প্লাস্টিকের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের শীতল পাটি
১৯ আগস্ট, ২০২৬ এ ৪:২৩ PM

একসময় গ্রামীণ বাংলার ঘরে ঘরে ছিল শীতল পাটির কদর। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা গরমের দুপুর-সবকিছুতেই ছিল মুর্তা বেতের তৈরি এই পাটির ব্যবহার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, চট ও কার্পেটের দাপটে সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কম মজুরি ও পুঁজির অভাবে সিরাজগঞ্জের শত বছরের পুরোনো শীতল পাটি শিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
জেলার সদর উপজেলার চুনিয়াহাটি ও কামারখন্দ উপজেলার ঝাউলের চাদপুর গ্রামে এখনও কিছু পরিবার বংশপরম্পরায় শীতল পাটি তৈরি করে যাচ্ছে। তবে আগের মতো নেই সেই কর্মচাঞ্চল্য। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারই এখন এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছে।
কারিগররা জানান, ৮০ ও ৯০-এর দশকে শীতল পাটি ছিল গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে শীতল পাটি ছাড়া আয়োজন যেন পূর্ণ হতো না। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। বাজার দখল করেছে প্লাস্টিকের পাটি, চট ও বিভিন্ন ধরনের কার্পেট। ফলে কমেছে শীতল পাটির চাহিদা।
তবে গরমের মৌসুমে এখনও কিছুটা বাড়ে এর কদর। তীব্র গরমেও তুলনামূলক ঠাণ্ডা অনুভূতি দেওয়ায় শীতল পাটির নামের সার্থকতা রয়েছে। কামারখন্দের ঝাউল ও চাদপুর গ্রামের কারিগররা শীতল পাটির পাশাপাশি নামাজের পাটি ও আসন পাটিও তৈরি করেন।
ঝাউল চাদপুর গ্রামের কারিগর মনমোহন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি পাটি তৈরি করছেন। বাবা-দাদারাও এই কাজ করতেন। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এখনও এ পেশায় আছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও তাদের তৈরি শীতল পাটির কদর রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঝাউল চাদপুর গ্রামের কারিগর পূর্ণিমা বলেন, ছোটবেলা থেকেই পাটি বুনছেন তিনি। একজন নারী সপ্তাহে একটি পাটি তৈরি করতে পারেন। এতে মজুরি মেলে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। শ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
শীতল পাটি শিল্পের আরেকটি বড় সংকট কাঁচামাল। মুর্তা বা পাটি বেতের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় ও বাজার সংকট। ফলে পাটি তৈরি করে যে দাম পাওয়া যায়, তাতে কারিগরদের শ্রমের যথাযথ দাম উঠে আসে না।
ঝাউল চাদপুর গ্রামের শীতল পাটি শিল্পী মনন জয় বলেন, একসময় বিয়ের অনুষ্ঠানে শীতল পাটি ছিল বাধ্যতামূলক। এখন সেই কদর নেই। একটি পাটি তৈরি করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। কিন্তু সে অনুযায়ী মজুরি পাওয়া যায় না।
চুনিয়াহাটি গ্রামের ব্যবসায়ী ও শিল্পী নন্দলাল দে বলেন, কাঁচামালের অভাব ও বাজার সংকট-দুই সমস্যাতেই এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই ইতোমধ্যে পেশা পরিবর্তন করেছেন। সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমানে মান ও আকারভেদে একটি শীতল পাটি এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। উন্নত ডিজাইন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি পাটির দাম আরও বাড়ছে। তবে সেই বাড়তি দামের পুরো সুবিধা পাচ্ছেন না কারিগররা।
চুনিয়াহাটি ও ঝাউল চাঁদপুর গ্রামের অধিকাংশ পরিবার একসময় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন সেই সংখ্যা কমে এসেছে। পাটি শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিল্লু চন্দ্র দাস জানান, পুঁজি সংকটে শিল্পটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ঋণ সহায়তা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দ্রুত বড় পরিসরে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
কামারখন্দ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, শীতল পাটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগে একটি পাটি এক থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হলেও প্রশিক্ষণের পর উন্নতমানের পাটি তৈরি করে কারিগররা তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারছেন। করোনা সময়ে এই খাতে প্রণোদনা ঋণ হিসেবে প্রায় ৩০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ঐতিহ্যের কথা বললেই শীতল পাটি শিল্প বাঁচবে না। প্রয়োজন মানসম্মত কাঁচামালের সহজলভ্যতা, স্বল্প সুদে ঋণ, আধুনিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ, ন্যায্য মজুরি এবং দেশ-বিদেশে বাজার তৈরি। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে কারিগরদের যুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের কাছেও শীতল পাটির চাহিদা তৈরি হতে পারে।
সিরাজগঞ্জের চুনিয়াহাটি ও ঝউল চাদপুরের প্রায় ১২০টি পরিবার এখনও শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পূর্বপুরুষের এই পেশা ধরে রেখেছে। তাদের হাতে বোনা প্রতিটি পাটি শুধু একটি ব্যবহার্য পণ্য নয়-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও শত বছরের ঐতিহ্য।
প্রশ্ন এখন একটাই-সময়মতো সহযোগিতা পেলে কি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে সিরাজগঞ্জের শীতল পাটি শিল্প, নাকি প্লাস্টিকের দাপটে হারিয়ে যাবে লোকজ ঐতিহ্যের এই নিদর্শন?
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম আবুল কালাম আজাদপ্রকাশক: মিডিয়া ড্রিমস লিমিটেড-এর পক্ষে মো. মাসুদ রাজ্জাকঠিকানা: ০৫, সোনারগাঁও জনপথ রোড, সেক্টর-০৭, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০মুদ্রণ: শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক অফিস: ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-১৩), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫।ই-মেইল: [email protected]টেলিফোন (পিএবিএক্স): ০২-৪১০১০৬৮১-৮৪মোবাইল: +৮৮-০১৩৩৫১২৭৭০০
সূত্র: Daily Times Of Bangladesh
সম্পর্কিত সংবাদ
তাড়াশে কাবিন সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুলাভাইয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ
১৯ আগস্ট, ২০২৬ এ ৪:৫২ PM · দৈনিক সিরাজগঞ্জ সংবাদ
এসএসসি পাসের মিষ্টির টাকা দিয়ে সহপাঠীর মায়ের চিকিৎসা, পাশে দাঁড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীও
১৯ আগস্ট, ২০২৬ এ ২:৩১ PM · প্রথম আলো
সিরাজগঞ্জে ভটভটির ধাক্কায় প্রাণ হারালেন মোটরসাইকেল আরোহী
১৯ আগস্ট, ২০২৬ এ ১:২৫ PM · Daily Times Of Bangladesh
