শাহজাদপুর সংবাদ

‘এক্স-মেন’ থেকে ‘প্রিসিলা’, হলিউডের কত গল্প এই বাড়িতে

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৪৯ AM

‘এক্স-মেন’ থেকে ‘প্রিসিলা’, হলিউডের কত গল্প এই বাড়িতে

জায়গাটা চেনা চেনা লাগছিল। ভেতরে বিশাল সাদা প্রাসাদ, সামনে সারি সারি স্তম্ভ, চারপাশে সবুজের বিস্তার। আরে, এটা তো প্রফেসর চার্লস জেভিয়ারের সেই বিখ্যাত স্কুল! এখানেই না আশ্রয় নিত বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী মিউট্যান্টরা।

হ্যাঁ, পর্দার ‘এক্স-ম্যানশন’-এর একটি অংশ এটাই। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ওশাওয়া শহরের পার্কউড এস্টেট। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ব্রায়ান সিঙ্গারের আলোচিত সিনেমা ‘এক্স-মেন’-এ প্রফেসর জেভিয়ারের একাডেমির বাইরের অংশের পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল এই এস্টেটকে। পার্কউড কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র এক্স-মেনরা যে একাডেমিতে নিজেদের বিশেষ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ নিত, তার বাইরের দৃশ্যগুলোতে দেখা গেছে পার্কউডকে।

প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের প্রফেসর এক্স, হিউ জ্যাকম্যানের উলভারিন, হ্যালি বেরির স্টর্ম কিংবা ফ্যামকে জনসনের জিন গ্রে—তাঁদের সিনেমার জগতের সঙ্গে ওশাওয়ার এই বাড়ির যোগ; সব মিলিয়ে বাড়িটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে সময় লাগেনি মোটেও। ওশাওয়ার পার্কউড এস্টেটের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা আপনারও আসতেই পারে—এই বাড়িটা আগে কোথায় দেখেছি?

উত্তরটা হয়তো আপনার দেখা কোনো সিনেমা কিংবা সিরিজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

মঙ্গলবার দুপুরে পার্কউডে মঙ্গলবার দুপুরে যখন পার্কউডে পৌঁছালাম, পরিবেশ শান্ত, ছিমছাম। যে যাঁর মতো সময় কাটাচ্ছেন। এক প্রবীণকে দেখা গেল পার্কের মতো একটি জায়গায় বসে গভীর মনোযোগে বই পড়ছেন। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, এই শান্ত পরিবেশেই নিয়মিত চলে বড় বড় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনার কর্মযজ্ঞ।

আমরা যখন গেলাম, তখনো সেখানে একটি শুটিং চলছিল। স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল হলো—কিসের শুটিং? কারা এসেছেন? শুটিং–সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কাছে জানার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কেউই কোনো তথ্য দিতে রাজি হলেন না। ফলে সেই রহস্য আর ভাঙল না।

পরে কথা হলো পার্কউড ন্যাশনাল হিস্টোরিক সাইটের কিউরেটর সামান্থা জর্জের সঙ্গে। ২৬ বছর ধরে তিনি পার্কউডে কাজ করছেন। কিউরেটরের দায়িত্বের পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনশিল্পের সঙ্গে পার্কউডের সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।সামান্থা জানান, দক্ষিণ অন্টারিওতে এখন পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার চেয়ে টেলিভিশন ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সিরিজ, সীমিত পর্বের সিরিজ ও ধারাবাহিক প্রযোজনার কাজই বেশি। ঐতিহাসিক আবহের কারণে পার্কউড এসব প্রযোজনার কাছে চাহিদাসম্পন্ন শুটিং লোকেশন। তবে কখনো কখনো নির্মাতাদের কল্পনা তাঁকেও বিস্মিত করে। যেমন ‘স্টার ট্রেক’-এর একটি প্রযোজনায় পার্কউডকেই বানিয়ে ফেলা হয়েছিল ভিনগ্রহের একটি জায়গা।

মনে পড়ে গেল ‘অয়োময়’পার্কউডের বাড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বহু বছর আগের বাংলাদেশের একটি নাটকের কথা মনে পড়ে গেল—হুমায়ূন আহমেদের ‘অয়োময়’।নাটকটি প্রচারের পর এর শুটিং লোকেশনও দর্শকের কাছে আলাদা আকর্ষণে পরিণত হয়েছিল। ময়মনসিংহের শশীলজ দেখতে ঢাকা থেকে আমরাও গিয়েছি। মনে আছে, যাওয়ার অন্যতম আকর্ষণই ছিল—এই বাড়িতেই তো ‘অয়োময়’-এর শুটিং হয়েছিল!এত বছর পর কানাডার ওশাওয়ায় দাঁড়িয়ে সেই অনুভূতিটাই যেন ফিরে এল। পার্কউড আর শশীলজের ইতিহাস, স্থাপত্য কিংবা সংস্কৃতি এক নয়। কিন্তু সিনেমা বা নাটক একটি বাস্তব স্থাপনাকে দর্শকের স্মৃতির অংশ করে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে। পর্দায় দেখা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালে ইট-পাথরের স্থাপনা আর শুধু স্থাপনা থাকে না।

আমার কাছে পার্কউডও যেন কানাডার এক ‘শশীলজ’—একটির সঙ্গে জড়িয়ে ‘অয়োময়’-এর মির্জা সাহেবের বাড়ি, অন্যটির দেয়াল-বাগানজুড়ে হলিউডের অসংখ্য গল্প।

শুধু ‘এক্স-মেন’ নয়পার্কউডে সিনেমাপ্রেমীদের জন্য চমক আরও অনেক। অ্যাডাম স্যান্ডলারের জনপ্রিয় কমেডি ‘বিলি ম্যাডিসন’ আছে সেই তালিকায়। অস্কারজয়ী মিউজিক্যাল মুভি ‘শিকাগো’র শুটিংও হয়েছে এখানে। হিলারি সোয়াঙ্ক অভিনীত ‘অ্যামেলিয়া’ও এসেছে এই বাড়িতে। বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের জীবন নিয়ে নির্মিত ২০০৯ সালের ছবিটির শুটিং লোকেশনগুলোর একটি ছিল পার্কউড।

সামান্থা জর্জও উল্লেখ করলেন ‘শিকাগো’, ‘অ্যামেলিয়া’, ‘নাইটমেয়ার অ্যালি’, ‘রেডি অর নট’ ও ‘প্রিসিলা’র কথা। তিনি জানান, প্রতিটি প্রযোজনা পার্কউডের বিভিন্ন অংশকে ভিন্ন ভিন্ন সময় ও স্থানের আদলে ব্যবহার করেছে।পার্কউডের আনুষ্ঠানিক তালিকায় আরও আছে ‘দ্য টাক্সেডো’, ‘আন্ডারকভার ব্রাদার’, ‘চার্লি বার্টলেট’, ‘হলিউডল্যান্ড’সহ বহু সিনেমা।

ছোট পর্দা ও স্ট্রিমিংয়ের তালিকাও কম আকর্ষণীয় নয়। ‘দ্য বয়েজ’, ‘দ্য আমব্রেলা একাডেমি’, ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’, ‘হ্যানিবল’, ‘স্টার ট্রেক: স্ট্রেঞ্জ নিউ ওয়ার্ল্ডস’, ‘মারডক মিস্ট্রিজ’, ‘অ্যান উইথ অ্যান ই’, ‘মিসেস আমেরিকা’, ‘দ্য এক্সপ্যান্স’, ‘নিকিতা’, ‘শ্যাডোহান্টার্স’, ‘ওয়ার্কিন মমস’—পার্কউডের আনুষ্ঠানিক তালিকায় এমন বহু পরিচিত নাম রয়েছে।

জ্যাকব এলর্ডির জন্য সরাতে হলো ঝাড়বাতিতারকাদের নিয়ে স্মৃতি জানতে চাইলে সামান্থা নির্দিষ্ট তারকা বা প্রযোজনার অপ্রকাশিত তথ্য নিয়ে কথা বলতে চাইলেন না। কারণ, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পার্কউডের গোপনীয়তার চুক্তি থাকে। তবে শুটিং ঘিরে এমন কিছু গল্প বললেন, যা তারকাদের নামের চেয়েও কম আকর্ষণীয় নয়।

যেমন ‘প্রিসিলা’র শুটিং। সোফিয়া কপোলা পরিচালিত সিনেমাটিতে এলভিস প্রিসলির চরিত্রে অভিনয় করেছেন জ্যাকব এলর্ডি। সামান্থা জানান, পার্কউডের ডাইনিং রুমকে সিনেমায় জার্মানির একটি বসার ঘর হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ঘরের প্রায় চার ফুট দীর্ঘ মুরানো ঝাড়বাতি। প্রায় ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার জ্যাকব এলর্ডি এবং দৃশ্যসজ্জার পরিকল্পনার কারণে ঝাড়বাতিটি সরানো প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

চাইলেই অবশ্য পার্কউডের কোনো ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ খুলে ফেলা যায় না। সামান্থা বলেন, তাঁদের নীতি হলো, শুধু শুটিংয়ের সুবিধার জন্য স্থাপত্যের কোনো অংশ বা আলোকসজ্জার সরঞ্জাম সরানো হয় না। সংরক্ষণ বা সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেই কেবল সেটি করা যায়।

তাই বের হলো দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক সমাধান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ঝাড়বাতিটি খোলার বৈদ্যুতিক কাজের খরচের পাশাপাশি সেটির সংরক্ষণ ও সংস্কারের ব্যয়ও বহন করল।

সামান্থা মজা করে বলেন, বিষয়টি তাঁর ‘কিউরেটরের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিল’। কারণ, ওই বছর তাঁর বাজেটে ঝাড়বাতিটি সংস্কারের অর্থ ছিল না।একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি। অভিনেতা ভিন্স ভনের উচ্চতার কারণে পার্কউডের ড্রয়িংরুমে একটি প্রযোজনার শুটিংয়ের সময় দুটি চেক ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি সরানোর প্রয়োজন পড়ে। সেগুলোরও প্রয়োজনীয় সংরক্ষণকাজের সুযোগ তৈরি হয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অর্থে।

সিনেমা সচল করে দিল ১৯৩৪ সালের চুলাআরেক ঘটনা ২০১২ সালের। ‘হেমলক গ্রোভ’-এর শুটিং হচ্ছিল পার্কউডে। এস্টেটের রান্নাঘরে ছিল ১৯৩৪ সালের একটি পুরোনো একমি চুলা। সেটি শুটিংয়ে ব্যবহার করতে চেয়েছিল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান।

সামান্থা জানান, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চুলাটির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা নতুন করে দেয়, যাতে সেটি অন্টারিওর বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাবিধি অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়।তাতে দুই পক্ষেরই লাভ হলো। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাদের দৃশ্য ধারণ করল, আর পার্কউড পেল নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য একটি ঐতিহাসিক চুলা। এখন পার্কউডের ঐতিহাসিক খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা দল সেই চুলায় পুরোনো দিনের খাবার ও রেসিপি নিয়ে গবেষণা ও উপস্থাপনার কাজ করে।

সিনেমা আর ঐতিহ্য রক্ষার দুই জগৎচলচ্চিত্রের শুটিং আর শতবর্ষী স্থাপনা সংরক্ষণের চাহিদা অবশ্য সব সময় এক পথে চলে না।সামান্থা জানান, দুটি জগতের চাহিদা অনেকটাই বিপরীত। শুটিংয়ের তীব্র আলো, যন্ত্রপাতি এবং একসঙ্গে অনেক মানুষের উপস্থিতিতে ঘরের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেড়ে যেতে পারে। ঐতিহাসিক বস্তু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এসব বড় উদ্বেগের বিষয়।এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আবার ঠিকভাবে সমন্বয় করতে পারলে চলচ্চিত্র ও জাদুঘর—দুই পক্ষই লাভবান হতে পারে। ঝাড়বাতির সংস্কার কিংবা পুরোনো চুলা সচল হওয়ার ঘটনাগুলো তারই উদাহরণ।দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই কাজ করতে করতে সামান্থার অভিজ্ঞতাও ছড়িয়ে পড়েছে পার্কউডের বাইরে। চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কীভাবে কাজ করতে হবে, ঐতিহাসিক স্থাপনা কীভাবে রক্ষা করতে হবে, ঝুঁকি কীভাবে সামলাতে হবে—এসব বিষয়ে এখন অন্য জাদুঘর ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানও তাঁর পরামর্শ নেয়।

শহরটাই যেন শুটিং লোকেশনপার্কউডের বাইরে গেলেও ওশাওয়ার সঙ্গে সিনেমা-টেলিভিশনের সম্পর্ক শেষ হয় না। টরন্টোর কেন্দ্র থেকে ওশাওয়ার দূরত্ব মাত্র প্রায় ৬০ কিলোমিটার। শহর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব চলচ্চিত্র দপ্তরও আছে, যারা শুটিংয়ের জায়গা খোঁজা থেকে অনুমতি ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করে। ওশাওয়ায় শুটিংয়ের অনুমতির জন্য আলাদা কোনো ফিও নেই।

প্রতিষ্ঠানের তালিকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানে শুটিং হওয়া প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে ‘দ্য টেস্টামেন্টস’, ‘দ্য ওয়ে হোম’, ‘মারডক মিস্ট্রিজ’, ‘ক্রস’, ‘ম্যাটলক’, ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’, ‘দ্য বয়েজ’, ‘জ্যাক রিচার’, ‘স্টেশন ইলেভেন’, ‘শিটস ক্রিক’, ‘টাইটানস’, ‘দ্য আমব্রেলা একাডেমি’ ও ‘ডেজিগনেটেড সারভাইভার’। স্টিফেন কিংয়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত আলোচিত ‘ইট’-এরও শুটিং হয়েছে ওশাওয়ায়।

কেন এই অঞ্চল নির্মাতাদের এত পছন্দ, তার উত্তর পাওয়া যায় ডারহাম অঞ্চলের চলচ্চিত্র কমিশনের তথ্যে। একই অঞ্চলে শহুরে রাস্তা, পুরোনো প্রাসাদ, ছোট শহরের আদল, শিল্পাঞ্চল, পাথরের খনি থেকে গ্রামীণ পরিবেশ—সবই পাওয়া যায়।অরোনো, আক্সব্রিজ ও বিভারটনকে ক্যামেরায় যুক্তরাষ্ট্রের ছোট শহরের মতো দেখানো যায়। ওশাওয়ার কিছু অংশকে দেখানো যায় ডেট্রয়েট বা মিশিগানের ফ্লিন্টের মতো শিল্পশহর হিসেবে। পোর্ট পেরির চেহারা আবার নিউ ইংল্যান্ডের শহরের মতো। গল্পে প্রাসাদ বা দুর্গ প্রয়োজন হলে আছে পার্কউড ও ট্রাফালগার ক্যাসল। পাথরের খনিগুলো ব্যবহার করা যায় ভিনগ্রহের দৃশ্য তৈরিতে, আর সামরিক আবহের জন্য রয়েছে ওশাওয়া ট্যাংক মিউজিয়াম।

শুটিং মানেই শহরে অন্য রকম ব্যস্ততাপার্কউডে দেখা হলো স্থানীয় বাসিন্দা ও সিনেমা অনুরাগী আশিক ইশতিয়াক হকের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, শুটিং এখন ওশাওয়ার পরিচিত দৃশ্য। বড় কোনো প্রযোজনা এলে আশপাশে রীতিমতো উৎসবের আবহ তৈরি হয়। এলাকার মানুষ শুটিং দেখতে আসেন, তারকাদের একনজর দেখার চেষ্টা করেন।

আশিক বলেন, ‘একটা বড় ইউনিট এলে শুধু অভিনেতা-পরিচালক আসেন না। তাঁদের সঙ্গে অনেক মানুষ আসেন। ক্যাটারিং লাগে, গাড়ি লাগে, যন্ত্রপাতি লাগে—অনেক ধরনের কাজ তৈরি হয়।’

সরকারি হিসাবেও এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আকারটা বোঝা যায়। শুধু ২০২৪ সালেই ডারহাম অঞ্চলে ৭১টি প্রযোজনার কাজ হয়েছে। এর মধ্যে ছিল সিনেমা ও টেলিভিশন প্রযোজনা। ৬০০টির বেশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান আবাসন, খাবার সরবরাহ, যন্ত্রপাতি ভাড়া, পরিবহনসহ নানা সেবার মাধ্যমে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।আশিক আরেকটি কারণের কথা বললেন—করসুবিধা। অন্টারিওতে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনাকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের ফেরতযোগ্য করসুবিধা রয়েছে। তবে শুধু করসুবিধা নয়; টরন্টোর কাছাকাছি অবস্থান, বৈচিত্র্যময় শুটিং লোকেশন, দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা—সব মিলিয়েই ওশাওয়া ও ডারহাম অঞ্চল নির্মাতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

গাড়ির ইতিহাস থেকে সিনেমার ইতিহাসপার্কউডের গল্প অবশ্য সিনেমা দিয়ে শুরু নয়; এর শিকড় কানাডার গাড়িশিল্পের ইতিহাসে।এই এস্টেট ছিল কানাডার গাড়িশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রবার্ট স্যামুয়েল ম্যাকলাফলিন ও তাঁর পরিবারের বাড়ি। পার্কউড কর্তৃপক্ষ তাঁকে জেনারেল মোটরস অব কানাডার প্রতিষ্ঠাতা ও কানাডীয় গাড়িশিল্পের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচয় দেয়।তবে গাড়ির সঙ্গে ম্যাকলাফলিন পরিবারের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল তাঁর বাবার হাত ধরে। রবার্ট ম্যাকলাফলিন সিনিয়র ১৮৬৭ সালে ঘোড়ায় টানা গাড়ি ও ওয়াগন তৈরি শুরু করেন। চাহিদা বাড়তে থাকায় ১৮৭৬ সালে ব্যবসাটি ওশাওয়ায় নিয়ে আসেন। পরে রবার্ট স্যামুয়েল ম্যাকলাফলিন ও তাঁর ভাই জর্জ মোটরগাড়ি তৈরির দিকে এগিয়ে যান। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ম্যাকলাফলিন মোটর কার কোম্পানি; একই বছর শুরু হয় ম্যাকলাফলিন-বুইক গাড়ির উৎপাদন।এই পরিবারের আবাস হিসেবেই ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে নির্মিত হয় পার্কউড। ১৫ হাজার বর্গফুটের বাড়িটিতে রয়েছে ৫৫টি কক্ষ। শত বছরের বেশি সময় পরও এর শিল্পকর্ম, স্থাপত্য, বাগান ও ম্যাকলাফলিন পরিবারের ব্যবহৃত আসবাব সংরক্ষিত আছে। বর্তমানে এটি কানাডার জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান।অর্থাৎ, যে বাড়ির ইতিহাস জড়িয়ে আছে কানাডার গাড়িশিল্পের বিকাশের সঙ্গে, সময়ের পরিক্রমায় সেই বাড়িই হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের পরিচিত শুটিং লোকেশন।পার্কউড কর্তৃপক্ষও বলছে, শুটিং তাদের মূল কাজ নয়। তবে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা থেকে পাওয়া আয় ঐতিহাসিক এস্টেটটির সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে কাজে লাগে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ