মুসলিম সভ্যতায় অতিথি আপ্যায়নের শিষ্টাচার
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:০০ PM

অতিথি সেবাকে ইমানের অংশ এবং মানবীয় মর্যাদার এক অনন্য মাপকাঠি হিসেবে স্থান দিয়েছে ইসলাম। সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপে যে সভ্যতার সূচনা হয়েছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক বর্ণাঢ্য সামাজিক ঐতিহ্যের জন্ম দেয়। (ফিলিপ কে. হিটি, হিস্ট্রি অব দ্য আরবস্, পৃষ্ঠা ৩১২, ম্যাকমিলান অ্যান্ড কোং, লন্ডন, ১৯৬৪)
এই সভ্যতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো মেহমানদারি বা অতিথি আপ্যায়ন। এটি শুধু একটি সামাজিক প্রথা বা লৌকিকতা নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, ইবাদত এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য স্থাপনের সুমহান মাধ্যম। (ইমাম গাজালি, ইহইয়ায়ু উলুমিদ্দিন, ২/৩৪৮, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ২০০৪)
ইসলামে মেহমানদারির গুরুত্ব
ইসলাম ধর্মে অতিথির আগমনকে পরম সৌভাগ্য এবং আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে গণ্য করা হয়। কোরআনে নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর মেহমানদারির চমৎকার একটি ঘটনা উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তিনি অচেনা মেহমানদের (যাঁরা মূলত ফেরেশতা ছিলেন) আপ্যায়নের জন্য দ্রুত নিজ ঘরে গিয়ে একটি তাজা ভুনা বাছুর নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ২৪-২৭)
এটি অতিথির প্রতি আন্তরিক সেবার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.) অতিথি আপ্যায়নকে ইমান ও পরকালের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৫)
ইসলামে মেহমানদারির সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে; প্রথম দিন ও রাত হলো মেহমানের বিশেষ হক বা অধিকার, দ্বিতীয় দিন হলো সাধারণ মেহমানদারি, আর এরপরের দিনগুলো হলো সদকা বা অনুগ্রহ। (ইমাম নববি, সহিহ মুসলিম বি-শারহিন নববি, ১০/৪২, দারুল ইহইয়া আত-তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)
মুসলিম সমাজে আতিথেয়তার বিকাশ
খেলাফত আমল থেকে শুরু করে ওসমানিয়া সাম্রাজ্য, মুঘল আমল এবং আন্দালুসের মুসলিম সমাজে অতিথি আপ্যায়ন শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। তৎকালীন মুসলিম শাসকেরা এবং সাধারণ মানুষ মেহমানদারির জন্য বিশেষ অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। (টমাস আর. আর্নল্ড, দ্য স্প্রেড অব ইসলাম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, পৃষ্ঠা ৮৫, গুড প্রেস, লন্ডন, ১৯১৩)
১. অতিথিশালা: বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো ও ইস্তাম্বুলের মতো প্রধান শহরগুলোতে শাসক ও ওয়াকফ বোর্ডের অর্থায়নে বিশাল সব অতিথিশালা বা সরাইখানা নির্মিত হতো; যাকে বলা হতো দারুল জিয়াফাত।
সেখানে দূরদূরান্ত থেকে আগত পথচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও দরিদ্র মেহমানরা বিনামূল্যে তিনবেলা খাবার এবং থাকার জায়গার ব্যবস্থা পেতেন। (তাকিউদ্দিন মাকরিজি, আল-মাওয়াইজ ওয়াল-ইবার ফি জিকরি খিতাতি ওয়াল-আসার, ২/৪১৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯৮)
ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদহীন এই প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মুসলিম সমাজের সাম্য ও কল্যাণের প্রতীক।
২. সুফি সংস্কৃতির লঙ্গরখানা: সুফি সাধকদের খানকাহ ও দরগাগুলো অতিথি আপ্যায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের জন্য ‘লঙ্গরখানা’ বা উন্মুক্ত ভোজের ব্যবস্থা থাকত। সেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে যে কেউ গিয়ে খাবার গ্রহণ করতে পারত।
এই ধারাবাহিকতা আজও উপমহাদেশেরবিভিন্ন মাঝার ও খানকায় চোখে পড়ে। (আলি ইবনে ওসমান আল-হুজুইরি, কাশফুল মাহজুব, পৃষ্ঠা ১২৫, জিয়া পাবলিকেশন্স, লাহোর, ১৯৮৮)
অতিথি আপ্যায়নের শিষ্টাচার
মুসলিম সভ্যতায় অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট আদব রয়েছে, যা মেজবান ও মেহমান উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। এগুলো সমাজকে শৃঙ্খলিত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাখে। (কাজি আয়াজ, শিফা শরিফ, ১/২১০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০১)
মেজবানের শিষ্টাচার
১. আন্তরিক হাসি: মেহমান ঘরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই হাসিমুখে তাঁকে স্বাগত জানানো এবং বসার জন্য সুন্দর ও আরামদায়ক স্থান নির্বাচন করা।
২. বিলম্ব না করে আপ্যায়ন: অতিথি আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ক্লান্তি দূর করার জন্য পানি এবং সাধ্যমতো খাবার বা নাস্তা পরিবেশন করা। মুঘল ও মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে গোলাপজল ছিটিয়ে এবং সুগন্ধি বা ধূপ জ্বেলে মেহমানকে বরণ করার রেওয়াজ ছিল। (আবুল ফজল, আইন-ই আকবরি, ১/২৭০, এশিয়াটিক সোসাইটি, ক্যালকাটা, ১৮৭৩)
৩. কৃত্রিমতা বর্জন করা: অতিরিক্ত লৌকিকতা বা কৃত্রিম আড়ম্বর দেখিয়ে মেহমানকে বিব্রত না করা। আলী (রা.) বলেন, নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে মেহমানের জন্য অতিরিক্ত কষ্ট করা উচিত নয়; যা ঘরে আছে, তা-ই হাসিমুখে পরিবেশন করা আদর্শ মেজবানের লক্ষণ। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৫০)
৪. শেষ পর্যন্ত সঙ্গ দেওয়া: মেহমান খাবার গ্রহণের সময় মেজবানের উচিত নিজে উপস্থিত থাকা এবং মেহমান যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে খেতে পারেন, সেদিকে খেয়াল রাখা। আর বিদায় দেওয়ার সময় ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া।
মেহমানের শিষ্টাচার
১. সময়ের সঠিক মূল্যায়ন: বিনা নোটিশে বা মেজবানের চরম ব্যস্ততার সময়ে হঠাৎ হাজির হয়ে তাঁদের বিব্রত না করা।
২. মেজবানের সাধ্যের প্রতি সম্মান: মেজবান যা পরিবেশন করেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা এবং অতিরিক্ত কোনো ফরমায়েশ বা আবদার করে তাঁকে লজ্জায় না ফেলা।
৩. অনুমতি নিয়ে প্রস্থান: মেহমানদারি শেষ হওয়ার পর মেজবানের অনুমতি নিয়ে সময়মতো বিদায় নেওয়া, যাতে মেজবানের পারিবারিক গোপনীয়তা বা দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত না ঘটে।
৪. দোয়া করা: যাওয়ার সময় মেজবানের কল্যাণ ও বরকতের জন্য দোয়া করা—এটি ইসলামের অন্যতম সুন্দর শিক্ষা। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৭২)
আধুনিক আতিথেয়তার সংকট
আধুনিক যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় মানুষ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতির যুগে ফ্ল্যাটের দরজা অনেক সময় প্রতিবেশী বা অতিথির জন্য বন্ধ থাকে।
মানুষ এখন অতিথি আপ্যায়নকে একধরনের ঝঞ্ঝাট বা অতিরিক্ত খরচের মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
অথচ ইসলাম আমাদের শেখায় যে অতিথি বরকত নিয়ে আসে এবং ঘরে মেহমান আসার অর্থ হলো রিজিক বৃদ্ধি পাওয়া। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩২৫৫)
ডিজিটাল বা আধুনিকতার এই যুগেও মুসলিম ঐতিহ্যবাহী সমাজগুলো, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে মেহমানদারির সেই পুরোনো উষ্ণতা এখনো টিকে আছে।
তবে শহুরে জীবনেও এই শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনা জরুরি। কর্মব্যস্ততার অজুহাতে আপনজন বা প্রতিবেশীদের এড়িয়ে না গিয়ে ছোট পরিসরে হলেও চা-নাস্তার আয়োজনের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করা সম্ভব।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
বিদ্রোহের সময়ে প্রথম খলিফা আবু বকরের ৩ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১:০০ PM · প্রথম আলো
