শাহজাদপুর সংবাদ

নিজেকে রক্ষার জন্য অপরাধটা কি আমাদেরই হলো, প্রশ্ন সেই তরুণীর

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:৪৪ PM

নিজেকে রক্ষার জন্য অপরাধটা কি আমাদেরই হলো, প্রশ্ন সেই তরুণীর

রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় শ্লীলতাহানির শিকার হওয়ার অভিযোগকারী তরুণী (২৩) বলেছেন, ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ তাঁকে কোনো সাহায্য করেনি। তাই তিনি নিজেকে রক্ষায় তাঁর এক স্বজনকে ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। যাঁর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ, তাঁর গায়ে হাত তোলায় স্বজনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তরুণীর প্রশ্ন, ‘তাহলে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অপরাধটা কি আমাদেরই হলো?’

গতকাল বুধবার রাতে প্রথম আলোকে পাঠানো এক লিখিত বার্তায় তরুণী এ কথা বলেন। একই বক্তব্য তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন বলে জানিয়েছেন।

ধানমন্ডি এলাকার ফুটপাতে এক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এই তরুণীর স্বজন খালিদ হাসানকে (৩৫) গতকাল দুপুরে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়। তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠান আদালত।

শ্লীলতাহানির অভিযোগে গত সোমবার দুপুরে ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের বেসরকারি বাংলাদেশ আই হসপিটালের উল্টো দিকে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা (৪৮) নামের ব্যক্তিকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করান খালিদ। একপর্যায়ে শহীদ আবদুল্লাহকে আটক করে ধানমন্ডি থানা–পুলিশ। পরে তাঁকে এক মাসের কারাদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর পুলিশের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

মারধরের ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই পুলিশ সদস্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ধানমন্ডি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল হাইকে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে ইতিমধ্যে তাঁর কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাস্থলে আবদুল হাইয়ের দায়িত্ব ছিল। তাঁকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে থাকা অন্য দুই পুলিশ সদস্য পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (দাঙ্গা দমন বিভাগ)। তাঁদের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না।

তরুণী তাঁর বার্তায় বলেন, তিনি বিবাহিত। সম্প্রতি একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি একজন বয়স্ক লোককে গালাগাল ও মারধর করছেন। কারণ, ওই বয়স্ক লোক তাঁর (মারধরকারী) স্বজনের গায়ে খারাপভাবে স্পর্শ করেছিলেন। সেই ভুক্তভোগী মানুষটি তিনিই। তাঁর গায়ে অশালীনভাবে স্পর্শ করায় তাঁর স্বজন প্রতিবাদ করেন।

ঘটনার পর এত দিন চুপচাপ ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তরুণী। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিবাহিত নারী বলে গণমাধ্যমে আসতে চাননি। তাঁর দৈনন্দিন জীবনে কোনো সমস্যা হোক, এটা তিনি চাননি। কিন্তু এখন আর চুপ থাকতে পারলেন না। ঘটনার বিস্তারিত না জেনে ও না বুঝে মানুষ তাঁর স্বজনকে দোষারোপ করছে, তাঁর শাস্তি চাইছে। গণমাধ্যমের কারণেই আজ তিনি এত ভুক্তভোগী। তাই গণমাধ্যমের কাছে তিনি সাহায্য চাইছেন।

তরুণীর প্রশ্ন, যখন কোনো নারীর ইজ্জতে হাত পড়ে, আর আইন তাঁকে সাহায্য করে না, তখন তাঁর কার কাছে যাওয়া উচিত?

ভিডিওতে দেখা যায়, দুই পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে আছেন—এ কথা উল্লেখ করেন তরুণী। তিনি বলেন, ঘটনাটি ঘটার পর বয়স্ক লোকটিকে ধরে প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিয়ে যান। তাঁর শাস্তি চান। পুলিশ তাঁকে মামলা করতে বলে। তিনি তখন হাসপাতালে তাঁর রোগী নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এমন মুহূর্তে কি তাঁর মামলা করতে যাওয়া উচিত ছিল, এই প্রশ্ন তাঁর।

কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না দেখে আত্মরক্ষার্থে আইন নিজের হাতে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তরুণী। তিনি বলেন, বয়স্ক লোকটিকে থানায় নিয়ে যেতে তিনি ও তাঁর স্বজন অনেক জোরাজুরি করেছেন। কিন্তু লোকটি যেতে চাননি। সে কারণেই লোকটির গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হন তাঁর স্বজন। লোকটির গায়ে হাত তোলার দায়ে আজ তাঁর স্বজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তাঁকে ১৫ দিনের জেল দেওয়া হয়েছে। তরুণীর প্রশ্ন, ‘তাহলে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অপরাধটা কি আমাদেরই হলো?’

জাতির উদ্দেশে কিছু প্রশ্ন রেখেছেন তরুণী। তিনি বলেছেন, কর্তব্যরত পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে কোনো সাহায্য করেনি। তাই নিজেকে রক্ষা করতে তিনি তাঁর স্বজনকে ফোন করে ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া কি তাঁর ভুল? তাঁকে রক্ষা করতে এসে আজ তাঁর স্বজন প্রতিবাদ করেছেন। কাল একই ঘটনা অন্যদের সঙ্গেও ঘটতে পারে। তখন কি লোকজন নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করবে না?

এই ঘটনার পর কোনোভাবে হেনস্তা বা হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়টি প্রত্যাশা করেননি বলে উল্লেখ করেন তরুণী। তাঁর প্রশ্ন, তাহলে আজ কেন তাঁকে থানা ও আদালতে যেতে হলো? কেন তাঁর স্বজনের ১৫ দিনের কারাদণ্ড হলো? তাঁকে রক্ষা করাই কি তাঁর স্বজনের অপরাধ?

তরুণী বলেছেন, বয়স্ক ব্যক্তি নাকি মানসিক রোগী। তিনি মানসিক রোগী হলেও কি তাঁর গায়ে খারাপভাবে স্পর্শ করার অধিকার তাঁর আছে? তাহলে কি তিনি অপরাধী নন? অপরাধীর শাস্তি যদি এক মাসের কারাদণ্ড হয়, তাহলে অপরাধের প্রতিবাদকারীরও কি ১৫ দিন কারাদণ্ডের শাস্তি হওয়া উচিত? তাহলে আজ তাঁর নিরাপত্তা কোথায়? ভুক্তভোগীও তিনি, হয়রানি ও হেনস্তার শিকারও তিনি। তাহলে কি এখন আর কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে না, এই প্রশ্ন তরুণীর।

কেন একজন নারীকে নিজের সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হবে, এই জিজ্ঞাসা তরুণীর। তিনি বলেছেন, তাঁর অপরাধটা কোথায়? নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটাই কি অপরাধ?

যে অপরাধ করে আর যে অপরাধ সহ্য করে—দুজনই কি সমান অপরাধী, এই প্রশ্ন তরুণীর। তিনি বলেন, আজ তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছে, কাল অন্য মা–বোনদের সঙ্গেও তা হবে। তখনো কি সবাই প্রতিবাদকারীকে দোষারোপ করবেন?

তরুণীর ভাষ্য, যিনি প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশ করেছিলেন, তাঁকে তিনি ফোন করেন, বার্তা পাঠান। নিরাপত্তার জন্য ভিডিওটি মুছে ফেলতে বলেন। কিন্তু তিনি তা করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।

ঘটনার পর ধানমন্ডি থানার পুলিশ এসে বয়স্ক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বলে উল্লেখ করেন তরুণী। তাঁর ভাষ্য, তিনি বারবার পুলিশকে বলেছিলেন, আর হয়রানির শিকার হতে চান না। তখন তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তাহলে আজ কেন তাঁকে এসব পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হলো, সেই প্রশ্ন তাঁর।

নিজেকে এখন অপরাধী মনে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তরুণী। তিনি বলেন, তাঁকে রক্ষা করার জন্য আজ তাঁর স্বজন শাস্তি পাচ্ছেন। এটাই কি তাহলে আইনের বিচার?

ঘটনার পর থেকে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তরুণী। তিনি বলেন, জাতির কাছে সহযোগিতা চাইছেন। তাঁর জন্য প্রতিবাদ করতে গিয়ে কেউ শাস্তি পাক, তা তিনি চান না। এখন তাঁর কী করা উচিত, তা সবার কাছে জানতে চান তিনি। একই সঙ্গে জানতে চান, তিনি তাঁর স্বজনকে কীভাবে রক্ষা করবেন? তাঁর মতো যাঁরা এমন পরিস্থিতির শিকার হন, তাঁদের সবার জন্যই তিনি সাহায্য চান।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

নিজেকে রক্ষার জন্য অপরাধটা কি আমাদেরই হলো, প্রশ্ন সেই তরুণীর | শাহজাদপুর সংবাদ