শাহজাদপুর সংবাদ

কর্কশিট দিয়ে বানাতেন জাহাজ-গাড়ি, দ্বীপের সেই ছেলে এবার রোবট নিয়ে যাবেন ইতালি

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৪৪ AM

কর্কশিট দিয়ে বানাতেন জাহাজ-গাড়ি, দ্বীপের সেই ছেলে এবার রোবট নিয়ে যাবেন ইতালি

সন্দ্বীপে রোবোটিকস শেখার কোনো সুযোগ ছিল না শাহরিয়ারের। নষ্ট রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার কিংবা খেলনা গাড়ি খুলে খুলেই নিজের মতো করে শেখার চেষ্টা করেছেন। এখন তিনি রোবোটিকস নিয়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্যও পেয়েছেন। চলতি বছর নভেম্বরে তাঁর ইতালি যাওয়ার কথা রয়েছে।

যন্ত্রপাতি নিয়ে কোনো জ্ঞান ছিল না তাঁর। ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে মিলে নষ্ট রেডিও কিংবা খেলনা গাড়ি খুলতেন তিনি। এসব যন্ত্র থেকে মোটর সংগ্রহের পর কর্কশিট দিয়ে কখনো জাহাজ, কখনো গাড়ি বানাতেন। চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে বেড়ে ওঠা সেই ছেলে এখন রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছেন ইতালির রোমে।

গল্পটা জিহাদ শাহরিয়ারের। তিনি ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি সন্দ্বীপ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তাঁর শৈশব ওই এলাকাতেই কেটেছে। এখন তিনি রোবোটিকস নিয়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্যও পেয়েছেন তিনি।

সাফল্য পাওয়া প্রতিযোগিতার একটি ‘ফিবোনাচ্চি আন্তর্জাতিক রোবট অ্যান্ড স্টেম অলিম্পিয়াড-২০২৬’। ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘গ্রিন এন্টারপ্রেনিউরশিপ’ বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে তাঁর দল। সাধারণত এ প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দল ফিবোনাচ্চি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে ইতালি যাওয়ার সুযোগ পায়। সে হিসাবে জিহাদ শাহরিয়ারও সুযোগ পেয়েছেন।

মাধ্যমিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ছাত্র ছিলেন শাহরিয়ার। ২০১৮ সালে তিনি সন্দ্বীপ থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। ২০২৩ সালে ভর্তি হন ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে গিয়েই আবার নতুন করে তাঁর রোবোটিকসের সঙ্গে পরিচয় হয়।

শাহরিয়ার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির আগেই তিনি সেখানের ‘মার্স রোভার টিম’ সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তিনি সংগঠনটিতে যুক্ত হন। পরে সেখানেই তিনি রোবোটিকস শেখা শুরু করেন। একে একে তিনি যন্ত্রের নকশা, ইলেকট্রনিকস, প্রোগ্রামিং, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কম্পিউটার ভিশন, যোগাযোগ ইত্যাদি শেখেন।

সন্দ্বীপে রোবোটিকস শেখার কোনো সুযোগ ছিল না শাহরিয়ারের। নষ্ট রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার কিংবা খেলনা গাড়ি খুলে খুলেই নিজের মতো করে শেখার চেষ্টা করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মনে হয়েছে, প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের প্রযুক্তি শেখার সুযোগ যেমন দরকার, তেমনি শহরের শিশুদেরও প্রকৃতি ও কৃষির সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার।

এ ভাবনা থেকেই শাহরিয়ার একটি প্রকল্প তৈরি করেন, যার নাম ‘গ্রিন টেক ল্যাব’ মডেল। তিনি জানান, এটি একটি ‘স্মার্ট গ্রিন লার্নিং ইনিশিয়েটিভ’। এখানে কৃষি, প্রকৃতি ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিক (হাইড্রোপনিক) পদ্ধতিতে উদ্ভিদ চাষ; সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পানির তথ্য সংগ্রহ এবং ইন্টারনেট অব থিংসের (আইওটি) মাধ্যমে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে প্রকল্পটিতে।

এ প্রকল্প নিয়েই ৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন শাহরিয়ার। তাঁর দলে সদস্য ছিলেন পাঁচজন। মাত্র এক মাসের প্রচেষ্টায় তাঁরা এ প্রকল্পের মডেল তৈরি করেন বলে জানান শাহরিয়ার।

ফিবোনাচ্চি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নাসির প্রথম আলোকে বলেন, জিহাদ শাহরিয়ারের দল অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদক পেয়েছে। স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জপদকপ্রাপ্ত প্রতিযোগীরা আগামী নভেম্বরে ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেবেন।

জানতে চাইলে জিহাদ শাহরিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্দ্বীপের মতো প্রত্যন্ত এলাকার কোনো শিশুকে রোবোটিকস ও স্টেম প্রযুক্তি শেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না—এটিই আমি চাই। জন্মস্থান যেন কোনো শিশুর শেখার সুযোগ নির্ধারণ না করে—এমন একটি বাংলাদেশ আমরা চাই। উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা পৃষ্ঠপোষকের সহযোগিতা পেলে এ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের পতাকা হাতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়াতে চাই।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ