সরকারি কেনাকাটার দরপত্রে ২০ বছরের ‘সুযোগবঞ্চিত’দের জন্য সুযোগ তৈরি
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:৪৫ AM

* কোনো কাজের জন্য প্রয়োজন না থাকলে দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা চাওয়া যাবে না।
* জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রচলিত সরকারি ক্রয়পদ্ধতির সব ধাপ অনুসরণ না করেই কেনাকাটার সুযোগ।
‘সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি’দের সরকারি কেনাকাটার দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ বিধান রেখে ‘গণ খাতে ক্রয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। সেখানে সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি বলতে বোঝানো হয়েছে, এ অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার আগের ২০ বছরের মধ্যে বৈধ নিবন্ধন বা লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও সরকারি কেনাকাটায় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয় সুযোগ বা অনুকূল পরিবেশের অভাবে কোনো সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি অথবা অংশগ্রহণ করেননি।
এখন ‘গণ খাতে ক্রয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করে এমন সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তিদের সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশোধিত আইনে অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র দরপত্রদাতা, নারী দরপত্রদাতাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দেশীয় শিল্পের স্বার্থকেও সুরক্ষা দিতে চায় সরকার। আরও চায় কোনো দরপত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিতে চাইলে তাতে স্থানীয় অংশীদারদেরও নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রোববার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের এক দিন পর গত সোমবার সংশোধিত অধ্যাদেশের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
ক্রয় আইন বিশেষজ্ঞরা কিছু সংশোধন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, সুযোগবঞ্চিতদের সুযোগ দেওয়ার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে স্থানীয়দের অংশীদারত্বদের যে শর্ত আরোপ হয়েছে, তাতে রাজনীতিবিদদের আনুকূল্য পেতে হবে।
সংশোধিত অধ্যাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বার্থ বা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রচলিত সরকারি ক্রয়পদ্ধতির সব ধাপ অনুসরণ না করেই কেনাকাটার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকার এর নাম দিয়েছে ‘বিকল্প সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা’। এর আওতায় সরাসরি কেনাকাটা ও একক উৎসভিত্তিক কেনাকাটার সুযোগ থাকবে। এতে সংকটের সময় দীর্ঘ দরপত্র প্রক্রিয়ার কারণে প্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবা পেতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
বলা হয়েছে, সরকারি কেনাকাটায় বাংলাদেশে উৎপাদিত বা প্রস্তুত করা পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। সরকার মনে করছে, এতে সরকারি কেনাকাটায় দেশীয় উৎপাদকদের অংশগ্রহণ বাড়বে।
নতুন ঠিকাদারদের জন্যও সুযোগ তৈরি করার কথা বলা হয়েছে অধ্যাদেশে। সেখানে বলা হয়েছে, দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য এমন কোনো যোগ্যতার শর্ত আরোপ করা যাবে না, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সীমিত করে। কোনো কাজের জন্য প্রয়োজন না থাকলে দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা চাওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট পরিমাণ টার্নওভার বা আগের সরকারি কাজের অভিজ্ঞতাকেও বাধ্যতামূলক করার দরকার নেই। তবে কাজের ধরন, জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার শর্ত রাখা যাবে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে নতুন শর্ত। বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে চাইলে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করতে হবে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার এ শর্ত শিথিল করতে পারবে। যৌথ উদ্যোগে দেশীয় অংশীদারের ন্যূনতম অংশীদারত্ব কত হবে, তা বিধির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
উন্মুক্ত দরপত্রে প্রাক্-যোগ্যতা, সমান প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞাপন এবং দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব আলাদাভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নির্ধারিত মানদণ্ডে নম্বর দিয়ে দরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে কাজের মান, কারিগরি সক্ষমতা, টেকসই কতটা বা অন্যান্য নির্ধারিত বিষয় বিবেচনা করা যাবে। অর্থাৎ শুধু দর নয়, কাজের গুণগত ও কারিগরি সক্ষমতাও মূল্যায়নের অংশ হতে পারবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর অন্য দরদাতাদের ফল জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যে দরদাতা কাজ পাবে, তার মালিকানা ও চুক্তিসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
সীমিত দরপত্র (এলটিএম) ব্যবহারের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করা হয়েছে সংশোধিত অধ্যাদেশে। বিশেষায়িত পণ্য বা সেবা, সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারী রয়েছে—এমন পণ্য, জরুরি প্রয়োজন এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্যের ক্ষেত্রে সীমিত দরপদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে। এতে নতুন, ক্ষুদ্র ও নারী দরপত্রদাতারা অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
এলটিএমে আগে সর্বনিম্ন দর সমান হলে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজে লটারির সুযোগ ছিল। এখন ৩ কোটি টাকার নির্দিষ্ট সীমা বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, এখন সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতার সঙ্গে দর-কষাকষি করার সুযোগ থাকবে। এ সুযোগ পাওয়া যাবে কাজের কারিগরি ও আর্থিক বিষয়, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত নিয়ে। দর কমানোর জন্য দর-কষাকষি করা যাবে না।
সংশোধিত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, চক্রান্ত, জবরদস্তি, প্রতিবন্ধকতা, চুক্তির কাজ সম্পাদনে ব্যর্থতা বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। অভিযোগের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া হবে আত্মপক্ষ সমর্থনের।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতিবছর আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি সরকারি কেনাকাটা হয়। ২০২৫ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার প্রবণতা রয়েছে। শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার মোট প্রকল্প মূল্যের ৬১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আর ১০ শতাংশ ঠিকাদারের দখলে রয়েছে ১ শতাংশের কম বাজার। টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে, শীর্ষ ঠিকাদারেরা যৌথভাবে (জেভি) বড় প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলে গেলে শীর্ষ ঠিকাদারদের আধিপত্যও বদলে যায়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ২০ বছর একশ্রেণির ঠিকাদার যে সুযোগবঞ্চিত ছিল এটা ঠিক। সে বাস্তবতা বিবেচনায় তাঁদের ব্যবসায় ফিরে আসার যৌক্তিকতাও থাকতে পারে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা যেন বজায় থাকে। সরকার যদি মনে করে ‘এবার আমাদের পালা’, তাহলে দেশ ও দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার যদি যথাযথ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, তাহলে তো শুধু হাতবদল হবে, দেশের কোনো লাভ হবে না।
ইফতেখারুজ্জামান সরকারি কেনাকাটায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মনে করেন।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে চাকরি পান সাড়ে ৮ হাজার কর্মী, নিয়োগে আরও যত অনিয়ম করা হয়
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৩৭ PM · প্রথম আলো
পণ্য উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে, উদ্বিগ্ন শিল্পোদ্যোক্তারা
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM · প্রথম আলো
তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার কত টাকা পাবে, জনগণের পকেট কাটা যাবে কত?
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:১৮ AM · বাংলা ট্রিবিউন
চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ: এডিবি
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:১১ AM · প্রথম আলো
সুতা–কাপড় আমদানিতে অনুমতি লাগবে না, আমদানি নীতি সংশোধন
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:০৬ PM · প্রথম আলো
