থামছে না মৃত্যুর মিছিল: ডেঙ্গু-হাম কি ‘গা-সওয়া’ হয়ে উঠছে?
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৮:০০ AM

প্রতিদিনই ডেঙ্গু ও হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে এক, দুই, পাঁচজন কিংবা তারও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত প্রতিবেদনে উঠে আসছে নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর হিসাব। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং অপূরণীয় ক্ষতি। জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিনের মৃত্যুর খবর যেন ধীরে ধীরে ‘গা-সওয়া’ হয়ে উঠছে। অথচ ডেঙ্গু ও হামে প্রতিটি মৃত্যুই অনাকাঙ্ক্ষিত।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ৮টার আগ পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে সাতজন। এ সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৯৯ জন। অন্যদিকে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৩৫ জন।
অধিদফতরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। গত বছরের শুরু থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ৬৩ হাজার ১৭০ জন। চলতি বছরের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জনে, যা প্রায় দ্বিগুণ। গত বছরের এই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিল ২৫৯ জন। এ বছর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৭১।
অন্যদিকে, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি। সেই সময় থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ সময় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ১০৪ শিশু। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৪ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৭০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ২৭৩ জনের।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ঘন ঘন বৃষ্টিপাতের কারণে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। অক্টোবরের মধ্যেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য সচিব বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি হঠাৎ করে অবনতি হয়নি। গত বছর ও তার আগের বছরেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওষুধ, স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
তিনি জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকা নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে।
এর আগে গত ১৩ অক্টোবর রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক এক সেমিনার শেষে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের চার মাস আগের আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বিত পদক্ষেপের কারণে অতীতের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার ফলে আগের বছরগুলোর তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। একসময় আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে পাঁচজন মারা যেতেন, এখন সেই সংখ্যা হাজারে তিনজনে নেমে এসেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনায় এবার আক্রান্তের সংখ্যা ও তীব্রতা অনেক কম। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরকার কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখছে না। প্রতিটি মৃত্যুই অত্যন্ত বেদনার এবং সরকার সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নামাতে কাজ করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমে আসার কথা বলা হলেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে হামের প্রাদুর্ভাবও অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোগ দুটি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গু ও হাম জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি। এ ধরনের পরিস্থিতি গতানুগতিক রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না। জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু নিয়ম রয়েছে। কোভিড মহামারির সময়ও এর নমুনা দেখা গেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা গতানুগতিক রোগের চিকিৎসার জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এভাবে হবে না, হচ্ছেও না। দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পদ্ধতিগত পরিবর্তন না করায় জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। ফলে রোগীদের মৃত্যু হচ্ছে।
মুশতাক হোসেন বলেন, হামের টিকা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দিতে হবে। হাম অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এ রোগ প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। বিষয়টি জানা সত্ত্বেও সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার, তা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) জানে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, কতটি আইসিইউ কিনতে হবে, তা মন্ত্রীর কাছে আছে। কিন্তু এক লাখ আইসিইউ কিনতে পারলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য এক কোটি দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী লাগবে। এই পদ্ধতিতে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের অভিযোগ, সরকার টিকাদান কার্যক্রমেও স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করছে না। মানুষকে যেভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়, সেভাবে টিকাদান কার্যক্রমে ফাঁকি দিয়ে ভাইরাস মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ভাইরাসকে এভাবে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। টিকা দিতে হলে মাইক্রোপ্ল্যানিং করতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই। যত টাকা ও খরচ প্রয়োজন, তা করতে হবে। তা না হলে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের টিকাদানের যে সুনাম ছিল, তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দলগুলো বলেছে, বাংলাদেশের টিকাদানের সেই সুনাম আর নেই। টিকাদান কার্যক্রমে অনেক অসম্পূর্ণতা রয়েছে।
ডেঙ্গুর টিকা প্রসঙ্গে মুশতাক হোসেন বলেন, টিকা নিয়ে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে কয়েকটি দেশে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। টিকাটি নিরাপদ কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখনো টিকাটিকে প্রি-কোয়ালিফিকেশন দেয়নি। অর্থাৎ, টিকাটি নিয়ে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনও পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এবং ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সিও টিকাটি অনুমোদন করেনি। অতি উৎসাহী হয়ে টিকাটি চালু করতে গেলে বিপদ হতে পারে। টিকা নেওয়ার পর কেউ মারা গেলে সব টিকাদান কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই সরকারকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে এবং স্বীকৃত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
সরকার উদ্যোগ নেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে করণীয় কী, জানতে চাইলে মুশতাক হোসেন বলেন, সরকারি উদ্যোগে কাজ হবে না, এমন নয়। তবে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এই টাস্কফোর্স প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং টিকাদান কার্যক্রম ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মতো কোন কোন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, তার তালিকাও তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারের শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সব রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাঝারি মানের হাসপাতালেও তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে পর্যবেক্ষণে রাখলে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে। আর যেসব রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন, তাদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এভাবে স্তরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও একই ধরনের পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ যেসব এলাকায় বেশি, সেসব এলাকায় পরীক্ষা বাড়াতে হবে। পরীক্ষায় যাদের ডেঙ্গু শনাক্ত হবে, তাদের ১০ দিন বাসায় বিশ্রামে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের বাসায় থাকার পর্যাপ্ত জায়গা নেই, তাদের জন্য কমিউনিটি সেন্টারে ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
মুশতাক হোসেনের মতে, এভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে এবং আইসিইউতে রোগীর চাপও কমবে। ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় এভাবেই স্তরভিত্তিক ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
সম্পর্কিত সংবাদ
শাহজাদপুরে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ৭০ পরিবার পেল ঢেউটিন ও নগদ অর্থ প্রতিটি পরিবার
২০ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৭:০৪ PM · সিরাজগঞ্জের কাগজ
দেশের সব হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের লাইব্রেরিতে জিয়া-খালেদা জিয়ার বই রাখার নির্দেশ
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৭:২৯ PM · বাংলা ট্রিবিউন
আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু কম: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:০৪ PM · বাংলা ট্রিবিউন
চিকিৎসকদের বদলি-পদায়ন কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৪:৪২ PM · বাংলা ট্রিবিউন
ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন অনুমোদনে কেন এত সতর্ক সরকার? জানালেন প্রতিমন্ত্রী
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৭:১৯ PM · বাংলা ট্রিবিউন
