শাহজাদপুর সংবাদ

শৈশবে না দেখা স্বপ্নই এখন মেয়েটির হাতের মুঠোয়

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৫৬ AM

শৈশবে না দেখা স্বপ্নই এখন মেয়েটির হাতের মুঠোয়

শৈশবের স্বপ্ন কতজনের পূরণ হয়? কারও কারও ক্ষেত্রে না দেখা স্বপ্নই জীবনের দরজায় কড়া নাড়ে বড় হয়ে ওঠার পর। ইয়েলেনা রিবাকিনার দরজায় এখন যেমন কড়া নাড়ছে ইতিহাস!

র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠা দূর অস্ত, রিবাকিনা শৈশবে কখনো পেশাদার টেনিস খেলোয়াড় স্বপ্নও দেখেননি। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে বুঝতে পেরেছিলেন এ খেলায় তিনি বেশ ভালো। পেশাদার হওয়ার ভাবনাটা আসে ১৭ বছর বয়সে। কত দূর যেতে পারবেন, সেটা তো আর তখন টের পাওয়া সম্ভব ছিল না। রিবাকিনা শুধু খেলে গেছেন। সেই পথে হাতে ধরা দিয়েছে দুটি গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা। অধরা ছিল শুধু সেই সিংহাসনটি!

গতকাল রাতে সেটাও ধরা দিল আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে। ইউএস ওপেনে মেয়েদের এককের কোয়ার্টার ফাইনালে চীনের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ঝেং কিনওয়েনকে ৩–৬, ৬–১, ৬–৪ গেমে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠেন রিবাকিনা। ২ ঘণ্টা ১৪ মিনিটের এই লড়াই জিতে কাজাখস্তান টেনিসের ইতিহাসই পাল্টে দিলেন রাশিয়ায় জন্ম নিয়ে ১৯ বছর বয়সে কাজাখ নাগরিকত্ব পাওয়া মেয়েটি।

আগামী সপ্তাহে মেয়েদের র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থানে আর আরিনা সাবালেঙ্কাকে দেখা যাবে না। ৯৯ সপ্তাহ পর এই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবেন রিবাকিনা। কাজাখস্তানের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে উঠবেন মেয়েদের এককে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। কোথায় আনন্দে ভেসে যাবেন তা না, রিবাকিনার সমস্ত মনোযোগজুড়ে এখন অন্য কিছু। ইউএস ওপেনের শিরোপা!

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও উইম্বলডন জিতেছেন একবার করে। ফ্রেঞ্চ ওপেনে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দৌড় কোয়ার্টার ফাইনাল। আর ইউএস ওপেনে এবার সেমিফাইনালে ওঠাই সেরা সাফল্য। তাহলে এখান থেকে প্রথম শিরোপাটা তুলে নেওয়ার কথা তো ভাবাই যায়?

রিবাকিনা ঠিক সেটাই ভাবছেন।

র‍্যাঙ্কিং ভুলে শিরোপা নিয়ে ভাবায় রিবাকিনার যুক্তিও বেশ দার্শনিকসুলভ। শুনুন তাঁর মুখেই, ‘এটা (র‍্যাঙ্কিং) এখন শুধু একটা সংখ্যামাত্র। আমি যে টুর্নামেন্টেই খেলি না কেন, আমার মূল লক্ষ্য থাকে শিরোপা জেতা।’

তবে এই অর্জনে রিবাকিনা কিন্তু ঠিকই রোমাঞ্চিত। তাঁর সেই স্বীকারোক্তিতেও ফুটল জীবন–দর্শন, ‘আমার মনে হয় ক্যারিয়ার শেষে পেছনে তাকিয়ে এর মূল্য আরও বেশি বুঝতে পারব...খেলা ছাড়ার পর “আমি এতগুলো টুর্নামেন্ট জিতেছি, বিশ্বসেরা হয়েছিলাম”—এসব ভাবতে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। আমার মূল লক্ষ্য শিরোপা জেতা, তাই সব মনোযোগ এখন শুধুই পরের ম্যাচ নিয়ে।’

সেই পরের ম্যাচে অর্থাৎ সেমিফাইনালে রিবাকিনার প্রতিপক্ষ কোকো গফ। প্রথম সেটে পিছিয়ে পড়ে দুটি ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়ে শেষ পর্যন্ত জয় তুলে যুক্তরাষ্ট্রের এ তারকা। শুরুতে মাত্র ২৬ মিনিটে প্রথম সেট খুইয়ে চলে যান ব্যাকফুটে। চতুর্থ বাছাই গফ এরপর এলোমেলো দ্বিতীয় সেটে দুবার ব্রেকের সুবিধা পেয়েও হাতছাড়া করেন। শেষ পর্যন্ত ১৬ পয়েন্টের শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারে জিতে ম্যাচ গড়ান নির্ণায়ক সেটে। স্নায়ুক্ষয়ী এ লড়াইয়ে রাশিয়ার মিরা আন্দ্রিভার বিপক্ষে গফ শেষ পর্যন্ত জিতেছেন ২-৬, ৭-৬ (৯-৭), ৬-২ গেমে।

২০০৯ সালে উইম্বলডনের পর এবারই প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যামে নারী এককে শীর্ষ চার বাছাই সেমিফাইনালে উঠলেন। শীর্ষ বাছাই সাবালেঙ্কা, দ্বিতীয় বাছাই রিবাকিনা, তৃতীয় বাছাই জেসিকা পেগুলা এবং চতুর্থ বাছাই কোকো গফ—এই হলো ইউএস ওপেনে মেয়েদের এককে শেষ চারের লাইনআপ।

তার মধ্যে রিবাকিনার গল্পটা আসলে সাবালেঙ্কার রাজত্ব দখলের। টানা ৯৯ সপ্তাহ, সব মিলিয়ে মোট ১০৭ সপ্তাহ শীর্ষে ছিলেন বেলারুশ তারকা, যা ডব্লিউটিএর ইতিহাসে ষষ্ঠ দীর্ঘতম ধারাবাহিক রাজত্বের রেকর্ড। সাবালেঙ্কাকে নামানোর লড়াইয়ে পেগুলা ও গফের পাশাপাশি রিবাকিনাও ছিলেন। বাকিদের র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে উঠতে শিরোপা জেতার পাশাপাশি রিবাকিনা যেন সেমিফাইনালের আগে বিদায় নেন, সেই সমীকরণের ওপর নির্ভর করতে হতো। ওদিকে টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই রিবাকিনা জানতেন, সেমিফাইনালে উঠলেই মেয়েদের সিংহাসনে নাম লেখা হবে কাজাখস্তানের।

নিজের লড়াইটি জিতে ডব্লিউটিএ ইতিহাসে ৩০তম খেলোয়াড় হিসেবে র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে উঠে সেটাই নিশ্চিত করলেন রিবাকিনা। শেষ চারে পেগুলাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়া সাবালেঙ্কা ইউএস ওপেনে টানা তৃতীয় শিরোপা জিতলেও সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে পারবেন না।

গত বছর ইউএস ওপেনের মৌসুমে র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ১০ থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন রিবাকিনা। চোট, শারীরিক অসুস্থতা ও পারফরম্যান্সের ঘাটতিতে বাজে সময় কাটছিল তাঁর। এ বছর ক্যারিয়ারের সেরা ছন্দে ফিরে সামলে নিয়েছেন সেই ধাক্কা। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতেছেন। এর বাইরে স্টুটগার্টে শিরোপা জেতার পাশাপাশি ইন্ডিয়ান ওয়েলস ও টরন্টোয় হন রানার্সআপ। সর্বশেষ পাঁচ মাসে সাবালেঙ্কার পথচলা বেশ কঠিন ছিল, অন্যদিকে রিবাকিনা ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। ফলে নিউইয়র্কে পা রাখার আগে রিবাকিনা জানতেন, কী সুবর্ণ সুযোগ অপেক্ষা করছে তাঁর সামনে!

কিন্তু পরিস্থিতি আবারও কঠিন হয়ে পড়ে। ইউএস ওপেন শুরুর ১২ দিন আগে সিনসিনাটি ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে ইগা সিওনতেকের বিপক্ষে চোট নিয়ে কোর্ট ছাড়েন। সাত দিন অনুশীলন করতে পারেননি। চোটের পর শরীর কীভাবে সাড়া দেবে, তা নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা।

শেষ পর্যন্ত সব অনিশ্চয়তা র‍্যাকেটের মাধ্যমে দূরে ঠেলে সিংহাসনে ওঠার খুব কাছে পৌঁছে গেছেন রিবাকিনা। এখন অপেক্ষা শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিটুকু পাওয়ার। সংবাদ সম্মেলনে রিবাকিনার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কাজাখস্তানের মানুষের কাছে তাঁর এই অর্জনের কী অর্থ? ২৭ বছর বয়সী রিবাকিনা জানালেন, মধ্য এশিয়ার দেশটিতে এখন প্রচুর খুদে টেনিস খেলে। অনেকে তাঁকে অনুসরণ করেন। অর্থাৎ টেনিসে উঠে আসার পথে কাজাখস্তান। সেই উঠে আসায় রিবাকিনার অবদানের নেপথ্যে কী?

উত্তরটা আসলে যেকোনো পেশার মানুষের জীবনেই সফলতার চাবিকাঠি। রিবাকিনা সেটাই বললেন কয়েকটি শব্দে, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ