক হয়, হারাম সীমানার ফটক দিয়ে পরদিন যে ব্যক্তি সবার আগে প্রবেশ করবেন, তিনিই হবেন চূড়ান্ত সালিশ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই প্রবীণ নেতা হলেন আবু উমাইয়া ইবনে মুগিরা আল-মাখজুমি। যার কন্যা হিন্দের সঙ্গে চতুর্থ হিজরিতে নবীজির বিয়ে হয়; যিনি উম্মে সালামা নামে খ্যাত হয়েছিলেন।

পরদিন ভোরে সেই ব্যক্তি হন মুহাম্মদ (সা.), আর তাঁকে দেখামাত্র উপস্থিত নেতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠেন, ‘ইনিই আল-আমিন, তাঁর ফয়সালায় আমরা সন্তুষ্ট।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৫৫০৪)

মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পরনের ইয়েমেনি চাদর বিছিয়ে তার মাঝে হাজরে আসওয়াদ রাখেন, আর প্রতিটি গোত্রজোটের একজন প্রতিনিধিকে চাদরের এক কোণ ধরে একযোগে পাথরটি তুলতে বলেন। চাদর নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে তিনি নিজ হাতে পাথরটি দেয়ালের নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৪৬; ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৬০)

চার কোণ কারা ধরেছিলেন, সে বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন ভিন্ন নাম এসেছে। কোথাও এসেছে চার প্রধান গোত্রজোটের শীর্ষ চার নেতা ছিলেন:

উতবা ইবনে রাবিআহ (বনু আবদে মানাফ ও জুহরাহ জোটের পক্ষে)

আমর ইবনে হিশাম (আবু জাহেল) / ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাহ (বনু মাখজুম ও তাইম জোটের পক্ষে)

হাকিম ইবনে হিজাম (বনু আসাদ ও আবদুদ দার জোটের পক্ষে)

উমাইয়া ইবনে খালাফ / আস ইবনে ওয়ায়েল (বনু সাহম ও জুমাহ জোটের পক্ষে)

আবার কোনো সূত্রে উতবা ইবনে রাবিআহ, আসওয়াদ ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আবু হোজাইফা আর কায়েস ইবনে আদির কথা বলা হয়েছে। উভয় বর্ণনাতেই উতবার নাম দেখা যায়।

প্রাক-ইসলামি আরবে মক্কার রাজনীতি পরিচালিত হতো বিভিন্ন কোরাইশ সামন্তদের একটি অলিখিত পরিষদ ‘আল-মালা’র মাধ্যমে। ফিজার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুলের পর আবদুল মুত্তালিব ও হারব ইবনে উমাইয়ার মতো মক্কার প্রভাবশালী নেতারা মারা গিয়েছিলেন।

প্রভাবশালী প্রবীণ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে তরুণ ও মধ্যবয়সী গোত্রপ্রধানরা—যেমন আবু জাহেল (বনু মাখজুম), উতবা ইবনে রাবিআহ (বনু আবদে শামস), উমাইয়া ইবনে খালাফ (বনু জুমাহ)—ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। কাবা পুনর্নির্মাণে হাজরে আসওয়াদ বসানোর সুযোগটি ছিল মক্কার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার লড়াই।

এই ঘটনার আগ পর্যন্ত মুহাম্মদ (সা.) পরিচিত ছিলেন শুধু বনু হাশিম গোত্রের এক বিশ্বস্ত ও সৎ তরুণ হিসেবে। সর্ব-গোত্রীয় বা সর্ব-মাক্কি আইনি বা রাজনৈতিক এখতিয়ার তাঁর ছিল না। চাদর কূটনীতির মাধ্যমে তিনি বনু মাখজুম, বনু আবদে শামস, বনু আসাদ ও বনু সাহমের মতো পরস্পরবিরোধী পরাশক্তিগুলো একটিমাত্র চাদরের সুতোয় বেঁধে ফেলেন।

সিরাতকারদের ভাষায়, “এর মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা.) কেবল বনু হাশিমের প্রতিনিধি রইলেন না; বরং তিনি সমগ্র মক্কার গোত্রগুলোর যৌথ আস্থাভাজন একমাত্র জাতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন।” (ড. মাহদি রিজকুল্লাহ, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাউইল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৩৪–১৩৫, কেন্দ্রিক গবেষণা প্রকাশনা, রিয়াদ, ১৯৯২)

এভাবে মক্কার রাজনীতিতে নৈতিক চরিত্রই প্রথমবার কোনো সামরিক শক্তি বা সম্পদের দাপট ছাড়াই ক্ষমতার সর্বোচ্চ সালিশি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এটিকে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন ও সফল ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব’র উদাহরণ বলা যায়।

কাবা পুনর্নির্মাণের ঠিক পাঁচ বছর পর (৪০ বছর বয়সে) যখন তিনি নবুয়তের ঘোষণা দেবেন এবং পরবর্তীকালে মদিনা রাষ্ট্র গঠন করবেন—তার মূল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল এই ৩৫ বছর বয়সে।

পুনর্নির্মাণের পর কাবার উচ্চতা নয় হাত থেকে বেড়ে আঠারো হাতে (প্রায় ২৭ ফুট) দাঁড়ায়, প্রথমবারের মতো একটি কাঠের ছাদ বসে, ভেতরের দুটি সারিতে তিনটি করে মোট ছয়টি কাঠের স্তম্ভের ওপর স্থাপিত ছিল এই ছাদ।

পশ্চিম দেয়ালের দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পূর্ব দেয়ালের দরজা মাটির সমতল থেকে প্রায় ২ মিটার (৬ ফুট) উঁচুতে স্থাপন করা হয় যাতে কোরাইশের অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে না পারে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৩৩)

তহবিলে ঘাটতির কারণে কোরাইশরা উত্তর দিকের যে ছয় হাত জায়গা দেয়ালের বাইরে রেখেছিল, তার চারপাশে একটি অর্ধচন্দ্রাকার নিচু দেয়াল তুলে দেয়। এই অংশই আজকের ‘হিজরে ইসমাইল’ বা হাতিম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)

বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রথমবারের মতো একটি কাঠের নালা বসানো হয়, যা পরবর্তীকালে ‘মিজাবুর রাহমাহ’ নামে পরিচিতি পায়। (আল–আজরাকি, আখবারু মাক্কা, ১/১৬৫)

স্থপতি বাকুমের তত্ত্বাবধানে কাবার অভ্যন্তরেও বাইজেন্টাইন ধাঁচের কিছু চিত্রকর্ম আঁকা হয়েছিল বলে সিরাতের উৎসে উল্লেখ আছে। সেখানে ফেরেশতাদের ছবি, বৃক্ষরাজি, হাতে ভাগ্যগণনার তিরসহ নবী ইব্রাহিম, মরিয়ম ও কোলে শিশু ইসা (আ.)-এর ছবি অঙ্কিত ছিল। যা মক্কা বিজয়ের দিন (৮ হিজরি) নবীজির নির্দেশে জমজমের পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুছে ফেলা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৫১)

কাবার এই কোরাইশ সংস্করণ নিয়ে নবীজি আক্ষেপ করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের অনেক পরে তিনি আয়েশা (রা.)-কে কাবা ভেঙে আগের মতো ইব্রাহিমি ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করার কথা বলেছিলেন। নবদীক্ষিত মুসলিমদের হৃদয়ে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কায় জীবদ্দশায় তা করেন নি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)

নবীজির ওফাতের কয়েক দশক পর, ৬৪ হিজরিতে খলিফা আবদুল্লাহ ইবনুজ জুবায়ের এই হাদিসের ভিত্তিতে কাবা ভেঙে ইব্রাহিমি নকশায় পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি হাতিমকে মূল কাবার ভেতরে রাখেন এবং সমতলে দুটি দরজা তৈরি করেন।

কিন্তু ৭৩ হিজরিতে উমাইয়া সেনাপতি হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মক্কা দখল করে খলিফা আবদুল মালিকের নির্দেশে জুবায়েরের নির্মাণ ভেঙে পুনরায় কোরাইশের আদি কাঠামোয় ফিরিয়ে আনেন, যা আজও বহাল আছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৩৩)

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ