মানুষের চুল বিক্রি: ইসলাম কী বলে
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:০০ AM

আধুনিক বাজারে মানুষের চুল উইগ ও হেয়ার এক্সটেনশনের কাঁচামাল। চুলের দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব ও রং অনুযায়ী এর দাম নির্ধারিত হয়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের দেহ কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭০)
এই মর্যাদা শুধু জীবিত মানুষের আত্মা ও অস্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার দেহ ও দেহের অংশের মধ্যেও এর প্রভাব রয়েছে। এ কারণেই ইসলামে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সাধারণ বেচাকেনার বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
ইসলামি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলোয় মানুষের চুল বিক্রির ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়।
ইমাম মারগিনানি (রহ.) লিখেছেন, ‘মানুষের চুল বিক্রি করা এবং তা দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ নয়। কারণ, মানুষ সম্মানিত, তাকে অপমানিত করা যায় না। তার কোনো অংশকে অপমানিত ও তুচ্ছ বস্তুতে পরিণত করাও বৈধ নয়।’ (আল-হিদায়া শরহু বিদায়াতিল মুবতাদি, ৫/১০৮-১০৯, ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলুমিল ইসলামিয়া, পাকিস্তান)
এখানে লক্ষণীয়, নিষেধাজ্ঞার কারণ শুধু চুলের পবিত্রতা বা অপবিত্রতা নয়। বরং মানুষের মর্যাদাই মূল বিবেচনা। ফলে চুল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও তার সঙ্গে মানুষের দেহের অংশ হিসেবে যে সম্মানের সম্পর্ক ছিল, তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না।
সৃষ্টি জীবের মধ্যে মানুষ সবচেয়ে সম্মানিত হওয়ায় মানবদেহের কোনো অংশ ব্যবহার করে উপকৃত হওয়া বৈধ নয়। (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়াহ, ৫/৪৩৪, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)
বর্তমানে মানুষের চুলের অন্যতম বড় বাজার হলো উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন বা অনুরূপ প্রসাধনী। কেউ নিজের চুল কেটে সরাসরি বিক্রি করেন, আবার কেউ সেলুন থেকে চুল কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করেন।
উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হলেও মূল বস্তু মানুষের চুলই থাকে। তাই ব্যবসার ধরন পাল্টালেও মূল নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় না। ইসলামি শরিয়তে মানুষের চুল দিয়ে চুল সংযোজনের বিষয়টিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ অভিশাপ করেছেন সেই নারীকে, যে চুল সংযোজন করে এবং যে তা সংযোজন করায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৩৩)
অতএব, মানুষের চুল সংগ্রহ করে তা ক্রয়-বিক্রয় করা এবং এর মাধ্যমে উইগ বা হেয়ার এক্সটেনশনের ব্যবসা করা বৈধ বাণিজ্যের আওতায় পড়বে না।
মানুষের চুল এবং কৃত্রিম ফাইবার বা পশু-প্রাণীর পশম দিয়ে তৈরি চুল এক জিনিস নয়। মানুষের চুল নিষিদ্ধ হওয়ার অন্যতম মৌলিক কারণ হলো, এটি মানবদেহের একটি সম্মানিত অংশ।
তবে কৃত্রিম চুলে সেই কারণটি অনুপস্থিত। তাই মানুষের চুল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা কৃত্রিম চুলের ব্যবসার ওপর হুবহু প্রয়োগ করা যাবে না।
বরং নারীর নিজের চুলের সঙ্গে মানবচুল যুক্ত করা মাকরুহ। মানুষের চুল ছাড়া অন্য কোনো উপাদান দিয়ে চুলের সৌন্দর্য ও পরিমাণ বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে অবকাশ রয়েছে। এমনকি চুলের বিনুনি ও বেণিতে পশম ব্যবহার করাও বৈধ।’(রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ৯/৫৩৫-৫৩৬, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)
সুতরাং নিজের কাটা চুল হোক কিংবা সেলুনে সংগৃহীত চুল, তাকে পণ্য বানিয়ে ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ নয়। সৌন্দর্যের বাজার যতই বিস্তৃত হোক, মানুষের মর্যাদার সীমারেখা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা
সূত্র: প্রথম আলো
