খ্যাঁকশিয়াল কেবল ‘মুরগিচোর’ নয়, প্রকৃতি-কৃষির রক্ষকও
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৩০ PM

খ্যাঁকশিয়াল মানুষের মুরগি ধরে খেয়ে ফেলে। সাধারণত এভাবেই মানুষ খ্যাঁকশিয়ালকে চেনে। কিন্তু গবেষণা বলছে, কৃষির সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এই প্রাণীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস এবং অকারণে এদের পিটিয়ে মারার প্রবণতা এই প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা পঞ্চগড়। সেখানকার আটোয়ারী উপজেলার নিরিবিলি এক কবরস্থানে দিনরাত অতন্দ্র প্রহরীর মতো ক্যামেরার ফাঁদ (ক্যামেরা-ট্র্যাপ) পেতে বসে ছিলেন একদল গবেষক। উদ্দেশ্য, আমাদের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসা রহস্যময় প্রাণী ‘বেঙ্গল ফক্স’ বা বাংলা খ্যাঁকশিয়ালের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা। দীর্ঘ তিন মাস ধরে স্বয়ংক্রিয় এই ক্যামেরা-ট্র্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত সেসব ভিডিও চিত্রে উঠে এসেছে খ্যাঁকশিয়ালের ভালোবাসা, ঝগড়া, শিকার আর টিকে থাকার সংগ্রামের এক অভাবনীয় গল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে পরিচালিত এ গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে খ্যাঁকশিয়াল সম্পর্কে এমন সব তথ্য, যা আগে অজানাই ছিল।
খ্যাঁকশিয়াল একটি ছোট প্রজাতির মাংসাশী প্রাণী। পৃথিবীর ভালপেস গণভুক্ত খ্যাঁকশিয়ালদের একটি আমাদের এই খ্যাঁকশিয়াল। ওজন মাত্র ১.৮ থেকে ৩.৬ কেজি। দৈর্ঘ্যে মাত্র ৩১ ইঞ্চি। খড়রঙা এই প্রাণীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে এর লোমশ লেজ। প্রজননের সময় এরা গর্ত তৈরি করে। বাংলাদেশে একসময় সবখানেই খ্যাঁকশিয়াল দেখা যেত, কিন্তু বর্তমানে এদের অবস্থা বেশ নাজুক। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) বাংলাদেশের লাল তালিকায় এই প্রজাতি ‘বিপদাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত।
বিশেষ করে যমুনা-পদ্মার পশ্চিম দিকেই এদের উপস্থিতি এখন নথিবদ্ধ। আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানুষের উপদ্রবের কারণে এই প্রাণী এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে কোনোমতে টিকে আছে। আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও খ্যাঁকশিয়ালের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে উত্তরবঙ্গের তৃণভূমি ও শুষ্ক খোলা জায়গা—যেগুলো খ্যাঁকশিয়ালের পছন্দের আবাস—ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। বন্যার ঘটনা বাড়লে মাটির নিচের গর্ত ডুবে যায়, যা প্রজনন মৌসুমে শাবকদের জন্য বিপজ্জনক।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার একটি কবরস্থানে খ্যাঁকশিয়ালের একটি গর্ত বা বেষ্টনীকে কেন্দ্র করে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় মোট ১২ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে খ্যাঁকশিয়ালের ৪ হাজার ৫০০টির বেশি ভিডিও ক্লিপ পাওয়া যায়।
গবেষক দলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসির আকাশ, গবেষক মো. রোকনুজ্জামান, সুলতান আহমেদ, মোহাম্মদ সামিউল আলম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেইরি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. ম্যাক্সিমিলিয়ান অ্যালেন। ‘ডেন-সাইট বিহেভিয়ার অব বেঙ্গল ফক্স (ভালপেস বেঙ্গালেনসিস) রিভিলস পারসিস্টেন্ট ইউজ, সোশ্যাল ইন্টারেকশনস, অ্যান্ড কো–এক্সিস্টেনস ইন শেয়ারড স্পেসেস’ শীর্ষক গবেষণাটি এ বছর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ব্রিটিশ ইকোলজিক্যাল সোসাইটি ও উইলি প্রকাশনার যৌথভাবে পরিচালিত ইকোলজি অ্যান্ড ইভোল্যুশন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
এই গবেষণার ফলাফল অবগত করে বক্তব্য জানতে চাইলে উপপ্রধান বন সংরক্ষক রাকিবুল হাসান মুকুল প্রথম আলোকে বলেন, খ্যাঁকশিয়ালের আবাসস্থল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। কারণ, জনসংখ্যা বাড়ার ফলে বনজঙ্গল কেটে মানুষের আবাসস্থল নির্মাণ করা হচ্ছে। এটা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জায়গা থেকে খুবই উদ্বেগজনক।
তবে খ্যাঁকশিয়াল রক্ষায় বন বিভাগের সুনির্দিষ্টভাবে এ মুহূর্তে কোনো উদ্যোগ নেই জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি অনুমোদিত হলে খ্যাঁকশিয়াল ও সমগোত্রীয় বন্য প্রাণী রক্ষায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ করা যাবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খ্যাঁকশিয়াল তাদের আস্তানার প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত। প্রজনন মৌসুমের সময় তারা গর্তের আশপাশে ব্যাপক সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এই সক্রিয়তা তুঙ্গে থাকে। শাবক লালন–পালনের সময়ও তা অব্যাহত থাকে। মে মাসের দিকে এই সক্রিয়তা অনেকটা কমে আসে, যখন শাবকগুলো বড় হতে শুরু করে।
গবেষকেরা একটি গর্তে সর্বোচ্চ ছয়টি পর্যন্ত খ্যাঁকশিয়াল একসঙ্গে দেখেছেন। এরা সাধারণত গোধূলি এবং ভোরে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। গর্তের আশপাশে ভোর ৪টা ৩০ মিনিট থেকে ৬টা ৩০ মিনিট এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে বেশি বিচরণ লক্ষ করা গেছে। দিনের বেলা এরা খুব একটা বাইরে বের হয় না, যা মূলত মানুষ এবং অন্যান্য শিকারি প্রাণীর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার একটি কৌশল হতে পারে।
ওই গবেষণায় দেখা যায়, খ্যাঁকশিয়াল অত্যন্ত দক্ষ শিকারি। খ্যাঁকশিয়ালের শাবক বা কিটদের খাবারের তালিকা বেশ বৈচিত্র্যময়। এরা মূলত সুযোগসন্ধানী খাদক।
৫৪০টি ক্যামেরা-ট্র্যাপ ভিডিওতে খ্যাঁকশিয়ালদের নানা ধরনের খাবার খেতে দেখা গেছে। ৪৫ শতাংশ ভিডিওতে সুস্পষ্টভাবে খাদ্যের প্রকারভেদ গবেষকেরা শনাক্ত করতে পেরেছেন। তালিকায় রয়েছে পোকামাকড়, ছোট পাখি ও ইঁদুর। খ্যাঁকশিয়ালের খাদ্যাভ্যাসের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ। খাবারের ১৯ শতাংশই ছিল পোকামাকড়।
শাবকদের জন্য শিয়ালগুলো প্রায়ই পাখি শিকার করে আনে। গবেষণায় শিয়ালদের খাবারের তালিকায় ১৮ শতাংশ ক্ষেত্রে পাখির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শাবক লালন-পালনের মৌসুমে বড় শিয়ালগুলো ওজনের দিক থেকে ভারী শিকার পছন্দ করে, যাতে শাবকদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত হয়। সেই হিসেবে ইঁদুর তাদের খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ (৮ শতাংশ)।
উল্লেখ্য, এই নির্দিষ্ট গবেষণায় খ্যাঁকশিয়ালদের সাপ, উদ্ভিদজাত খাবার বা মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যদিও ভারতের ওডিশার একটি গবেষণায় এমনটি দেখা গেছে। শাবকদের জীবনের শুরুর দিকে তাদের প্রধান পুষ্টি আসে মায়ের দুধ থেকে। গবেষণার ভিডিও ফুটেজে মা খ্যাঁকশিয়ালকে তার শাবকদের দুধ খাওয়ানোর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূলত আস্তানার আশপাশে পাওয়া যায়, এমন ছোট ছোট প্রাণী ও পতঙ্গই শাবকদের প্রধান খাদ্য। আস্তানার খুব কাছে পাওয়া যায়, এমন খাবারের মধ্যে উইপোকা অন্যতম। ১৬টি ভিডিওতে দেখা গেছে, যখন উইপোকার ঝাঁক মাটি থেকে বের হয়, তখন শাবকেরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে সেগুলো খায়। এটিকে শাবকদের জন্য একটি সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর ‘নিয়ার-ডেন’ (আস্তানার কাছের) খাবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
খ্যাঁকশিয়াল প্রজনন মৌসুম ছাড়া সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে, যে কারণে তাদের দেখা পাওয়া দুষ্কর। তবে শাবক লালন-পালনের সময় তারা জোড়ায় থাকে, বাবা-মা অত্যন্ত সামাজিক হয়ে ওঠে। গবেষণাটি ১৬ ধরনের আচরণ লিপিবদ্ধ করেছে। এর মাঝে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আচরণ লক্ষ করা গেছে। এ রকম ৪২৫টি ভিডিও ক্লিপের মধ্যে শাবকদের নিজেদের ও বাবা-মায়ের সঙ্গে খেলাধুলা করাই ছিল সবচেয়ে বেশি (৩২৭টি), ৫০টি ভিডিও ক্লিপে একে অপরকে অভিবাদন জানানোর দৃশ্য দেখা গেছে। এতে তারা লেজ নাড়ানো, একে অপরের শরীর ও মুখ শুঁকা, নিচু স্বরে শব্দ করা এবং শরীর নিচু করে কাঁপার মতো অঙ্গভঙ্গি করত। এটি মূলত নিজেদের দলের সদস্যদের চিনে নেওয়া এবং সামাজিক বন্ধন রক্ষার একটি উপায়।
২১টি ক্লিপে দেখা গেছে, একটি খ্যাঁকশিয়াল অন্যটির লোম কামড়ে, চেটে বা আঁচড়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। এটি তাদের পারস্পরিক মমত্ববোধ ও সুস্থতা বজায় রাখার একটি সামাজিক কৌশল। পাঁচটি ক্লিপে মা খ্যাঁকশিয়ালকে তার শাবকদের দুধ খাওয়ানোর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী হয়েছে। ১৩টি ক্লিপে শাবক বা বড়দের মধ্যে একে অপরের ওপর ওঠার দৃশ্য দেখা গেছে, যা মূলত সামাজিক আধিপত্য বা ডমিন্যান্স প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
গবেষকদের মতে, এই খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং শাবকদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে এবং ভবিষ্যতে শিকার বা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।
খ্যাঁকশিয়ালের এই গর্তের আশপাশে সাত প্রজাতির পাখি ক্যামেরা-ট্র্যাপের ভিডিওতে ধরা পড়েছে। ছয়বার এসেছে বেশ বড় আকারের পাতিশিয়াল (গোল্ডেন জ্যাকেল), কুকুর এসেছে পাঁচবার, মানুষ এসেছে ৩৪ বার। তবে গবেষণার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো, খ্যাঁকশিয়ালের আস্তানায় বেঙ্গল মনিটর বা বাংলা গুইসাপের আনাগোনা।
দেখা গেছে, খ্যাঁকশিয়াল এবং গুইসাপের মধ্যে আন্তঃপ্রজাতি দ্বন্দ্ব নিয়মিত চলে। গুইসাপ অনেক সময় খ্যাঁকশিয়ালের শাবক খেয়ে ফেলে বলে গুজরাট ও অন্ধ্রপ্রদেশের দুটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ‘অ্যান ইন্টারেস্টিং অবজারভেশন: মনিটর লিজার্ড (ভারানাস বেঙ্গালেনসিস) ইউজিং দ্য ডেন অব ইন্ডিয়ান ফক্স (ভালপেস বেঙ্গালেনসিস)’ শিরোনামের গুজরাটের গবেষণাটিতে গুইসাপকে খ্যাঁকশিয়ালের প্রজননকাল শেষ করে রেখে যাওয়া গর্ত ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ‘পপুলেশন অ্যান্ড ইকোলজি অব দ্য ইন্ডিয়ান ফক্স ভালপেস বেঙ্গালেনসিস অ্যাট রোলাপাদু ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি, অন্ধ্রপ্রদেশ, ইন্ডিয়া’ নামক গবেষণাতেও অনুরূপ মতামত দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চগড়ে করা গবেষণায় খ্যাঁকশিয়াল ও গুইসাপকে ৪৪৭টি ভিডিও ক্লিপে একসঙ্গে পাওয়া গেছে। এর মাঝে ১৬টিতে গুইসাপ দেখামাত্রই খ্যাঁকশিয়ালরা তেড়ে যায় এবং তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ৩১টিতে খ্যাঁকশিয়ালদের গুইসাপের উপস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় ছিল। ২টি মাত্র ক্লিপে খ্যাঁকশিয়ালগুলো পিছু হটেছিল। আসলে তাদের মধ্যে একটি স্নায়ুযুদ্ধ সব সময় চলতে থাকে।
গুইসাপ ও খ্যাঁকশিয়ালের সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শাবক শিকার। গুইসাপ খ্যাঁকশিয়াল শাবকদের শিকার করার জন্য পরিচিত। শাবক লালন-পালনের মৌসুমে (মার্চ-মে) প্রাপ্ত তথ্যমতে, বয়স্ক খ্যাঁকশিয়ালরা তাদের শাবকদের সুরক্ষায় অত্যন্ত সজাগ থাকে এবং গুইসাপকে একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। গুইসাপ অনেক সময় খ্যাঁকশিয়ালের তৈরি গর্ত বা ‘ডেন’ ব্যবহারের চেষ্টা করে। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গুইসাপের প্রজনন মৌসুম চলায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শিয়ালের প্রজননকাল শেষে তাদের রেখে যাওয়া গর্তের দিকে আকৃষ্ট হয়, যা দুই প্রাণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। গুইসাপ অনেক সময় শিয়ালের গর্তের আশপাশে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবারের লোভে সেখানে হানা দেয়।
গবেষণায় একটি বিশেষ বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে—মানুষের চলাচলের সঙ্গে খ্যাঁকশিয়ালের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এমনকি গর্তের মাত্র ২০ মিটার দূরে ছিল একটি পাকা রাস্তা। এ ছাড়া ক্যামেরা ট্র্যাপের উপস্থিতিও তাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। প্রতিবার ক্যামেরা-ট্র্যাপের সামনে আসার পর অন্তত দুই ঘণ্টা খ্যাঁকশিয়ালগুলো বিচরণ করেছে। এটি নির্দেশ করে যে আস্তানার পাশ দিয়ে মানুষের চলাচল তাদের খুব একটা বিচলিত করে না, যতক্ষণ না মানুষ তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে।
খ্যাঁকশিয়ালের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেছেন দেশের বিশিষ্ট বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী ও বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘খ্যাঁকশিয়াল অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম প্রাণী। মানুষের বসতি, এমনকি ব্যস্ত রাস্তার কাছেও তারা নির্বিঘ্নে থাকতে পারে, যদি সরাসরি হুমকি না থাকে। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানুষের চলাচল বা ক্যামেরা-ট্র্যাপের উপস্থিতি তাদের আচরণে তেমন প্রভাব ফেলে না। বরং তারা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের স্বাভাবিক জীবনচক্র—খাদ্য সংগ্রহ, বিশ্রাম ও চলাফেরা—অব্যাহত রাখে। এটি প্রমাণ করে, সহাবস্থান সম্ভব, যদি মানুষ তাদের প্রতি সহনশীল থাকে এবং ক্ষতি করার চেষ্টা না করে।
বেঙ্গল ফক্স বা খ্যাঁকশিয়ালের শাবকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় বা প্রাপ্তবয়স্ক শিয়ালগুলো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত ভূমিকা পালন করে। প্রাপ্তবয়স্ক খ্যাঁকশিয়াল শাবকদের শিকারি প্রাণী এবং প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য মাটির নিচে গর্ত বা ডেন তৈরি করে।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রজনন মৌসুমে শাবকদের লালন-পালনের সময় বাবা-মা এই আস্তানার প্রতি অত্যন্ত অনুগত থাকে এবং এর আশপাশে নিয়মিত উপস্থিত থেকে পাহারা দেয়। তারা প্রতিনিয়ত চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে এবং কোনো বিপদের সংকেত পেলে শরীর নিচু করে, কান খাড়া করে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেয়। গোল্ডেন জ্যাকেল (পাতিশিয়াল) বা মানুষের পোষা কুকুর খ্যাঁকশিয়ালের শাবকদের মেরে ফেলতে পারে, যা মধ্যভারতের একাধিক গবেষণায় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পঞ্চগড়ে কুকুর ও পাতিশিয়ালদের সঙ্গে খ্যাঁকশিয়ালদের কোনো ক্যামেরা-ট্র্যাপ ভিডিওতে মুখোমুখি দেখা যায়নি। এই বিপদ এড়াতে খ্যাঁকশিয়ালগুলো কৌশলগতভাবে সময়ের পার্থক্য বজায় রাখে; তারা সাধারণত এমন সময়ে (গোধূলি বা ভোরে) বেশি সক্রিয় হয়, যখন অন্যান্য বড় শিকারি বা মানুষের আনাগোনা কম থাকে। একান্ত নিরুপায় হলে গর্তে লুকায়, যার একাধিক মুখ থাকে।
পঞ্চগড়ের গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে এর গবেষণা পদ্ধতি। ক্যামেরা-ট্র্যাপ পদ্ধতিতে গর্তবাসী নানা মাংসাশী প্রাণী নিয়ে গবেষণা থাকলেও খ্যাঁকশিয়াল নিয়ে এমন গবেষণা এ অঞ্চলে প্রথম।
মুনতাসির আকাশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নানা প্রজাতির খ্যাঁকশিয়ালদের, যেমন লাল খ্যাঁকশিয়াল ও ধূসর খ্যাঁকশিয়ালদের গর্তনির্ভর জীবনাচরণ নিয়ে ক্যামেরা-ট্র্যাপ পদ্ধতিতে গবেষণা থাকলেও এ ধরনের প্রাণীরা কীভাবে শাবকদের বড় করে, কী খায় বা সে সময় নানা ধরনের হুমকির মোকাবিলায় এদের কৌশল নিয়ে এভাবে গবেষণা এই একটিই। যদি বেঙ্গল ফক্স বা বাংলা খ্যাঁকশিয়ালকে ধরি, পঞ্চগড়ের কাজটির মতো একটিও কাজ আগে হয়নি।’
এ গবেষণার অন্যতম গবেষক মুনতাসির আকাশ ও তাঁর দল মনে করে, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রান্তিক জনপদে খ্যাঁকশিয়াল এখনো টিকে আছে মানুষের সঙ্গে জায়গা ভাগাভাগি করে। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস এবং অকারণে এদের পিটিয়ে মারার প্রবণতা এই প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খ্যাঁকশিয়াল সংরক্ষণে কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, স্থানীয় মানুষের সচেতনতাও জরুরি। গ্রামগঞ্জের ঝোপঝাড়, ছোট বন বা কবরস্থানের মতো নির্জন জায়গাগুলো এদের প্রধান নিরাপদ আশ্রয়। এই আবাসস্থলগুলো রক্ষা করা গেলে এবং পোকামাকড় ও ইঁদুর দমনে এদের ভূমিকার কথা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পারলে হয়তো এই বিপন্ন প্রাণীটিকে আমরা রক্ষা করতে পারব।
মুনতাসির আকাশ বলেন, ‘সাধারণত আমাদের গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম কেবল তখনই শুরু হয়, যখন প্রাণীটির অস্তিত্ব সর্বজনসম্মত ও দৃশ্যমানভাবে হুমকির মুখে পড়ে। আমাদের এ ধারা থেকে বের হয়ে আসা দরকার। খ্যাঁকশিয়ালসহ নানা ছোট মাংসাশী স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো, যারা মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করে, সেসব প্রাণীকে একেবারেই গুরুত্ব দিই না। ধরেই নিয়েছি এরা সব সময় থাকবে। বিভিন্ন সময়েই দেখা যায়, এসব প্রাণীও বিলুপ্তির মুখে চলে যেতে পারে। থাইল্যান্ডের বড়-দাগি খাটাশ (লার্জ স্পটেড সিভেট) এর অন্যতম উদাহরণ।’
বাংলাদেশে যেসব খ্যাঁকশিয়াল মানুষের আশপাশে থাকে, তাদের কোনো সুরক্ষিত এলাকা নেই। গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, গ্রামের ছোট বন, পতিত জমি এবং উইপোকার ঢিবিগুলো রক্ষা করা খ্যাঁকশিয়াল সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এসব আবাস খুবই দ্রুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি কমাতে এসব গ্রামীণ বনের গুরুত্ব অপরিসীম।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে খ্যাঁকশিয়ালের মতো ছোট মাংসাশী প্রাণীগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় ইঁদুরের প্রজনন বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ছোট মাংসাশী স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং সাপ কমে যাওয়া ইঁদুরের বংশবিস্তারের অন্যতম কারণ। তাই উৎপাদন বাড়াতে কৃষিতে দরকার হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক। অথচ খ্যাঁকশিয়াল পোকামাকড় ও ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে কৃষিজমির ক্ষতি কমায়। এমন প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক হারিয়ে ফেলা মানে কৃষকের ক্ষতি আরও বেড়ে যাওয়া।
গবেষণাটি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে যথাযথ সুযোগ ও নিরাপত্তা পেলে খ্যাঁকশিয়াল আমাদের লোকালয়ের আশপাশেই শান্তিতে বসবাস করতে পারে। আমাদের প্রকৃতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে এই ছোট বন্য প্রাণীটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকৃতি থেকে একটি প্রজাতি হারিয়ে যাওয়া মানে পুরো বাস্তুসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিকল ভেঙে যাওয়া।’
বন বিভাগের নানা সময়ের পোস্টার-প্রচারণায় বলা হয়, বন্য প্রাণীরা কৃষকের কী পরিমাণ আর্থিকভাবে উপকার করে থাকে। এর সমর্থনে আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা এত দিন ছিল না। এই প্রাণীকে নিয়ে পঞ্চগড়ে করা গবেষণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খ্যাঁকশিয়াল বাঁচলে আমাদের ফসলের মাঠে ভারসাম্য বজায় থাকবে। পোকামাকড়ের উপস্থিতি ও ইঁদুরের উপদ্রব থেকে ফসল বাঁচবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে জীববৈচিত্র্য রক্ষা আর পরিবেশ সংরক্ষণ আলাদা বিষয় নয়। খ্যাঁকশিয়ালের মতো প্রজাতি টিকিয়ে রাখা আসলে একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্র ধরে রাখার লড়াই, যা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই লড়াই।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
চার মেয়ের পর জন্মেছিল এক ছেলে, তাঁর মৃত্যুর খবরে বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন মা
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৩৭ PM · প্রথম আলো
ভোটে সহিংসতার শঙ্কা, পুলিশের সক্ষমতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:১৪ PM · প্রথম আলো
মুন্সিগঞ্জে শীতের আগে জমজমাট সবজির চারার বাজার, ২০ কোটি টাকা বিক্রির আশা
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৩৬ PM · প্রথম আলো
কর্কশিট দিয়ে বানাতেন জাহাজ-গাড়ি, দ্বীপের সেই ছেলে এবার রোবট নিয়ে যাবেন ইতালি
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৪৪ AM · প্রথম আলো
