শাহজাদপুর সংবাদ

আলোক ফাঁদ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ আছে, তবে আস্থা নেই

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৪৩ AM

আলোক ফাঁদ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ আছে, তবে আস্থা নেই

ধানখেতে পোকা দমনের একটি পরিবেশবান্ধব ও কম খরচের পদ্ধতি হলো আলোক ফাঁদ।

ধানখেতে পোকা ধরার জন্য আলো জ্বালানো হয়েছে। সেই আলোয় উড়ে এসে ধরা পড়েছে নানা ধরনের পোকা। ফাঁদ ঘিরে দাঁড়িয়ে সেসব পোকা দেখছিলেন কৃষক মুরাদ মিয়া। কিন্তু ধানখেতে এসব পোকা থাকলেও আপাতত কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন নেই—কৃষি কর্মকর্তাদের এমন পরামর্শে আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না তিনি। তাঁর একটাই প্রশ্ন, পোকা মারার বিষ না দিলে ধান রক্ষা হবে কীভাবে?

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভা ব্লকের দড়িচন্ডিবের এলাকায় বসানো একটি আলোক ফাঁদ দেখতে এসে এমন দুশ্চিন্তার কথা জানান মুরাদ মিয়া। এবার ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন তিনি। তাঁর মতো আরও অন্তত ২০ জন কৃষক সেদিন ফাঁদ দেখতে জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নারী কৃষকও ছিলেন।

ধানখেতে পোকা দমনের একটি পরিবেশবান্ধব ও কম খরচের পদ্ধতি হলো আলোক ফাঁদ। এটি মূলত আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয় এমন ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত ও ধরে ফেলার জন্য ব্যবহার করা হয়। ধানখেতে মাজরা পোকা, পামরি পোকা, পাতা মোড়ানো পোকাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দমনে এটি কাজে লাগে।

ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আলোক ফাঁদ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ আছে, তাঁরা ফাঁদ দেখতে আসেন, কর্মকর্তাদের কথাও শোনেন। কিন্তু ধানখেতে পোকা দমনে কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শে অনেকেরই ভরসা হয় না। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো বিষ না দিলে পোকা ধান নষ্ট করে ফেলতে পারে। ফলে পোকা শনাক্ত ও দমনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে আলোক ফাঁদ ব্যবহারের উদ্যোগ থাকলেও কৃষকদের আস্থা অর্জন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

ভৈরবে আমন ধানের পোকা পর্যবেক্ষণে ২২টি ব্লকে ২২০টি আলোক ফাঁদ স্থাপনের কর্মসূচি নিয়েছে কৃষি বিভাগ। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দড়িচন্ডিবের এলাকায় একটি ফাঁদ পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে ২টি মাজরা পোকা, ৩টি পাতা মোড়ানো পোকা, ৩টি সবুজ পাতা ফড়িং, ২৫টি খাটো ঘাসফড়িং ও ৩টি অপরিচিত পোকা শনাক্ত করা হয়। ফাঁদে কিছু উপকারী পোকাও পাওয়া যায়। তবে ধানের অন্যতম ক্ষতিকর পোকা বাদামি গাছফড়িং পাওয়া যায়নি।

ফাঁদে পাওয়া পোকার ধরন ও উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের আপাতত কীটনাশক ব্যবহার না করে পার্চিং করার পরামর্শ দেন কৃষি কর্মকর্তারা। পার্চিং হলো ধানখেতে বাঁশের কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা। এতে পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকা খেতে পারে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আলোক ফাঁদে আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আসা পোকা শনাক্ত করা যায়। এসব তথ্য ও জমি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হয়। তবে ফাঁদে কোনো নির্দিষ্ট পোকা পাওয়া না গেলেই যে আশপাশের জমিতে সেই পোকা নেই, তা পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলা যায় না।

দড়িচন্ডিবের এলাকার কৃষক জহির মিয়া এ বছর ৩৫ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। আলোক ফাঁদ দেখতে এসে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ শুনেছেন তিনিও। তবে কীটনাশক ব্যবহার না করার বিষয়ে তাঁর সংশয় কাটেনি।

জহির মিয়া বলেন, ‘স্যারদের কথা ঠিক আছে। তবে কিছু বিষ না দিলে কেমনে হয়? আবার যদি সব ধান খাইয়া ফেলে?’

একই এলাকার কৃষক নবী হোসেনের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। তিনি এবার ৭০ শতাংশ জমিতে ধান চাষ করেছেন। সাধারণত তাঁর প্রায় আড়াই হাজার টাকার কীটনাশক লাগত। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ মেনে এবার মাত্র ৮০০ টাকার কীটনাশক ব্যবহার করেছেন। নবী হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁর ধানের অবস্থা ভালো আছে।

স্থানীয় কৃষক নজরুল ইসলামের স্ত্রী সাহানা বেগম আট শতাংশ জমিতে ধান চাষ করেছেন। আলোক ফাঁদের কার্যকারিতা নিয়ে তাঁরও প্রশ্ন রয়েছে। সাহানা বেগম বলেন, ‘খেতে কয়ডা পোকা আছে, লাইট জ্বালাইয়া বুঝবে কেমনে?’

ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। এসব জমিতে পোকা পর্যবেক্ষণের জন্য ২২টি ব্লকে ২২০টি আলোক ফাঁদ স্থাপনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৫টি ফাঁদ স্থাপন করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি ফাঁদের পর্যবেক্ষণ এলাকা ২০ হেক্টর জমি। ফাঁদগুলো স্থায়ীভাবে রাখা হয় না। প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা করে ফাঁদ বসানো হয়। একই স্থানে দ্বিতীয়বার ফাঁদ বসানো হয় না। পরে পোকা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হলে কৃষকেরা নিজ উদ্যোগে ফাঁদ স্থাপন করতে পারেন।

প্রতিটি ফাঁদ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দেন। এসব তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। পরে কৃষি বিভাগের সভায় তা বিশ্লেষণ করে জেলা কার্যালয়ে লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়। কৃষি বিভাগ বলছে, চলতি বছর স্থাপন করা ফাঁদগুলোতে বাদামি গাছফড়িং পাওয়া যায়নি।

উপজেলার শিমুলকান্দি ব্লকে মোট কৃষক ১ হাজার ১৬৫ জন। এবার এই ব্লকে ১১০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। ব্লকের উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার বলেন, আলোক ফাঁদ দেখতে অনেক কৃষক আসেন। কিন্তু পরামর্শ মেনে চলার ক্ষেত্রে তাঁদের অনেকের আপত্তি।

ঝগড়ারচর ব্লকের উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা চন্দন কুমার সূত্রধর বলেন, ফাঁদের সুফল কৃষকের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান নয়। ফলে এর কার্যকারিতা নিয়ে তাঁদের মনে ভয় ও সংশয় থাকে।

আলোক ফাঁদ কর্মসূচির সফলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা হয় ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আকলিমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, পোকা দমনে আলোক ফাঁদ সাশ্রয়ী একটি পদ্ধতি। তবে কৃষকের প্রধান ভরসা এখনো এটি হয়ে ওঠেনি। অনেক কৃষক জানেন না, তাঁদের জমিতে আদৌ কীটনাশক প্রয়োজন কি না কিংবা কতটুকু প্রয়োজন। এ বিষয়ে কৃষক ও কৃষি বিভাগের মধ্যে বোঝাপড়ার কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে।

কৃষকদের মধ্যে এই সংশয় দূর করতে কী করা প্রয়োজন—জানতে চাইলে আকলিমা বেগম বলেন, কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। আলোক ফাঁদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কৃষকেরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু কোথাও একটা অবিশ্বাস রয়ে গেছে। এই দূরত্ব কমাতে কৃষি বিভাগের আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

আলোক ফাঁদ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ আছে, তবে আস্থা নেই | শাহজাদপুর সংবাদ