শাহজাদপুর সংবাদ

রোজ অব শ্যারনের গল্প 

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৩১ PM

রোজ অব শ্যারনের গল্প 

আট বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছিলাম একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে। জেওলবুক-দো জেলার জেওনজু শহরে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রশাসন (আরডিএ) সদর দপ্তরে ছিল সে আয়োজন। আরডিএ হলো দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা। সেই সুবাদে সেখানকার কৃষি কারিগরি কেন্দ্রটি পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল। সেই কেন্দ্রে প্রবেশের আগেই স্বচ্ছ কাচঘেরা অপূর্ব ছোট্ট একটি উদ্যান চোখে পড়ল। প্রবেশমুখে সারি করে লাগানো অনেকগুলো জবা ফুলের গাছ। পাতা ও ফুল দেখেই জবা মনে হলো; কিন্তু জবার মতো ফুল হলেও সেটির রং বেগুনি। অক্টোবরেও দুপুরের রোদের আঁচে ফোটা ফুলের পাপড়িগুলো কুঁকড়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করতেই সঙ্গের কোরিয়ান গাইড বললেন, ‘তুমি যাকে জবা ভাবছ, এটি তা নয়। এর নাম রোজ অব শ্যারন, কোরিয়ান ভাষায় ওকে আমরা বলি মুগুংহওয়া। মুগুংহওয়া মানে হলো অনন্তকাল বা অক্ষয় প্রাচুর্য। এটি আমাদের জাতীয় ফুল, আমাদের দেশের ইতিহাস ও অদম্য চেতনার এক গভীর প্রতীক হিসেবে আমরা একে মনে করি।’

পরিদর্শন শেষে রাতে হোটেল হিলস্টোনে ফিরে নেট পেতে বসলাম, রোজ অব শ্যারন নামটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্তর্জাল ঘেঁটে সে ফুলের বেশ কিছু কথা জানা গেল। মনে কিছু প্রশ্নও এল, এ ফুলের গাছ কি আমাদের দেশে আছে? জবার মতো ফুল; অথচ নামটা কেন রোজ? জবার প্রজাতিগত নামের সঙ্গেও তো রোজ শব্দটা মেখে আছে। জবার নাম কেন রাখা হলো ‘হিবিসকাস রোজা-সাইনেনসিস’। এটার ফুল জবার মতো, তবে এটি সেই জবার একই প্রজাতিতে কেন পড়ল না? বইপত্র ঘেঁটে রোজ অব শ্যারনের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম পাওয়া গেল Hibiscus syriacus। প্রথম এ গাছ সংগ্রহ করা হয়েছিল সিরিয়ার একটি বাগান থেকে। তাই এর প্রজাতিগত নামের শেষাংশ রাখা হয়েছে ‘সিরিয়াকাস’। রোজ অব শ্যারন নামটি ব্যবহৃত হয় উত্তর আমেরিকায়, কোরিয়ায় এটি কোরীয় জবা নামে পরিচিত, অন্য নাম সিরীয় জবা। জবা ও রোজ অব শ্যারন উভয়ই মালভেসি গোত্রের।

দেশে ফিরে এসে অবশ্য এ দেশের উদ্ভিদের তালিকায় এটির নাম পাওয়া গেল নীল জবা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গ শহরেও সেই ফুলের দেখা পেয়েছিলাম। অষ্টম শতাব্দী থেকে এখনো জাপানি পরিবারগুলোতে এ গাছ বাগানের একটি জনপ্রিয় ফুল গাছ হিসেবে পরিচিত। রোজ অব শ্যারন মূলত কোরিয়ার একটি স্থানীয় উদ্ভিদ। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে লেখা চীনা ভৌগোলিক গ্রন্থ শান হাই জিং-এ উল্লেখ রয়েছে—কোরীয় উপদ্বীপে প্রাচীনকালে বিপুলসংখ্যক রোজ অব শ্যারন গাছ জন্মাত। সেকালে কোরিয়ায় এর পাতা দিয়ে ভেষজ পানীয় তৈরি করা হতো এবং এর ফুল খাওয়া হতো। অষ্টম শতাব্দীতে এটি জাপানে এনে বাগানে লাগানো হয়। পরে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে এটি ইউরোপের বাগানগুলোতে পরিচিতি লাভ করে এবং চাষ করা হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে এটি ইংরেজদের বাগান ও উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে একটি সাধারণ গাছ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। এর রোজ অব শ্যারন নামটি প্রথম হিব্রু ভাষার ‘তানাক’-এ দেখা যায়। বাইবেলেও এর উল্লেখ আছে।

এটি একটি প্রতিকূল পরিবেশসহনশীল গুল্ম প্রকৃতির গাছ। প্রতিকূল পরিবেশে এমনকি তুষারপাতের মধ্যেও পাতা ঝরিয়ে গাছটি শীতকাল পার করে বেঁচে থাকে। এ গাছ খরাও সইতে পারে। গাছের উচ্চতা ২ থেকে ৪ মিটার। পাতা জবা ফুলের পাতার মতোই, তবে আকৃতি ও পত্রফলকে কিনারার খাঁজে ভিন্নতা আছে। ফুলের রং সাধারণত নীলাভ গোলাপি বা গোলাপি বেগুনি। বর্তমানে এর অনেকগুলো জাত বেরিয়েছে, সেসব জাতে ভিন্ন ভিন্ন রং ও আকৃতির ফুল ফোটে। ফুলের কেন্দ্রস্থল মেরুন বা গাঢ় গোলাপি। পাপড়িগুলোর মাঝখানে একটি খাটো পুংকেশর থাকে, যেটিতে সাদাটে হলদে প্রচুর পরাগরেণু থাকে। ফুল ক্ষণস্থায়ী, সকালে ফুটে বিকেলের আগেই মুদে যায়।

কয়েক বছর ধরে জাতীয় বৃক্ষমেলায় গাছটি ফুলসহ চোখে পড়ছে। তবে রমনা উদ্যানে নার্সারির ভেতরে থাকা বড় গাছটিতে গ্রীষ্মের শুরু থেকে এই শরতেও যেভাবে ফুল ফুটতে দেখছি, তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। সকালে পাপড়িগুলো পুরোপুরি না খুললেও বেলা বাড়তেই সেসব ফুল স্বমহিমায় পূর্ণ প্রস্ফুটিত রূপে গাছের আশপাশ আলোকিত করে ফেলে। যেকোনো বাগানে এটি ফুল গাছ হিসেবে লাগানো যায়।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ