মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা
১৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:০১ AM

রাজধানীর লালমাটিয়ার বাসিন্দা নওরীন জাহান গতকাল বুধবার সকালে বাজার করতে যান মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে। তিনি পাঁচ কেজি চাল, দুই লিটার সয়াবিন তেল, দেড় কেজি ওজনের একটি ব্রয়লার মুরগি, এক ডজন ডিম ও পাঁচ ধরনের সবজি কেনেন। তাতে সব মিলিয়ে নওরীনের ১ হাজার ১৭৫ টাকা খরচ হয়। এই ক্রেতা জানান, এক বছর আগে এই পণ্যগুলো ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যে তিনি কিনতে পারতেন।
বাজার করে ফেরার পথে প্রথম আলোকে নওরীন বলেন, ‘গত এক বছরে শুধু চালের দামটা সেভাবে বাড়েনি। বাকি সব জিনিসের দাম কমবেশি বেড়েছে। আমি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। বাজারের বাড়তি দামের সঙ্গে আমার বেতন নিয়ে আর চলতে পারছি না।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত মঙ্গলবার জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। সরকারি তথ্যে মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য থাকলেও বাজারে গিয়ে তা টের পাচ্ছেন না ক্রেতারা। কারণ, বাজারে সব জিনিসপত্রের দাম আগের মতোই চড়া।
মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ, গত বছরের তুলনায় মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় জিনিসপত্রের দাম বেশি বেড়েছে। ফলে বিবিএসের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমলেও ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন না। সেই অসন্তোষের কথাই উঠে এসেছে লালমাটিয়ার বাসিন্দা নওরীন জাহানের কথায়।
বিবিএসের হিসাবে জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, অর্থাৎ মজুরি যতটা বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ছিল তার চেয়ে বেশি। ফলে সীমিত আয়ের মানুষকে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিবিএসের হিসাবে টানা ৫৩ মাস মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি রয়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সীমিত আয়ের অনেক মানুষকে হয় সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, নয়তো ধারদেনা করতে হচ্ছে। আবার নিরুপায় হয়ে অনেককে খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে খরচ কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
গত জুলাই মাসে অতিবৃষ্টির কারণে দেশের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাতে এসব জেলার বেশ কিছু এলাকায় সবজির খেত তলিয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে সবজির বাজারে। এর আগে অতি গরমের কারণেও বিভিন্ন জেলায় মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া চলতি বছর জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহন ও উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে শাকসবজি, মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমার কারণ হিসেবে গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, জুলাইয়ে চাল ও মাংসের দাম কমেছিল। তাই মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। এই দাম কমার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে বাজারে জিনিসপত্রের দামের অসংগতি আছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, নিয়মিত বাজারে যান এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বাজারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির তথ্য মেলাতে পারছেন না। পরিসংখ্যানে যত দেখানো হয়, বাজারে গিয়ে তার প্রতিফলন পাওয়া যায় না। সেলিম রায়হানের মতে, যত দিন সংস্কার হবে না, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। মূল্যস্ফীতি গণনায় আগের মতো রাজনৈতিক প্রভাব না থাকলেও কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে।
বিবিএস মূল্যস্ফীতির হিসাব করে মাসওয়ারি ভিত্তিতে। চলতি বছরের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা গত বছরের একই মাসের তুলনায় কত শতাংশ বাড়ল, তা তুলে ধরা হয়েছে। তাই গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় গত জুলাইয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ১০ ধরনের পণ্যের দাম বাড়ল নাকি কমল, তার তথ্যমূলক বিশ্লেষণ করেছে প্রথম আলো। এই ১০ পণ্য হলো চাল, সয়াবিন তেল, চিনি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, মাছ, আলু, পেঁয়াজ, আটা ও সবজি।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে উল্লিখিত ১০ পণ্যের মধ্যে চাল ছাড়া অন্য সব পণ্যের দাম কমবেশি বেড়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার, আশকোনার হাজি ক্যাম্প বাজারে খোঁজখবর নিয়ে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়।
বিবিএসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি গণনায় চালের অবদান সবচেয়ে বেশি। সংস্থাটির হিসাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় গত জুলাইয়ে চালের দাম খুব একটা না বাড়লেও মৌসুমভিত্তিক দাম ওঠানামা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চালের দাম উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৬০ টাকা। ভালো মানের নাজিরশাইল ও মিনিকেটের মতো সরু চালের দাম ছিল ৮০ টাকার ওপরে, অর্থাৎ সীমিত আয়ের মানুষকে বাজার থেকে ৫০ টাকার বেশি দরেই চাল কিনতে হচ্ছে।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় গত জুলাইয়ে আটার দাম কেজিতে বেড়েছে ৭ থেকে ১০ শতাংশ। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা বিক্রি হয়েছে ৪৫-৫০ টাকায়, জুলাই মাসেও আটার দাম একই ছিল। গত বছরের জুলাইয়ে আটার দাম কেজিতে ৫-৬ টাকা কম ছিল। এ ছাড়া এক বছরের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৬ শতাংশ বেড়েছে। খোলা পাম তেলের দামও ১০ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ছিল ১৬০-১৭০ টাকা। গত জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৬-১৯৫ টাকা। একই ভাবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম একই সময়ের ব্যবধানে লিটারে ৯ টাকার বেশি বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৯ টাকায়।
এক বছরের ব্যবধানে মাঝারি ও চিকন মসুর ডালের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। তবে মোটা দানার মসুরের দাম কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া গত এক বছরে চিনি, আলু ও পেঁয়াজের দাম ওঠানামার মধ্যে ছিল। জুলাইয়ের শেষে এসে দেশি পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বেড়ে কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা হয়ে যায়।
গত এক বছরে ক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের মাছ, ব্রয়লার মুরগি, ডিম ও সবজির দাম নিয়েও ভোগান্তিতে পড়েছেন। যেমন গত জুলাইয়ে প্রতি কেজি রুই মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। গত বছরের একই সময়ে এই মাছের দাম কেজিতে ৫০ টাকা কম ছিল। একই সময়ের ব্যবধানে তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদাসহ অন্যান্য মাছের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। গত জুলাইয়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ২০০ টাকার আশপাশে ছিল। গত বছরের জুলাইয়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। এ ছাড়া ফার্মের মুরগির ডিমের দামও ডজনে ১৫ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে তা ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়।
দাম কিছুটা কম হওয়ায় গরিব মানুষ শাকসবজির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাজারে শাকসবজির দামও বাড়তি ছিল। গত মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে সবজির দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। তখন বেশির ভাগ সবজির দরই ১০০ টাকার ওপরে উঠে যায়। কাঁচা মরিচের দাম কেজি ছাড়ায় ৪০০ টাকা। অবশ্য সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন সবজির দাম কমেছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ, গত বছরের তুলনায় মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় জিনিসপত্রের দাম বেশি বেড়েছে। ফলে বিবিএসের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমলেও ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন না।
বিবিএসের হিসাবে জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, অর্থাৎ মজুরি যতটা বেড়েছে মূল্যস্ফীতি ছিল তার চেয়ে বেশি। ফলে সীমিত আয়ের মানুষকে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিবিএসের হিসাবে টানা ৫৩ মাস মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি রয়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সীমিত আয়ের অনেক মানুষকে হয় সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, নয়তো ধারদেনা করতে হচ্ছে। আবার নিরুপায় হয়ে অনেককে খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে খরচ কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কম হওয়া মানে বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়া নয়। গত জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হওয়ার মানে হলো গত বছরের জুলাইয়ে পণ্য ও সেবার দাম ১০০ টাকা হলে গত মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে প্রতি ১০০ টাকায় ৮ টাকা ৩২ পয়সা। এটি গড় হিসাব। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। তাতে ক্রয়ক্ষমতাও কমে যায় ক্রেতাদের।
এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, গত মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির গড় হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের জুলাইয়ে যদি কোনো ব্যক্তির আয় ১০০ টাকা হয়, গত জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১০৮ টাকা ২২ পয়সা। কিন্তু একই সময়ে তাঁর জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা। ফলে জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে সীমিত আয়ের মানুষের কাউকে হয়তো ভাঙতে হচ্ছে সঞ্চয়, কাউকে করতে হচ্ছে ধারদেনা। আর কাউকে কাউকে কাটছাঁট করতে হচ্ছে খরচের তালিকা।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে কঠোর সরকার, রপ্তানিকারকদের তিন দিনের মধ্যে তথ্য জানাতে হবে
১৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ৫:২৮ PM · প্রথম আলো
জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অনেকে সরকারি সুবিধা পান না
১২ আগস্ট, ২০২৬ এ ৪:৩৫ PM · প্রথম আলো
